আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা (রেসিপ্রোকাল) শুল্কহার নিয়ে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির একটা তারিখ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে চুক্তির খসড়া এবং এই তারিখেই স্বাক্ষর করার জন্য একটা অনুমোদন চেয়ে আমরা সামারি পাঠিয়েছি। এটা এলে পরে আমরা চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারব। গতকাল রোববার দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সচিব এ কথা বলেন। খবর বাংলানিউজের।
বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রথমে ৩৭ শতাংশ এবং পরে ৩৫ শতাংশ ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণা করে আলোচনার সুযোগ রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফার আলোচনা শেষে গত ৩১ জুলাই পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে এ জন্য দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিসহ বাংলাদেশকে বেশ কিছু ছাড় দিতে হয়। শুল্ক কত শতাংশ হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, বাংলাদেশের রেসিপ্রোকাল শুল্কহার ২০ শতাংশ আছে। অন্যান্য দেশে একই আছে। আবার অনেক দেশে বেশি আছে। তবে আমরা আশা করছি হয়তো কিছু কমতেও পারে। সে ধরনের একটা ধারণা আছে। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারব না, এখনো নিশ্চিত হয়নি। খসড়া করেছি, তবে শুল্ক কত হবে সেটা নির্ধারণ করতে ৯ তারিখের আগ পর্যন্ত সময় নেওয়া হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সুবিধা পেতে বাংলাদেশকেও বেশ কিছু ছাড় দিতে হচ্ছে।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্কের হার কমিয়ে ২০ শতাংশ কার্যকর করলেও দেশটির সঙ্গে কোনো চুক্তি হয়নি। পরে এই শুল্কহার আরও কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলায় উৎপাদিত পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ে আলোচনা অব্যাহত রাখে ঢাকা, যা চূড়ান্ত হয়ে চুক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। সমপ্রতি ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটা এফটিএ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, এটা নিয়ে সরকার কি উদ্বিগ্ন, এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, এখানে উদ্বেগের কিছু নেই। আমরা তৈরি পোশাক খাতে আমাদের সক্ষমতা অর্জন করেছি গত ৪৫ বছর ধরে এবং আমরা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম অবকাঠামো আমাদের আছে তৈরি পোশাক খাতে। এটা আপনাকে বুঝতে হবে। এখন এই সক্ষমতা আরেকজন ওভারনাইট অর্জন করে ফেলেছে, এটা আমাদের কাছে মনে হয় না।
তিনি বলেন, আপনারা জানেন ভারত বেসিক টেঙটাইলে বেশ ভালো, অনেক স্ট্রং, ওয়ার্ল্ডে তাদের ভালো অবস্থান আছে। কাজেই সেই অবস্থায় তারা আছে। আমাদের র মেটেরিয়ালও তাদের কাছ থেকে প্রোকিউর করি। কাজেই এই দুই দেশ এখনো কমপ্লিমেন্টারি অবস্থায় আছে। যেমন তারা উপকরণ উৎপাদন এবং তাদের বেসিক কটনটাও আছে, তাদের যা লাগে পুরোটাই আছে। ফলে ভারত আমাদের সঙ্গে এই ব্যাপারে কম্পিটিটর না, কমপ্লিমেন্টারি।
এলডিসি উত্তরণের পরে তো বাংলাদেশ অনেক সুযোগ–সুবিধা হারাবে, অনেক শুল্ক নতুন যুক্ত হবে। সেক্ষেত্রে কি এফটিএর ক্ষেত্রে সরকার নতুন করে কিছু ভাবছে? এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, হ্যাঁ আমরা অনেকগুলো দেশের সঙ্গে এফটিএ করছি। আমরা জাপানের সঙ্গে এফটিএর টোটাল নেগোসিয়েশন শেষ করেছি। আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষর করব। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার আমাদের দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফা নেগোসিয়েশন সম্পন্ন হয়েছে। আশা করি এই বছরের মধ্যে তাদের সঙ্গে স্বাক্ষর হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কাছে আমরা এফটিএর জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছি এবং অন্যান্য যে সমস্ত মার্কেটে আমরা এখন শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাই, সবগুলোর কাছেই আমাদের প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমরা সেখানে আলোচনা সহসাই শুরু করব।
রমজানের প্রস্তুতির ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রমজানের বাজার নিয়ে এবং নিত্যপণ্যের মূল্য ও রমজান মাসভিত্তিক স্পেসিফিক যে সমস্ত পণ্যের বাজার ওঠানামা করে সেগুলোর সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছি। এ বছরের অবস্থা ভালো।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং কেনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, আমাদের বিমান ক্রয়ের ব্যাপারটা তো আলোচনায় আছে। আমাদের বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমেরিকার সঙ্গে এই চুক্তির আগেও তাদের পরিকল্পনা ছিল। আমাদের সঙ্গে শুধু বোয়িংই না, অন্যান্য এয়ারের সঙ্গে আলোচনা ছিল। তো সেটা একটা মোটামুটি স্ট্রাকচার রূপ পেয়েছে। আমেরিকান রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের প্রসঙ্গে যেহেতু প্রসঙ্গটা আসছে, তখন তো ওইটা আমরা যতটুকু জানি, শুনেছি, তাদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চলছে। তিনি বলেন, বোয়িং তারা কতগুলো, কোন বছর সরবরাহ করতে পারবে, কী দাম হবে, আমাদের বোয়িংয়ের ভেতরের কনফিগারেশন কী হবে, এ বিষয় নিয়ে নেগোসিয়েশন আছে, সেটা চলছে।
এখানে কি যুদ্ধবিমানও আছে, এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, যুদ্ধবিমান এই চুক্তির আওতায় কখনোই আসবে না। মিলিটারি ইস্যুটা কখনো ট্রেড ইস্যুতে থাকে না।
গত ছয় মাসে রপ্তানি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ নেগেটিভ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম হয়নি। তো এটা নিয়ে কি সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে? এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, আমরা পর্যালোচনা করেছি। বিশ্ববাণিজ্যে আপনার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ডেফিসিট হয়েছে। আমরা তো পৃথিবীর বাইরে না, ওই হিসেবেই আমাদের ওপরেও। তবে আমাদের ৩ শতাংশ নেগেটিভ নাই। আমাদের ১ দশমিক ৬ শতাংশ লাইক দ্যাট। তবে আমাদের গ্লোবাল এভারেজের চেয়েও আমরা একটু ভালো অবস্থায় আছি।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাক ওই দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, চুক্তিতে এ বিষয় থাকবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্বিপাক্ষিক সব চুক্তিতে যেন সংশ্লিষ্ট দেশের কাছ থেকে একটা উপকরণ আনলে সেটার উপরে সেই দেশে এক ধরনের একটা কিউমুলেশন বেনিফিট পাওয়া যায়, আমরা ওটা তো আশা করছি এবং ওটা যে একদম চুক্তিতে থাকতে হবে এমনও নয়। এটা প্রগ্রেসিভ ব্যাপার। হয়তো এরকম কিছু সুবিধা সব দেশেই পায় বলেই কিন্তু এ ধরনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে। না হলে তো করে কোনো লাভ নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে উৎপাদিত পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলায় তৈরি পোশাক দেশটি শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে তা উভয়পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানি বাড়বে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিও বাড়বে।
বাংলাদেশ টেঙটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৪৬ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৭৮ মিলিয়ন ডলার। এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার এখনো যুক্তরাষ্ট্রই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬০০ কোটি ডলার থেকে কমাতে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেড় বিলিয়ন বা ১৫০ কোটি ডলার আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনবে সরকার। এতে স্থানীয় মুদ্রায় খরচ হতে পারে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া কিছুটা বাড়তি দামে পাঁচ বছর মেয়াদে প্রতিবছর সাত লাখ টন করে গম আমদানি করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক পণ্য, বেসামরিক উড়োজাহাজ যন্ত্রাংশ আমদানি বাড়াবে বাংলাদেশ এবং জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেল, গম ও তুলা আমদানি বাড়ানো এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হবে।












