আসন্ন নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রত্যাশা

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ

দেশে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর হতে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও দেশে নির্বাচনী পরিবেশ বিরাজ করছে। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের সাথে রয়েছে গণভোট। যেটি নির্বাচনী রোডম্যাপের সাথে আরেকটি বাড়তি সংযোজন। নতুন বছরের নির্বাচনকালীন এ সময়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সাধারণ জনগণের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। প্রকাশ্যে খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির মতো গুরুতর সব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। প্রশাসন যেন এখানে অসহায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য না হলে অস্থিতিশীলতা হতে দেশ ও জনগণ মুক্ত হতে পারবে না। দেশের একটি অংশকে নির্বাচনের বাইরে রেখে নির্বাচন হলে তা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, সেটা নিয়ে জনগণের মাঝে প্রশ্ন রয়েছে। দেশের শাসন ব্যবস্থা ও সংবিধানের আমুল পরিবর্তনের লক্ষ্যে গণভোট নিয়ে জনগণের মধ্যে কিছুটা আলোচনা থাকলেও মাঠ পর্যায়ের প্রচারে দলগুলো রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। দলগুলো সংস্কারের কথা বললেও গণভোট নিয়ে তেমন প্রচার এখনো দৃশ্যমান হয়নি। সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ পিছিয়ে যায় কিনা, এমন আশঙ্কা থেকেই দলগুলো গণভোটের প্রচারে সক্রিয় হতে এখনো দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ইতিমধ্যে গণভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচিতে সরকারের পক্ষ হতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রশাসনিক গণভোট এবং আরেকটি সাংবিধানিক গণভোট। চতুর্থ বারের মতো ১২ ফেব্রুয়ারি আবারও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট এক সঙ্গে আয়োজন করা হচ্ছে।

এবারের গণভোটে জনমত কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নিয়েও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে চলছে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা। বিশেষ করে সরকারি প্রচারে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো নিয়েও সমালোচনা ও তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশেই কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য গণভোট নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে বাংলাদেশে যে গণভোট হয়েছে তাতে জনগণের মতামত কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তীব্র আন্দোলনের ফলে সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে সামনে আসে গণভোটের আলোচনা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের বৈধতা দিতেই গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। চারটি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হবে এ গণভোট। এ দিন চারটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে জনগণ তাঁদের মতামত জানাবেন। () নির্বাচনকালীন তত্ত্ববধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। () আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চ কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। () সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। () জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংখ্যার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।

স্বাধীনতার পর এদেশে প্রথম গণভোট হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে, রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তার নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা আছে কিনা, তা জানতে দেশের জনগণের মতামত নিয়ে ওই গণভোটের আয়োজন করে। সে সময়ের পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট পড়েছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৮৫ এর ২১ মার্চ দেশের দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রসাশক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচি এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য ওই গণভোটের আয়োজন হয়েছিল। জনগণের আস্থা থাকলে জেনারেল এরশাদের ছবি সহ ‘হ্যাঁ’ বাক্সে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ থাকলে ‘না’ বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী সেই গণভোটে ভোট পড়েছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহুম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেন। এরপর পঞ্চম নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হন। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ এর ৬ আগস্ট সংসদে বিল পাস হয়। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর ওই বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দিবেন কিনা তা নির্ধারণের জন্য ১৯৯১ এর ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। দেশের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত সেই তৃতীয় গণভোটে ভোট পড়ে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ ‘হ্যা’ ভোট পড়ে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ‘না’ ভোট ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। বাতিল হয়েছিল শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীয় মাধ্যমে গণভোটের সেই বিধান বাতিল করা হয়।

বর্তমানে গণভোটের ভাগ্যও কি এ পরিণতি হবে কিনা, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মাঝে সন্দেহ রয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল ভোটের আগে বা পরে ঘটে এমন একটি নির্দিষ্ট সময় নয় বরং এটি একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, স্থানীয় সমস্যা, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিরোধী মতের প্রতি সহানুভূতির অভাব এসব মিলিত হয়ে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে স্থিতিশীল নীতি ও কাঠামো নির্মাণ, যেখানে রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের জন্য একটি শক্তিশালি আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো যদি গড়ে তোলা হয়, যা শুধু নির্বাচনের দিন নয়, বরং নির্বাচনকাল জুড়ে জনগণের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস জুলাই আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলা হয়েছিল তা স্থায়ী হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের শরিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে ক্ষমতার প্রশ্নে। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং কৌশলগত মতভেদ সেই ঐক্যকে ভেঙে দিয়েছে। জনগণ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল তা এখন অনিশ্চয়তায় ঢাকা পড়েছে। মানুষ প্রশ্ন করছে, এ নির্বাচন কি সত্যিই সেই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হবে? নাকি আবারও ক্ষমতার পুরোনো খেলা চলবে? আজকের বাংলাদেশ একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি। আমরা কি সহিংস ও অবিশ্বাসের রাজনীতি ও মতপার্থক্য এবং দ্বৈতনীতির গণ্ডি হতে বেরিয়ে আসতে পারব? নাকি বার বার একই বৃত্তে ঘুরপাক খাব? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। সামগ্রিকভাবে আসন্ন নির্বাচনে গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে দেশকে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহারিয়ে যাওয়া সোনালি বিকেল আবারো ফিরে আসুক স্বমহিমায়
পরবর্তী নিবন্ধকবিতার পরিমাপ তার রহস্যে, তার লাবণ্যে এবং তার জাদুতে