গ্রামের পথে মানুষের ঢল 

টানা ৪ দিনের ছুটি নগরের প্রবেশমুখ, বাস ও রেল স্টেশনে ভিড়, দুর্ভোগ

হাসান আকবর | বুধবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ

ভোটের টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ। চারদিনের টানা ছুটি ঘিরে শহর থেকে গ্রামের পথে মানুষের ঢল নেমেছে। বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনের পাশাপাশি নগরীর মোড়ে মোড়ে ঘরমুখো মানুষের ভিড়। ঈদের আমেজ নিয়ে শহর ছাড়ছে লাখো মানুষ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় যেন উৎসবের আমেজ। কিন্তু এই যাত্রাপথে অপেক্ষা করছে ভোগান্তি। রাস্তায় রাস্তায় যানবাহনের তীব্র সংকটে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

গতকাল চট্টগ্রামের প্রবেশমুখগুলোসহ মোড়ে মোড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক গাড়ি। ৪০/৫০ টাকার ভাড়া নেয়া হচ্ছে ১শ টাকা করে। অনেক পরিবহন কোম্পানির শ্রমিকেরা দূরদূরান্তের ভাড়াও একইভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ বাসেই ‘সিট’ না থাকায় বহু যাত্রীকে ভোগান্তিতে পড়তে দেখা গেছে। শহর থেকে প্রচুর গাড়ি যাত্রী নিয়ে বের হওয়ায় শহরের প্রবেশমুখগুলোতে গত সন্ধ্যার পর থেকে তীব্র যানজট দেখা দিয়েছে।

ট্রেনেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। টিকেট নেই, তবুও স্ট্যান্ডিং টিকেট নিয়ে হাজার হাজার মানুষ ট্রেনের ছাদে এবং দাঁড়িয়ে বাড়ি ছুটছে। এদিকে শহর ফাঁকা হতে শুরু করেছে। সিএনজি টেক্সি এবং রিকশার সংখ্যাও অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। শহরে কমে গেছে গণপরিবহন। এতেও মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট উপলক্ষে আজ থেকে দুদিনের সাধারণ ছুটির সাথে দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটি মিলে চারদিনের ছুটি শুরু হচ্ছে। ঈদের মতো লম্বা এই ছুটিতে ভোট দিতে হাজার হাজার মানুষ গ্রামে ছুটছেন। আবার অনেকে ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন। সবকিছু মিলে রাস্তায় হাজার হাজার যাত্রীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে যান চলাচলে প্রভাব পড়ে।

ছুটি আজ থেকে শুরু হলেও গতকাল সকাল থেকে হাজারো মানুষ বাড়ি ফিরতে পথে নামেন। সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে শত শত মানুষকে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। বিশেষ করে এ কে খান, নতুন ব্রিজ, এবং অক্সিজেন এলাকার শহরের প্রবেশমুখে মানুষের বড় জটলা দেখা গেছে। শেষ কর্মদিবস থাকলেও গতকাল অনেক মানুষ আগে থেকে ছুটি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে গ্রামের পথে রওনা হন। বহদ্দারহাটসহ অন্য বাস টার্মিনালগুলোতে ঈদের মতো ভিড় দেখা গেছে। ঈদের মতো আগাম টিকিট বিক্রি হয়েছে বিভিন্ন বাস কোম্পানির। গতকালের টিকেট অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে বলে কয়েকটি পরিবহনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বাস সংকটের কারণে পরিবহন শ্রমিকরা কয়েক গুণ বাড়তি ভাড়া আদায় করায় সাধারণ যাত্রীরা অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বেশ কয়েকজন যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের জন্য বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু এই যাত্রা সহজ হচ্ছে না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে অনেক যাত্রী বিপাকে পড়েছেন। বাড়তি টাকা দিতে চেয়েও বাসে ঠাঁই না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন অনেকে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, কুমিল্লাসহ উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের লাখো মানুষ ভোগান্তি সয়ে ভোট দিতে গ্রামে ছুটছেন। যাত্রীরা বলেছেন, ঈদের সময়ও টিকেটের এমন আকাল থাকে না, এত বেশি ভাড়া দিতে হয় না।

গতকাল সন্ধ্যার পর শহরের প্রধান প্রবেশমুখ সিটি গেট থেকে উভয় দিকে যানজটে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। পুলিশ যানজট সামলানোর চেষ্টা করলেও সফল হচ্ছে না বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

নতুন ব্রিজ এলাকায় মানুষের অপেক্ষা : আজাদীর কর্ণফুলী প্রতিনিধি জানান, গতকাল বিকাল ৩টার দিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশমুখের নতুন ব্রিজ এলাকায় গাড়ির অপেক্ষায় ছিল হাজারো মানুষ। তাদের গন্তব্য দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে। কিছুক্ষণ পরপর একটি গাড়ি এলে যাত্রীরা হুড়মুড় করে চড়তে চাচ্ছেন। হুড়োহুড়ি করে উঠতে গিয়ে একেকজনের ত্রাহি অবস্থা। অনেকে এই যন্ত্রণা এড়াতে মোটরসাইকেলে চড়ছেন। কারো চেষ্টা ছিল সিএনজি টেঙি নেওয়ার। তাতেও বিপত্তি, ভাড়া দ্বিগুণ। ওইদিন বিকালে মইজ্জ্যারটেক মোড়েও যানবাহনের সংকট দেখা যায়।

যাত্রীদের অভিযোগ, যানবাহনের নৈরাজ্য বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে চলে। এখন ভোটের বন্ধে বাড়ি ফিরতে ২০ টাকার ভাড়া ৬০ টাকা, ৪০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা দিতে হচ্ছে।

নতুন ব্রিজে গাড়ির অপেক্ষায় থাকা চাকরিজীবী বাদশা মিয়া বলেন, বাস ও সিএনজি টেঙি চালকদের কাছে যাত্রীদের কোনো মূল্য নেই। আমরাও অসহায়, যেতে তো হবেই।

নতুন ব্রিজ থেকে মোটরসাইকেলে ওঠা ইকবাল হাসান বলেন, এবার ভোটের জন্য সরকার ছুটি দিয়েছে। আমি ভোট দিতে বাড়ি যাচ্ছি। ভোট উপলক্ষে কয়েকদিন ছুটি কাটাতে পারব। আমি চাতরী চৌমুহনী যাব। ভাড়া চাচ্ছে ২৫০ টাকা। গাড়ি পাচ্ছি না, তাই বাড়তি ভাড়া দিয়ে যেতে হচ্ছে।

যানবাহন শ্রমিকেরা বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক গাড়ি সড়কে নামছে না। বাস কম থাকায় যাত্রীর চাপ বেশি। চালকরা ভয় পাচ্ছেন, চেকপোস্টে ঝামেলা হতে পারে। তাই অনেক মালিক গাড়ি নামাচ্ছেন না। এর ফলে যারা চালাচ্ছে তারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।

কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ (টিআই) আবু সাঈদ বাকের বলেন, এই মুহূর্তে পুলিশ নির্বাচনি ডিউটি নিয়ে ব্যস্ত। তারপরও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ এবং যানজটমুক্ত রাখতে কাজ করছি।

নির্বাচন উপলক্ষে মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত টানা ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ করেছে সরকার। পাশাপাশি ভোটগ্রহণের আগের দিন বুধবার রাত ১২টা থেকে ভোটের দিন বৃহস্পতিবার রাত ১২টা পর্যন্ত টেঙি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাড়ি যাওয়ার বাস না পেয়ে চবির ফটকে চাকসুর তালা
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক খোকনের জামিন