আজানের পর দরুদ পাঠ করা সুন্নত। আজানের সময় অযথা কথাবার্তা না বলে আজান শোনা ও আজানের জবাব দেওয়া এবং আজানের পর নবীজির (সা.)-জন্য দোয়া করার বিশেষ ফজিলত ও পুরস্কারের ঘোষণা এসেছে হাদিসে পাকে। আজানের সময় দোয়া করলে গুনাহ মাফ হয়। নামাজের যেমন গুরুত্ব রয়েছে ঠিক তেমনি আজানেরও গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। প্রতি ওয়াক্ত ও জুমার নামাজে যোগ দেওয়ার জন্য আজান দেওয়া হয়। আজান শোনার পর দোয়া পড়তে হয়। মুয়াজ্জিনের আজান শুনে উত্তর দেওয়া এবং আজানের পর দোয়া পড়ার ফজিলত অত্যধিক। নবীজি (সা.)-বলেছেন, আজানের পর দোয়া পাঠকারীর জন্য রয়েছে ফজিলতপূর্ণ পুরস্কার। আজানের পর দোয়া ও মুনাজাত মূলত নবীজি (সা.)-এর দরুদ ও প্রশংসা। নবীজির ওপর দরুদ পাঠ ও প্রশংসায় মিলবে পরকালের সুপারিশ। এর চেয়ে বড় পুরস্কার মুমিনের জন্য আর কী হতে পারে! হাদিসের বর্ণনায় এসব ফজিলত, দরুদ ও দোয়া ওঠে এসেছে :
আজানের ফজিলত সম্পর্কে বুখারি শরিফে বলা হয়েছে আবু হুরায়রা (রা.)-বর্ণনা করেছেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয় তখন শয়তান হাওয়া ছেড়ে পালায় যাতে সে আজানের শব্দ না শোনে। যখন আজান শেষ হয়ে যায় তখন সে আবার ফিরে আসে। আবার যখন নামাজের জন্য একামত বলা হয় তখন আবার সে দূরে সরে যায়। একামত শেষ হলে সে পুনরায় ফিরে এসে লোকের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলে এটা স্মরণ করো ওটা স্মরণ করো। এভাবে বিস্মৃত বিষয়গুলো সে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাতে লোকটি এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছায় যে সে কয় রাকাত নামাজ আদায় করেছে তা আর মনে করতে পারে না। পৃথিবীর সবচেয়ে সুমধুর ধ্বনির নাম আজান।
আজানের দোয়া : আল্লাহুম্মা রব্বা হাজিহিদ দাওয়াতিত তাম্মাতি ওয়াস সালাতিল কায়িমাতি আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলাতা ওয়াদ দারজাতার রফিআতা ওয়াবআসহু মাকামাম মাহমুদানিল্লাজি ওয়াআত্তাহু ওয়ারজুকনা শাফাআতাহু ইয়াওমাল কিয়ামাতি ইন্নাকা লা তুখলিফুলমিআদ।
আজানের দোয়ার অর্থ : হে আল্লাহ! এই পরিপূর্ণ আহ্বানের ও স্থায়ী প্রতিষ্ঠিত নামাজের আপনিই প্রভু। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ওয়াসিলা ও সুমহান মর্যাদা দান করুন এবং তাঁকে ওই প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করুন যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাঁকে দিয়েছেন আর কিয়ামতের দিন তাঁর সুপারিশ আমাদের নসিব করুন নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।
আজানের পর দরুদ শরিফ পড়ে এ দোয়া পড়া সুন্নত। কেয়ামতের দিন সে আমার সুপারিশ পাওয়ার অধিকারী হবে।
আজানের দোয়া পাঠের ফজিলত : আজানের দোয়া পাঠের অনেক ফজিলত রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে ব্যক্তি আজান শুনে উল্লিখিত দোয়া পড়বে কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার সুপারিশ থাকবে। অপর হাদিসে রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে আজানের দোয়ার জবাব দেবে কেয়ামতের দিন সে আমার সুপারিশ পাওয়ার অধিকারী হবে।
আজান ও ইকামাতের বাক্যগুলো : প্রথমে আল্লাহু আকবার আল্লাহ মহান (চারবার) অত:পর আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই (দুবার) তারপর আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল (দুবার) তারপর হাইয়া আলাস সালাহ নামাজের জন্য আসো (দুবার) ও হাইয়া আলাল ফালাহ কল্যাণের জন্য আসো (দুবার) পরিশেষে আল্লাহু আকবার আল্লাহ মহান (দুবার) ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই (একবার)। ফজরের নামাজের আজানে পঞ্চম বাক্যের (হাইয়া আলাল ফালাহ) পর বলতে হয় ‘আস সালাতু খায়রুম মিনান নাওম’ ঘুম অপেক্ষা নামাজ উত্তম (দুবার) এবং একামতে এই স্থানে বলতে হয় কদ কমাতিস সালাহ জামাত প্রস্তুত (দুবার)। আর আজান ও ইক্বামতের সময় দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আজান ও ইকামাতের সময় দোয়া : এ সময় দোয়া করার ফজিলতও অনেক বেশি। তাই মানুষের প্রার্থনা কবুলে আজান ও ইক্বামতের সময়ের দোয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের আমল করা জরুরি। আজান ও ইক্বামতের মাঝে দোয়া আজান চলাকালীন সময়ে এবং আজানের পর দোয়া করলে আল্লাহতাআলা বান্দার সে দোয়া ফিরিয়ে দেন না। এ সময় দোয়া কবুলের বিষয়টি অনেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ফরজ নামাজের পরসহ ফরজ নামাজের আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়কে দোয়া কবুলের জন্য খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তখন দোয়া করলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া কখনো প্রত্যাখ্যাত হয় না।
আজানের সময় রাসুল (সা.)-আজানের জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আজানের পর নবীজির (সা.) জন্য দরুদ পাঠ ও ওয়াসিলা প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যারা নবীজির (সা.) জন্য ওয়াসিলা প্রার্থনা করবে কেয়ামতের দিন তারা নবীজির শাফাআত বা সুপারিশ পাবে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত রয়েছে নবীজি (সা.) বলেন, যখন তোমরা মুয়াজ্জিনকে আজান দিতে শুনবে তখন সে যা বলে তা বলো। এরপর আমার ওপর সালাত পাঠ করো। যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার সালাত পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে ১০বার রহম করবেন। এরপর আমার জন্য ওয়াসিলা চাও। ওয়াসিলা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান। আল্লাহর একজন মাত্র বান্দাই এই মর্যাদা লাভ করবে এবং আমি আশা করি আমিই হব সেই বান্দা। যে ব্যক্তি আমার জন্য ওয়াসিলা প্রার্থনা করবে সে আমার সুপারিশের হকদার হবে। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে মুয়াজ্জিনের সঙ্গে সঙ্গে আজানের শব্দগুলো যে বলবে সে জান্নাতে যাবে। তার গুনাহসমূহ মাফ করা হবে। হাদিস শরীফে এসেছে হুজুর সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন তোমরা মুয়াজ্জিনে যেভাবে আজানের বাক্যগুলি বলে তোমরাও সেইভাবে বলো। তারপর আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজের জন্য দোয়া কামনা করো। তিনি তোমাদেরকে তা দান করবেন। যদি কেউ প্রতি আজানের পর উক্ত সুন্নতগুলির উপর আমল করে তাহলে দিনেরাতে মিলে ২৫ টি সুন্নতের উপর আমল হয়ে যাবে।
সাহল ইবনে সাদ রাদিয়াল্লাহুতায়ালা আনহু বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দুটি দোয়া কখনো ফেরত দেওয়া হয় না বা খুবই কম ফেরত দেওয়া হয়। ১. আজানের সময়ের দোয়া (ইকামতের সময় দোয়া) এবং আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের সময় করা দোয়া যখন (মুসলিম ও কাফির) উভয়পক্ষ মুখোমুখী হয় এবং একে অপরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি যুদ্ধে মিশে যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতায়ালা ভোরের নির্মল বাতাসকে নির্দেশ দেন সে যেন মোয়াজ্জিনের আযানের শব্দকে আকাশে নিয়ে যায়। যখন ফেরেশতারা দুনিয়াবাসীদের আযানের শব্দ শুনতে পায় তখন তারা বলে : এই শব্দটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের যারা আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকারোক্তি দিচ্ছে এবং ঐ ফেরেশতারা নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই উম্মতের জন্য ইস্তেগফার করতে থাকে। আজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ দোয়া ও মুনাজাতের মাধ্যমে আল্লাহতাআলা মুমিন মুসলমানের গুনাহ ক্ষমা করে পরকালে তার সুপারিশ দিয়ে ধন্য করবেন। আল্লাহতাআলা মুসলিম উম্মাহকে আজানের উত্তর দেওয়াসহ দোয়া ও দরুদের মাধ্যমে নবীজির সুপারিশ পাওয়ার ও হাদিসের ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।











