ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার প্রাক–নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)-এর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনে নির্ধারিত মোট ১, ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ১,৪৯০টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৭৬ শতাংশ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে প্রস্তুত এ প্রাক–নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি বিএইচআরএফ চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খানের কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনটি প্রেরণ করেন সংগঠনটির মহাসচিব অ্যাডভোকেট এ এম জিয়া হাবীব আহসান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় মোট ৬০৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩১০টিকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, ঘনবসতি, শিল্পাঞ্চল, শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা ও ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে এসব কেন্দ্রে বিশেষ নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। মহানগরের পাঁচটি প্রধান নির্বাচনী এলাকায় ৩০৭টির বেশি অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কোতোয়ালী ও বাকলিয়া এলাকায় ঘিঞ্জি গলি ও অতিরিক্ত জনঘনত্ব, ডবলমুরিং ও পাহাড়তলীতে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা, বন্দর–পতেঙ্গা–ইপিজেড এলাকায় শ্রমিক অধ্যুষিত শিল্পাঞ্চল এবং খুলশী ও বায়েজিদে পাহাড়ঘেঁষা বসতির কারণে ঝুঁকি বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আসন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে চট্টগ্রাম–৪ (সীতাকুণ্ড–পাহাড়তলী), যেখানে ১২৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম–১৬ (বাঁশখালী) আসনে ১১২টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে। দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপে (চট্টগ্রাম–৩) ৮৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৪টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে যোগাযোগ সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে চট্টগ্রাম–১ (মীরসরাই–জোরারগঞ্জ) আসনের ১০৬টি কেন্দ্রের কোনোটিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
নগর এলাকায় খুলশী থানার ৪৬টির মধ্যে ৪৪টি কেন্দ্র এবং আকবরশাহ থানার সব ২২টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বন্দর থানায় কোনো কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। চান্দগাঁও এলাকার শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র, আল হিকমা স্কুল, কালা মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক কেন্দ্রকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রামের ১৬টি থানার মধ্যে ৬টি থানায় অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারের হিসাবে ৮১৫টি অস্ত্রের মধ্যে ৬১৭টি উদ্ধার হলেও এখনো ১৯৮টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, যা নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিএইচআরএফ পর্যবেক্ষক দল আচরণবিধি লঙ্ঘন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনুচিত হস্তক্ষেপ, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল ও দুর্গম এলাকায় ভোটগ্রহণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা থাকলেও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে আরও দৃশ্যমান ও সমন্বিত প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে।
প্রতিবেদনে ১৮ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষক নিয়োগ, দুর্গম এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা, সিসি ক্যামেরা ও বডি ক্যামেরা ব্যবহার বৃদ্ধি, গুজব ও অপপ্রচার মনিটরিং এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া টিম ও মোবাইল কোর্ট সক্রিয় করা। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও কার্যকর প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব।










