যে কোনো নির্বাচনে ভোটারদের মন কাড়তে প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের ডালা নিয়ে হাজির হন প্রার্থীরা। যেন নির্বাচন মানেই প্রতিশ্রুতি! ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী চট্টগ্রামের–১৬ আসনের প্রার্থীরাও ভোটারদের দিচ্ছেন নানা উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি। তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো এমন, বিজয়ী হলেই উন্নয়নের মোড়কে পাল্টে দিবেন সংসদীয় এলাকা বা চট্টগ্রামকে। প্রচারণার অংশ হিসেবে আয়োজিত গণসংযোগ, পথসভা, উঠান বৈঠক ও মতবিনিময় সভাসহ সব আয়োজনেই তারা প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসাচ্ছেন ভোটারদের। অবশ্য ভোটাররা বলছেন, নির্বাচন এলে প্রতিশ্রুতি দেয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিশ্রুতিগুলো যেন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। ভোটের পরও যেন প্রার্থীরা মনে রাখেন।
চট্টগ্রামের সংসদীয় আসনের বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের ইতোমধ্যে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এ খাতে উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতে ভূমিকা রাখা, শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখাসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। যেন বিজয়ী হলে তারা দূর করবেন নির্বাচনী এলাকার সমস্ত সমস্যা। পাশাপাশি উদ্যোগ নিবেন নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টির। এমনকি সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নেয়ারও কথা বলছেন অনেক প্রার্থী।
এদিকে ৬০ বর্গমাইলের সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এলাকায় রয়েছে তিনটি ( চট্টগ্রাম– ৯, ১০ ও ১১) সংসদীয় আসন। এছাড়া চট্টগ্রাম–৮, চট্টগ্রাম–৪ ও চট্টগ্রাম–৫ আসনের আংশিক পড়েছে চসিক এলাকায়। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে চসিক এলাকায় সংসদ সদস্যদের ব্যাপকভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করার সুযোগ সীমিত। সাধারণত, সংসদ সদস্যগণ তাদের চাহিদা সিটি কর্পোরেশনকে অবহিত করেন এবং কর্পোরেশন সেই চাহিদার ভিত্তিতে প্রকল্প তৈরি করে। চসিকের বাইরে নগরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। অর্থাৎ সিডিএ ও চসিক যেভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করতে পারবে সংসদ সদস্যদের সেভাবে সুযোগ নেই। এরপরও নগরকে ঘিরে শহর এলাকার সংসদীয় আসনগুলোর প্রার্থীদের উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির শেষ নেই। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহর এলাকা থেকে নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদ সদস্যদের চট্টগ্রামেই যে কাজ করতে হবে এমন না। তারা জোরালো ‘লবিস্ট’ হিসেবে কাজ করতে পারেন। চট্টগ্রামের এজেন্ডাকে বাস্তবায়নে তারা ‘সহায়ক শক্তি’ হিসেবে কাজ করতে পারবেন। চট্টগ্রামের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যেসব প্রকল্প ঢাকায় পাঠানো হয়, সে সে জায়গায় তারা ‘লবিস্ট’ হিসেবে কাজ করতে পারবেন। তারা সরকারকে প্রস্তাব দিতে পারবেন। কাজ আদায় করতে পারবেন এবং সরকারকে ‘কনভিন্স’ করতে পারবেন।
মোজাম্মেল নামে চট্টগ্রাম–৯ আসনের এক ভোটার আজাদীকে বলেন, প্রার্থীরা পূরণ করতে পারবেন বলেই হয়তো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আশা করি বিজয়ী হওয়ার পর প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যাবেন না। আশা করব, তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো যেন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে।
প্রার্থীদের নানা প্রতিশ্রুতি : চট্টগ্রাম–৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ চান্দগাঁওয়ে গণসংযোগ চলাকালে এলাকার প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ’র সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া রাস্তাঘাট, মসজিদ, মন্দিরের উন্নয়নসহ নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার দিকে মনোনিবেশ করতে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণেরও আশ্বাস দেন।
একই আসনের এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম নগর ও বোয়ালখালী একই সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত হলেও বোয়ালখালীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন দাবি করে এ বৈষম্য নিরসনে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম–৯ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান বাকলিয়া এলাকায় গণসংযোগকালে বলেন, নির্বাচিত হলে সংসদীয় এলাকার উন্নয়নে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবেন। তিনি বাকলিয়ায় জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সমস্যা, সরু রাস্তাঘাট, বিশুদ্ধ পানির অভাব, মাদকসহ নানাবিধ সমস্যা রয়েছে উল্লেখ বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, ড্রেনেজ সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং মাদক সমস্যা সমাধানকে অগ্রাধিকারে রাখা হবে। একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক গণসংযোগে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ নানাভাবে অবহেলিত। আমি নির্বাচিত হলে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং এলাকার উন্নয়নে কাজ করব। তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন।
চট্টগ্রাম–১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী সাইদ আল নোমান গণসংযোগকাল তার নির্বাচনী এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি এখানকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং আধুনিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিতেও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী এলাকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম–১১ আসনের বিএনপি প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১২শ শয্যার হাসপাতাল ও ভোকেশনাল সেন্টার করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে বিএনপি ক্ষমতায় এলে চট্টগ্রামকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলারও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বন্দর থেকে শুরু করে আধুনিক ওয়্যারহাউজ, কন্টেনার ডিপো, শিপিং সার্ভিস এবং ব্যবসা–বাণিজ্যের সকল আধুনিক সুযোগ–সুবিধা এখানে থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরকে ঘিরে পুরো বেল্ট এলাকা হবে একটি আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক্যাল হাব। এখান থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সাথে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও লেনদেন পরিচালিত হবে।
একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শফিউল আলম তার নির্বাচনী এলাকা দক্ষিণ হালিশহরে গণসংযোগকালে বলেন, দক্ষিণ হালিশহরবাসী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির শিকার। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আমি এই এলাকার মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে চাই।
চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) আসনের বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধ হাটহাজারী গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম– ২ (ফটিকছড়ি) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন তার নির্বাচনী গণসংযোগে নির্বাচিত হলে এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিচ্ছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফটিকছড়ির মানুষ উন্নয়নবঞ্চিত বলেও দাবি করেন।
চট্টগ্রাম–১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী নারীদের কর্মসংস্থানের দক্ষতা উন্নয়ন, নদী ভাঙন রোধ ও বেড়িবাঁধ সংস্কার, কৃষি খাতে আধুনিকায়ন রাস্তাঘাট, সেতু, শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ পরিকল্পনার মাধ্যমে দৃশ্যমান উন্নয়ন করার আশ্বাস দিচ্ছেন।
৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে ব্যাংকারদের চাকুরিচ্যুত করা দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। চাকুরি হারানোদের মধ্যে চট্টগ্রামের বাসিন্দারা বিভিন্ন সময়ে নানা কর্মসূচিও পালন করেছেন। দাবি করেছেন চাকুরি ফিরিয়ে দেয়ার। ভোটের মাঠে নেমে সেই চাকুরিচ্যুতদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) আসনের বিএনপি প্রার্থী আলহাজ্ব এনামুল হক এনাম। তিনি চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত হয়ে সংসদে গেলে প্রথম অধিবেশনেই চট্টগ্রামের চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের পক্ষে জোরালো আওয়াজ তুলবেন এবং তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।












