এখন প্রয়োজন নালা খালগুলোর নাব্যতা বাড়ানো

জামাল উদ্দিন বাবুল | শনিবার , ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২২ পূর্বাহ্ণ

জলাবদ্ধতা নিরসনে নেয়া পরিকল্পনার অধীনে গত বর্ষা মৌসুমের পূর্বে সিটি করপোরেশন ও সেনা বাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিগ্রেড এর অধীনে এরই মধ্যে নগরের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নালা খাল এর সংস্কার কাজের আংশিক অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও পুরো প্রকল্প শেষ না হওয়া অবধি এর সুফল সম্পর্কে আগাম কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে এবছর বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে জলজটের স্থিতি দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ায় জনজীবনে স্বস্তি ছিল। এর কৃতিত্ব সাবেক মেয়র যাঁরা ছিলেন তাঁরা সহ বর্তমান মেয়রের একথা অকপটে স্বীকার করতেই হবে। অতীতে যে সব মেয়র মহোদয়রা ছিলেন তাঁদের একটা প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ ছিল কি ভাবে জলজট ও জলাবদ্ধতা নিরসন করা যায় এবং সেই লক্ষ্যে তাঁরা বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। এজন্য তাঁরাও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। যে কোনও সমস্যা সমাধানে চাই নিখুঁত পরিকল্পনা। অতীতের ভুল সিদ্বান্ত কিংবা ত্রুটি যুক্ত পরিকল্পনার জন্য কাউকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক নয়। প্রশাসনিক অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং সমম্বয়হীনতার কারণে অনেক সময় সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয় না। তবে মনে রাখতে হবে ভবিষ্যতে যাতে একই ভুলের মাসুল যেন জনগণকে দিতে না হয়। ইতিমধ্যে ২য় দফায় পূর্বে অসমাপ্ত খাল সংস্কার এবং খাল পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এর কাজ শুরু হয়ে গেছে। আগামী কয়েক মাস যদি ভারী বৃষ্টিপাত না হয় তা হলে আশা করা যায় জনগণকে তেমন কোন দুর্ভোগ পোহাতে হবে না।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এর আওতায় নগরের আয়তন ১৫৫৪ বর্গ কিলোমিটার। এ নগরে ৪১ টি ওয়ার্ড রয়েছে। বড় সড়ক রয়েছে ১২ টি এবং অলিগলি রয়েছে প্রায় ৮ হাজারের বেশি। নগরের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া খাল আছে ৫৭ টি আর নালা নর্দমা আছে ৫,৫২৭ টি। এসব নালা নর্দমা আর খাল গুলো নাব্যতা হারিয়েছে অনেক আগে। নগরের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নালা নর্দমার মাধ্যমে বাসা বাড়ির বর্জ্য পদার্থ, ককসিট, পলিথিন, কোমল পানীয়ের বোতল ও ভাঙা তৈজসপত্র ইত্যাদি স্থানে স্থানে স্তূপাকারে জমে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় কিছু কিছু বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া তাদের লাগোয়া নালা নর্দমা ও খালে ময়লা আবর্জনা ফেলে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি করছে। সিটি করপোরেশন এর পক্ষ থেকে এব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য বারবার প্রচার প্রচারণা থাকলেও কোন কাজ হচ্ছে না। এজন্য কঠোর আইন করে বিধি লঙ্ঘনকারীকে জরিমানার আওতায় আনা দরকার।

খালের দু পাশে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা কালে পাকা দালান কোঠা ও টাওয়ার এর ভগ্নাংশ ও দেয়ালের ইট বালি রাবিশ কাদামাটি ইত্যাদি অপসারণ না করায় তা স্তুুপ হয়ে পানি প্রবাহের গতিপথ বাধাগ্রস্ত করছে। খালের পানিতে ভেসে যাওয়া পলিথিন এর পুরো আস্তরণ কর্ণফুলী নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদীর গভীরতাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। শক্তিশালী ড্রেজার দিয়েও এসব পলিথিন অপসারণ করা যাচ্ছে না।

চলতি বছরের আদম শুমারীর হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার জনসংখ্যা ৩০ লাখ ৭০ হাজারের মত। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়েছে আবাসন সংকট। গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও টাওয়ার। আগে যে এলাকায় লোক বসতি ছিল অনেক কম সেখানে সুউচ্চ টাওয়ার নির্মিত হওয়ায় জনবসতির হার অনেক বেড়ে গেছে। স্বাভাবিক ভাবে সড়ক পার্শস্থ নালাগুলোতে ঐসব টাওয়ারের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন ব্যবহার করা পানির চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। এখানে উল্লেখ্য যে এসব নালাগুলোর প্রশস্ততা ও গভীরতা না বাড়ায় হালকা বৃষ্টি হলে ডুবে যায় অলি গলি রাজপথ, কারণ পানির ধারণ ক্ষমতা কমে যায়, স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন। অবিলম্বে এসব নালা গুলোকে প্রশস্ত করা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংষ্কার করে গভীরতা না বাড়ালে জলজট থেকে সহজে রেহাই মিলবে না। ২০২৫২৬ অর্থ বছরে সিটি করপোরেশন এর প্রস্তাবিত বাজেট ২,১৪৫,৪২ কোটি টাকা, এর মধ্যে ১০০ কোটি টাকা নালা পরিষ্কারের জন্য প্রস্তাব করা হলেও ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খালের পাড়ে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ এর কাজ প্রায় ৭০% শতাংশ শেষ হয়েছে। আশা করা যায় বর্ষা মৌসুম শেষ হলে পুনরায় কাজ শুরু হবে এবং আগামী বর্ষার আগে জলাবদ্ধতার পরিমাণ কমবে তবে তার আগে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে খালগুলো ড্রেজিং করে এর নাব্যতা বাড়াতে হবে। খালের পাড় ঘেঁষে দুপাশে জন চলাচলের জন্য সড়ক নির্মাণের যে প্রকল্প রয়েছে তা যেন অব্যাহত থাকে সে ব্যাপারে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এছাড়া সিটি করপোরেশন ইতিমধ্যে ডোর টু ডোর ময়লা সংগ্রহ করার জন্য জনবল নিয়োগ দিয়েছে। জনবান্ধব এ কর্মসূচী যেন মাঝ পথে থেমে না যায় সচেতন নাগরিক সমাজ তা প্রত্যাশা করে। আমরা সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাবো সরকার ও সিটি করপোরেশন গৃহীত জনকল্যাণমুখী সকল কর্মকাণ্ড সফল করে তুলতে ঐক্যবদ্ধভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে সবাই যেন এগিয়ে আসে। নগরের বাসিন্দাদের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন অচিরেই জলাবদ্ধতামুক্ত একটি নগর গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

লেখক: সভাপতি, নবীন মেলা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপারিবারিক মিলনমেলা- আত্মিক সম্পর্কের মেলবন্ধন
পরবর্তী নিবন্ধসুযোগ, ঝুঁকি এবং বাংলাদেশি বাস্তবতা