জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল দেশের সব খাতে স্থিতিশীলতা ফেরার পাশাপাশি সুশাসন ফিরে আসবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শগত মতপার্থক্য থাকলেও প্রতিশোধমূলক রাজনীতি থাকবে না। বিভিন্ন খাতে শৃঙ্খলা ফেরার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও গতিশীলতা ফিরে আসবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশকিছু বিষয়ের ইতিবাচক পরিবেশ ফিরলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক রূপান্তর হলেও অর্থনীতির গতি তৎপরতা বাড়ানোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ইন্টেরিম ব্যালেন্স–শিট’ শীর্ষক এ ভার্চুয়াল সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
সাবেক বাণিজ্য সচিব ফারুক আহমদ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমার মনে হয়, ২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সময় আমাদের সামনে বেশকিছু বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে দুটি প্রত্যাশা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে আসে। প্রথমটি ছিল–দীর্ঘদিন ধরে যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল এবং যেগুলো সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিকীকরণে আক্রান্ত হয়েছিল, সেগুলোকে সংস্কারের মাধ্যমে জনবান্ধব ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করা। যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবা করতে পারে, দুর্নীতি কমে এবং সুশাসনের একটি ভিত্তি তৈরি হয়। দ্বিতীয় প্রত্যাশাটি ছিল, এই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কারগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।’
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুনুর রশীদ বলেন, ‘২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিক এবং দ্বিতীয় প্রান্তিক বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই অর্থনীতি গতিশীলতায় ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তত পতনটা ঠেকানো গেছে। সেই ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় কিছুটা আমরা ভিজিবল ইমপ্রুভমেন্ট দেখতে পেয়েছি। সামপ্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতির কিছু সূচকে সীমিত হলেও দৃশ্যমান উন্নতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ম্যাক্রো অর্থনৈতিক ভিত্তিতে (ম্যাক্রো ফান্ডামেন্টালস) কয়েকটি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করা।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘দেশের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ব্যবসার পরিবেশ বর্তমানে খুব একটা স্বস্তিকর অবস্থানে নেই। ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাইভেট সেক্টরের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ২০ শতাংশে, যা সামপ্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় ম্যানুফ্যাকচারিং ও রিটেইল খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শহরের রিটেইল ব্যবসা, এসএমই খাত–সব জায়গায়ই সংকট প্রকট। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৪৫–৫০ শতাংশ এসএমই এরই মধ্যে কার্যত দেউলিয়া হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষিত বেকারত্ব। চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের বাজার সংকুচিত হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি নেতিবাচক ইঙ্গিত।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, অর্থনীতির গতি সঞ্চার করার জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি সহায়তা ও স্বচ্ছতা থাকলে বিনিয়োগকারীরা আবার সাহস পাবেন। বর্তমানে অনেক উদ্যোক্তা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঘাটতিসহ নানা কারণে ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় ছিলেন। এর ফলে ব্যবসার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছে। তাঁরা বলেন, দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে, কিন্তু বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সুদের হার নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং ব্যবসায়িক প্রণোদনা–এই তিনটি দিকেই জোর দিতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের সতর্ক ভারসাম্যে আছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে, রিজার্ভ বাড়ছে, রাজস্ব আদায়ও উন্নতির পথে। কিন্তু বিনিয়োগের গতি না বাড়লে এই স্থিতিশীলতা টিকবে না। বিনিয়োগে স্থবিরতা, ঋণ সংকোচন এবং উচ্চ সুদের হার এখন অর্থনীতির প্রধান বাধা। এই তিন সমস্যার সমাধানেই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা।








