বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো ‘কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না’ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। ভারতীয়দের ‘চলে যাওয়ার’ পেছনে কোনো শঙ্কা বা সংকেত আছে কিনা, এমন প্রশ্নে বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘শঙ্কা নেই। আর সংকেত যে কী, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। এটা একেবারেই তাদের নিজস্ব ব্যাপার, তারা তাদের কর্মচারীদের পরিবারকে চলে যেতে বলতেই পারেন যে কোনো সময়। কেন বলেছেন, তার আমি কোনো কারণ খুঁজে পাই না।’ খবর বিডিনিউজের।
কূটনীতিকদের পরিবারকে সরানোর মত কোনো পরিস্থিতি ‘বাংলাদেশে নেই’ দাবি করে তিনি বলেন, ‘তাদের কর্মকর্তা বা তাদের পরিবার পরিজন কোনো বিপদে আছে–এরকম কিছু ইনসিডেন্ট একটিওতো ঘটেনি এখন পর্যন্ত। আশঙ্কা তাদের মনে হয়ত আছে, অথবা হয়ত তারা ভাবছেন যে, যেটা বললেন যে, কোনো মেসেজ দিতে চায় কিনা, হতে পারে। কিন্তু আমি আসলে ঠিক কোনো মেসেজ এটার মধ্যে খুঁজে পাচ্ছি না।’ ভারত ‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশে থাকা সব মিশন থেকে ‘সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে’ বলে গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে। একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, কূটনীতির ভাষায় বাংলাদেশকে একটি ‘নন–ফ্যামিলি’ পোস্টিং হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
বাংলাদেশে থাকা ভারতের পাঁচ মিশন হল– ঢাকার হাই কমিশন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে অবস্থিত চারটি সহকারী হাই কমিশন। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিক টানাপড়েন এবং দুই দেশে মিশনগুলো ঘিরে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভের পর ভারতের এমন সিদ্ধান্ত আসে। কূটনীতিকদের পরিবারকে সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ‘এখতিয়ার’ যে ভারতের রয়েছে, সে কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, সার্বিকভাবে আমরা মনে করি যে, এখন পর্যন্ত নিরাপত্তার তেমন কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। আমরা যদি এর আগের দিকেও তাকাই, আগে যখন নির্বাচন হত, মাঝে তো হয় নাই অনেকদিন, সেটার কথা বাদ দিলাম, তখনও কিন্তু নির্বাচনকালীন সময়ে ছোটখাটো কিছু সংঘর্ষ, কিছু মারামারি, কিছু ধাক্কাধাক্কি, এগুলো হত সবসময়। এবার তার থেকে কোনো বেশি কিছু হয়েছে, এটাতো আমার মনে হচ্ছে না। আপনাদেরও যদি কারো মনে হয়, তাহলে বলতে পারেন। আমার তো মনে হচ্ছে না যে তেমন কোনো নিরাপত্তাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যে কারণে আসলে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার আছে। কোনো নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে কি–না, এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, না, কোনো বিপদে আছেন–এরকম কোনো কথা কখনও তারা বলেনি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে এক সাংবাদিক বলেন, ভারতীয় হাই কমিশন থেকে বলা হয়েছে, ওসমান হাদি মারা যাওয়ার পরে ১৮ ডিসেম্বর ওদের উপ–হাই কমিশনের বোমাসদৃশ বস্তু পাওয়া গিয়েছিল এবং এই শঙ্কা থেকেই ওরা ডিপ্লোম্যাটদের পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে। আমরা যদি দেখি, অপারেশন সিঁদুর যখন চলছিল, তখন পাকিস্তান থেকেও কিন্তু ওদের কূটনৈতিক পরিবার সরিয়ে নেওয়া হয়। জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, দেখুন, আমি এগুলি তুলনার মধ্যে যেতে চাই না। তারা কেন করেছে, সেটা আমি যতটুকু জানি, আপনারা ততুটুকু জানেন। নিরাপত্তা উদ্বেগটা আসলে কী–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সিকিউরিটি কনসার্ন ওভাবে আমাদেরকে জানায়নি। তবে তাদের মিশনের চারদিকে যখন ঘেরাওটেরাও হয়েছিল, আমাদের মিশনেও হয়েছে। আমরা তখন জানিয়েছি, আমাদের কনসার্ন যে, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার, তারাও জানিয়েছে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার। এবং আমরা নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছি। তাতে তারা সন্তুষ্ট কি–না, সেটাতো আমাদের কিছু করার নেই। যেটুকু সম্ভব আমাদের পক্ষে, সেটা করেছি, তারা চেয়েছে সেটা আমরা দিয়েছি।
অন্যদের পারলেও ভারতীয়দের আশ্বস্ত করতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা কি–না, এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, এখানে ব্যর্থতা–সাফল্যের কিছু নেই। একটা দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তারা নিয়ে যাবে তাদের পরিবার পরিজনকে। এখানে ব্যর্থতারই বা কী আছে, আর সাফল্যেরই বা কী আছে? এতে সাফল্য–ব্যর্থতার কিছু নাই। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক আসার বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে এ ব্যাপারে আমার কাছে খুব ডিটেইল তথ্য নেই। কারণ তথ্যটা সরাসরি চলে যায় ইলেকশন কমিশনে। এবং আমরা প্রথম থেকে এমনও বলেছি যে, আমরা আগ বাড়িয়ে কোনো হেল্পও করতে যাব না। কারণ তাহলেই মনে হবে যে, আমরা কোনো পক্ষ নেওয়ার চেষ্টা করছি। কোনো হেল্প লাগলে আমরা হেল্প করব, বাকিটা নির্বাচন কমিশন যেভাবে হ্যান্ডেল করবেন, তারা করবেন।
তৌহিদ হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত ইউরোপ থেকে তো বড়সড় দল আসবে এটা কনফার্ম। দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই যে দেশ থেকে আসবে। অবশ্যই হয়ত কিছু স্ক্রুটিনি হতেই পারে, যারা আসলে নির্বাচন অবজার্ভ না করে যদি অন্য কোনো কাজেও কেউ আসতে চেষ্টা করে, সেটা হয়ত হোম মিনিস্ট্রি এবং মিশনগুলো হোম মিনিস্ট্রির নেতৃত্বে দেখবে। তবে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক যেন আসে, সেটা সরকার চাইছে বলে উপদেষ্টার ভাষ্য।
তিনি বলেন, আমরা এটাও চাই যে, সব সংবাদ সংস্থা থেকে যথেষ্ট পরিমাণ সাংবাদিকরা আসুক। এখানে তারা দেখুক, কারণ আমাদের তো লুকোছাপার কিছু নেই। আমরা চাই যে ট্রান্সপারেন্টলি সবকিছু হোক এবং অবজার্ভার আসুক সর্বোচ্চ সংখ্যক, সাংবাদিকরা আসুক সর্বোচ্চ সংখ্যক। দিল্লি থেকে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের আসার বিষয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তারা যেন আসতে পারেন, সে ব্যবস্থা করার নির্দেশনা অলরেডি দেওয়া হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন মিশনে স্বাভাবিক ভিসা সেবা এখনও বন্ধ কি–না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আছে বন্ধ, আমরা সময় হলে খুলব। তবে এই আগামী ৮–১০ দিন আর বোধহয় এটা না করাই সমীচীন হবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যে কথা সমপ্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে টেনে এক সাংবাদিক জানতে চান, সহিংসতা আওয়ামী লীগই করছে–সে বিষয়ে সরকার নিশ্চিত কি–না। উত্তরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, না, আমরা মোটেই সেরকম নিশ্চিত নই। কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে যে, কোনো অপচেষ্টা হতে পারে সংঘাতের, সেটার বিস্তারিত হয়ত হোম মিনিস্ট্রির লোকজন আরো ভালো বলতে পারবেন, ডে টু ডে প্রগ্রেসের বিষয়ে।











