জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কোনো ধরনের সংকট যাতে না দেখা দেয়, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশনা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
২০ জানুয়ারি রেল মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন। ফাওজুল কবির খান বলেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এলপিজি অপারেটররা যে পরিমাণ আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা যেন বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, এটি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন ও মাহে রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভোক্তাদের ভোগান্তি এড়াতে এলপিজির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
উপদেষ্টা জানান, অপারেটরদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার পক্ষ থেকেও সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে। আমদানি, পরিবহন কিংবা আনুষঙ্গিক যেকোনো সমস্যার ক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
সভায় অপারেটরদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিরূপ পরিস্থিতির কারণে সামপ্রতিক সময়ে এলপিজি আমদানিতে কিছুটা বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে তারা স্পষ্টভাবে জানান, অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি করার মতো কোনো পদক্ষেপ তারা নেননি এবং এ সংক্রান্ত অভিযোগ সঠিক নয়।
অপারেটররা আরো জানান, চলতি জানুয়ারি মাসে নির্ধারিত ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে চলমান সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে এবং বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
সভায় জ্বালানি বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন। তারা এলপিজি সরবরাহ, মূল্য স্থিতিশীলতা ও বাজার তদারকি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভা শেষে জানানো হয়, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে এলপি গ্যাস নিয়ে সৃষ্ট এ সংকট এখন ভোক্তা, পরিবেশক ও ব্যবসায়ীদের (অপারেটর) মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে। সংকটের মূল কারণ সমাধান না করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাজারে মূল্য নির্ধারণ করায় বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন এলপি গ্যাস সমবায় সমিতি। তাদের অভিযোগ, এলপিজির মূল্য নির্ধারণে বিভিন্ন সময় সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে একাধিকবার বিইআরসিকে আলোচনা করতে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিইআরসি বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে কখনই বসেনি।
এলপি গ্যাস নিয়ে দেশব্যাপী তৈরি হওয়া সংকট নিরসনে বিইআরসি কী করছে, সে বিষয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ পত্রিকান্তরে বলেন, ‘এখানে রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বিইআরসির ওই অর্থে কিছু করার নেই। তবে এলপি গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে বিইআরসির পক্ষ থেকে অপারেটরদের জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করে বিইআরসি। সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি নতুন মূল্য ঘোষণা করে কমিশন। এ নিয়ে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিইআরসি পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই মূল্য সমন্বয় করেছে। এলপিজি সিলিন্ডারের সংকট দূর করায় জোর না দিয়ে বাড়তি দাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, দেশের বাজারে বড় আকারে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে ফ্রেশ এলপি গ্যাস লিমিটেড। মেঘনা গ্রুপের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটির আড়াই লাখ টন আমদানি সক্ষমতা রয়েছে। তারা নতুন করে আরো এক লাখ টন আমদানি বাড়াতে চায়। জ্বালানি বিভাগ থেকে অনুমোদন পেলে দ্রুত আমদানি কার্যক্রম শুরু করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যমান এলপিজি সংকটের পেছনে আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধির অনুমোদন ঝুলে থাকার বড় দায় আছে বলে মনে করেন কোম্পানিটির শীর্ষ নির্বাহীরা।
ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা বলেন, ‘ফ্রেশ এলপি গ্যাস আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দুই বছর আগে মন্ত্রণালয়ে অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল। এর মধ্যে বগুড়া প্লান্টের জন্য ৬০ হাজার টন এবং মোংলা প্লান্টের জন্য ৯০ হাজার টন চাওয়া হয়েছিল। এতদিন তা অনুমোদন দেয়া হয়নি। যদিও সৃষ্ট সংকটের কারণে এখন ঝুলে থাকা এ প্রস্তাব অনুমোদনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। যদি এ অনুমোদন আরো আগে থেকে দেয়া হতো তাহলে হয়তো এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।’ এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান বলেন, ‘এলপিজি নিয়ে গত ২০ বছরেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ২৭টা অপারেটরের মধ্যে মাত্র পাঁচটি গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে। বাজারে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, সেটি কতটুকু আছে তা পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে। আমরা বিষয়টির সমাধান চাই।
সব মিলিয়ে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি–এই দুই মাসে এলপিজির বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের রান্নাঘরের খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার নির্দেশনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।






