বন্দরের কার্যক্রমে স্থবিরতা

তিন দিনে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন আজ সকাল থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ডাক স্কপের মিছিলে বাধা, প্রতিরোধের মুখে হয়নি বার্থিং সভা কর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার ও এনসিটি ইজারার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি

আজাদী প্রতিবেদন | মঙ্গলবার , ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ

নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওর্য়াল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিককর্মচারীদের ডাকা কর্মবিরতির গতকাল তৃতীয় দিন পার হয়েছে। তিন দিনে মোট ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতিতে স্থবির ছিল বন্দরের কার্যক্রম। আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ হচ্ছে বন্দরের স্বাভাবিক কর্মপ্রবাহ।

আন্দোলনের এই সময়কাল আরো বাড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিরোধের মুখে গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থিং সভা হয়নি। এতে করে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের জেটিতে নোঙর করা সম্ভব হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে। অপরদিকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ স্কপ গতকাল কালো পতাকা মিছিল বের করেছে। পুলিশি বাধার মুখে মিছিলটি মাঝপথে শেষ হলেও তারা আন্দোলনে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। স্কপ আজ সকালে বন্দর অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

জানা যায়, বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা তৃতীয় দিনের কর্মবিরতির কারণে গতকাল সকাল ৮টা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে জাহাজ থেকে কন্টেনার ও পণ্য ওঠানামাসহ প্রায় সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থিং মিটিংও গতকাল হয়নি। এতে করে কোন জাহাজ কোন জেটিতে ভিড়বে বা কোন জাহাজ বাইরে চলে যাবে সেসব কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হতে পারেনি। শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে আমদানি পণ্যের ডেলিভারি, কন্টেনার হ্যান্ডলিং, বন্দরের ভেতরে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। এতে অচলাবস্থা তৈরি হয়। তবে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য খালাস স্বাভাবিক রয়েছে।

গতকাল দুপুরে বারিক বিল্ডিং থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত এলাকায় শত শত গাড়িকে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বন্দরের গেটগুলো খোলা থাকলেও কোনো গাড়ি প্রবেশ কিংবা বাইরে বের হতে দেখা যায়নি।

শ্রমিককর্মচারীদের ডাকা কর্মবিরতির কারণে বন্দরে গতকাল তৃতীয় দিনের মতো এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। কর্মবিরতি চলাকালে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের উপদেষ্টা, পিপিপির চেয়ারম্যান, বন্দরের চেয়ারম্যানসহ তাবেদার একটি চক্র এনসিটিকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চান। শ্রমিককর্মচারীরা অবিলম্বে তাদেরকে অপসারণ করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরসহ আন্দোলনে জড়িত ১৬ জন কর্মচারীকে ঢাকার পানগাঁও আইসিটি ও কমলাপুর আইসিডিতে বদলি করেছে। এসব বদলি আদেশ প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এছাড়া এনসিটি বিদেশি কোম্পানির হাতে ন্যস্ত করার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যথায় আরো কঠিন কর্মসূচি দেয়া হবে বলে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্রিফিংয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন সমন্বয়ক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খোকন, আনোয়ারুল আজিম, ফরিদুর রহমান, শামসু মিয়া টুকু প্রমুখ।

চট্টগ্রাম বন্দরের বেসরকারি বার্থ অপারেটর ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, তৃতীয় দিনের মতো আমরা কাজের জন্য কোনো শ্রমিককে বুকিং দিতে পারিনি। জেনারেল কার্গো বাথে কর্মবিরতি চলাকালীন কোনো কাজ হচ্ছে না।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দর শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খোকন বলেন, সকাল ৮টা থেকে বন্দরের অভ্যন্তরে কোথাও কোনো কাজ হচ্ছে না। সকলে স্বতস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। তিনি বলেন, আজ সকাল ৮টা থেকে বন্দরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি চলবে। প্রয়োজনে আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনি ও রোববার দুইদিনে ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতির ডাক দেয় বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। রোববারের কর্মসূচি শেষে গতকালও ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে করে গত তিন দিনে মোট ২৪ ঘণ্টা বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। আজ সকাল ৮টা থেকে পুনরায় ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

অপরদিকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে গতকাল সকালে বন্দর অভিমুখে কালো পতাকা মিছিল ও সমাবেশ করেছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। বেলা ১১টায় নগরীর আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে স্কপের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে বন্দর অভিমুখে কালো পতাকা মিছিল শুরু করেন। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর বারিক বিল্ডিং মোড়ের আগে তাদের মিছিল থামিয়ে দেয় পুলিশ। তাদেরকে সামনে এগোতে বাধা দেওয়া হয়। স্কপের কর্মসূচি থেকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবি জানানো হয়।

স্কপনেতা এস কে খোদা তোতনের সভাপতিত্বে এবং টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খানের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রামের সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, আবদুল বাতেন, রিজওয়ানুর রহমান খান ও ফজলুল কবির মিন্টু। বাদামতলী থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি যমুনা ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। স্কপের পক্ষ থেকে আজ সকাল ১১টায় সিমেন্স হোস্টেল ও ইসহাক ডিপো পয়েন্টে বন্দর অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রথম দিনের কর্মবিরতির পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী ৪ জনকে তাৎক্ষণিক বদলি করে। একদিনে কর্মবিরতিতে রাজস্ব ক্ষতি নিরূপণ করতে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও করে তারা। রোববার আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত আরো ১২ জনকে বদলি করা হয়েছে। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দর ও আশেপাশের এলাকায় গত শনিবার রাত ১২টা থেকে পরবর্তী এক মাস সকল প্রকার সভা সমাবেশ ও মিছিল সমাবেশ নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সিএমপি। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে
পরবর্তী নিবন্ধ৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে নতুন করে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ