আমাদের প্রিয় বেলাল মামা। যাঁর স্নেহ আর ভালোবাসার ফল্গুধারায় সিক্ত আমাদের শৈশব আর কৈশোর। বড় হয়ে তাঁকে আবিস্কার করলাম সততা আর আদর্শের বিরল এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। পড়াশোনার প্রয়োজনে মামা তাঁর বড় বুবু– আমার আম্মার সাথেই ঢাকা থাকতেন। দেখতে মামা আর আম্মার এত মিল মনে হয় যেন বেলাল মামা– আম্মার মেইল ভার্সন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মামা সেসময়কার জেন জি। আম্মার চোখকে ফাঁকি দিয়ে মেট্রিক পরীক্ষার্থী দেশপ্রেমিক কিশোর বেলায় চলে গেলেন রণাঙ্গনে। প্রচণ্ড আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মামা পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটও নেননি, নেননি কোনো সরকারি সুযোগ সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য বেছে নেন বাংলা সাহিত্য। তাঁর সংগ্রহে নানু বাড়ির সমৃদ্ধ লাইব্রেরি আমার বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। ঢাকা থেকে ছুটিতে নানু বাড়ি আসলে ইচ্ছা মতো বই পড়তাম মানে বড়োদের উপন্যাস…বাধা দেয়ার কেউ নেই। কত শত স্মৃতি! দীর্ঘ দুই যুগ কানাডা প্রবাসী মামা যখনই দেশে ফিরতেন ভাগনা ভাগ্নীদের জন্য উপহারে বোঝাই থাকতো তাঁর স্যুটকেস। পুরো কানাডা পারলে উড়িয়ে আনেন। স্যুটকেস খুললেই চমৎকার সেই বিদেশী মনমোহনীয় সুঘ্রাণ এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। অন্য বোনদের চেয়ে বয়সে ছোট ছিলাম দেখে আমার জন্য বরাদ্দ থাকতো সবচে সুন্দর গিফটগুলো।
আমার জন্মদিনটা শুরু হতো কানাডা থেকে ফোন কলে –মামার শুভেচ্ছাবাণী দিয়ে। হাতের লিখা এত সুন্দরও হয় মানুষের! বৃত্তিপরীক্ষার সাফল্য বা কোন উপলক্ষ্যে শতযুগ আগে ছোট্ট সোমাকে পাঠানো মামার হাতে লিখা কার্ডগুলো আমার পরম সম্পদ। শিশুকালে আমার গান সবাই খুব পছন্দ করতো। হারমোনিয়ামের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ আমার জন্য বেশ দুরূহ হয়ে উঠেছিলো। ব্যাপারটা মামা কোনভাবে জানতে পেরেছিলেন। আমার এগারোতম জন্মদিনে প্রিয় ভাগ্নিকে আনন্দে বিহ্বল করে দিয়ে সেই সুদূর কানাডা থেকে অর্ডার দিয়ে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দিলেন তখনকার সবচে ভালো মানের হারমোনিয়াম…যা ছিলো আমার জীবনে পাওয়া সবচে বড সারপ্রাইজ গিফট। অন্যের জন্য খরচ করতে এতো পছন্দ করতেন! লক্ষ লক্ষ টাকা দান করে গেছেন অসহায় পরিবারদের মাঝে। আমার মামাই ছিলেন আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য উপহার যা আমরা আজ হারিয়ে ফেলেছি। রিক্ত, শূন্য হৃদয় নিয়ে কি লিখছি আমি জানিনা। গার্ড অব অনারসহ যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয় উত্তর কাট্টলী বড় মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে। মহান আল্লাহ তাঁর কবরকে প্রশস্ত করে দিন, তাঁকে বেহেশতের সুশোভিত বাগানে স্থান দিন এই প্রার্থনা করি।












