এক সময় ছিল, বিকেল নামলেই পাড়া–মহল্লা মুখর হয়ে উঠত শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, হাসি–ঠাট্টা আর খেলার আওয়াজে কখনও ঘুড়ি ওড়ানো, কখনও দাড়িয়াবান্ধা কিংবা হাডুডু; মাঠজুড়ে চলত প্রাণপণ ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা। সন্ধ্যে ঘনালেই পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে টেলিভিশনে দেখত নাটক, হেসে উঠত একসাথে, কাঁদতও মাঝে মাঝে। ওই দৃশ্যপট আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
প্রথাগত জীবনের ওই জীবন্ত রঙিন ছবিগুলো এখন যেন ঝাপসা হয়ে গেছে স্মৃতির ধুলোপড়া অ্যালবামে। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে নিঃশব্দ, একান্ত, একক এক ভার্চুয়াল জগৎ যেখানে তরুণ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে পর্দার আলো–ছায়ায়। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, গেমিং কনসোল কিংবা ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব এসবের প্রতি নির্ভরতা আমাদের বর্তমান জীবনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে বিভিন্ন অপরাধ। তরুণ–তরুণীরা বিগো, লাইকি–টিকটকের অশ্লীল ভিডিওতে নাচ, গান ও অভিনয়ের পাশাপাশি নিজেদের ধূমপান ও সিসা গ্রহণ করার ভিডিও আপলোড করছেন।
সমপ্রতি ইউনিসেফ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে কিশোর–কিশোরীদের মধ্যে দিনে গড়ে ৬ ঘণ্টা বা তার বেশি স্ক্রিন টাইম এখন সাধারণ ঘটনা। বাংলাদেশও এই প্রবণতা থেকে আলাদা নয়। ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরের কয়েকটি স্কুলে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশ দিনে গড়ে ৫ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় মোবাইল বা কম্পিউটার স্ক্রিনে কাটায়। এই সময়ের বড় অংশ তারা ব্যয় করছে টিকটক, ফেইসবুক, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করে। দিন দিন তাদের জীবন যেন একটি ভার্চুয়াল আসক্তির মধ্যে বন্দী হয়ে পড়ছে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই স্ক্রিন, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত স্ক্রিন। এই অভ্যাস শুধু সময় নষ্ট করছে না বরং তাদের মানসিক এবং সামাজিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলছে। তারা বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, যা তাদের সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব গঠনে বাধা সৃষ্টি করছে।
একসময় কিশোরেরা নিজেদের পরিচয় তৈরি করত বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, শখের চর্চা কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এখন এই পরিচয় তৈরি হয় ফলোয়ার সংখ্যা, লাইক, রিলস বা স্টোরির রিঅ্যাকশনের ওপর ভিত্তি করে।
আরেকটি উদ্বেগজনক সমস্যা হলো সাইবার বুলিং বা অনলাইন হয়রানি। বাংলাদেশ ইন্টারনেট সেফটি ফাউন্ডেশনের এক জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২–১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে অন্তত ৩৩% কোনো না কোনোভাবে অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছে। এদের বেশিরভাগই মেয়ে, যারা ইনবক্সে অশালীন বার্তা, মন্তব্য বা হুমকির মুখোমুখি হয়। এই হয়রানি অনেক সময় মানসিক অবসাদ, একাকীত্ব এবং আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত বাড়িয়ে তোলে। পরিবার বা বিদ্যালয় থেকে দূরে এই অনলাইন নির্যাতনের প্রতিকার খুঁজে পাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। সাইবার বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরা প্রায়শই নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হয় এবং সামাজিক মেলামেশায় অনীহা দেখা দেয়।
অনলাইন গেম এখন অল্প বয়সীদের এতটাই প্রিয়, একবার গেম খেলতে বসলে ডিভাইস ছেড়ে উঠতেই চায় না তারা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিশু–কিশোরদের মধ্যে অনলাইন গেমের আসক্তি ক্রমাগত বাড়ছে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন এ গেম খেলছে আনুমানিক প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। দেশের শিশু–কিশোর–তরুণদের ওপর ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ পরিচালিত জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২ কোটি ৬০ লাখ ছাত্র–তরুণ নিয়মিত বিভিন্ন অনলাইন গেম খেলে থাকে। অনলাইন গেমের বাজার গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ‘নিউজুর’–এর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় অনলাইন গেমের বাজারে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এতেই প্রতীয়মান হয় দেশের শিশু–কিশোর, তরুণ–যুবকদের মধ্যে অনলাইন গেম আসক্তি কোন পর্যায়ে রয়েছে।
অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে প্রযুক্তি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা। তাদের অনলাইনে কী করছে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, এগুলো জানা জরুরি। নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং যুক্তি ও সহানুভূতির ভিত্তিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হবে। পারিবারিক পরিবেশে সুস্থ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব অপরিসীম।
সাইবার বুলিং ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি আছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও বয়সভিত্তিক কনটেন্ট ফিল্টার, রিপোর্টিং ব্যবস্থা ও মনিটরিং পলিসি জোরদার করতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অনলাইন হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব।
সময়ের দাবি এখন ভারসাম্য একটি প্রযুক্তিবান্ধব, কিন্তু হৃদয়বান সমাজের নির্মাণ। যেখানে শিশুদের হাতে শুধু স্মার্টফোন নয়, থাকবে জিজ্ঞাসা করার সাহস, স্বপ্ন দেখার অবকাশ, এবং বাস্তব জীবনের ছোঁয়া।
এই ভারসাম্য রক্ষায় আমরা যদি এখনই উদ্যোগ না নিই, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারিয়ে যেতে পারে এক নিঃসঙ্গ, যান্ত্রিক দুনিয়ায় যেখানে ‘মানুষ’ থাকবে, কিন্তু ‘মানবতা’ হয়তো থাকবে না।
তাই এখনই সময় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত চেষ্টায় গড়ে তোলা একটি এমন সমাজ, যেখানে প্রযুক্তি হবে সহায়ক, আর মানুষ থাকবে কেন্দ্রবিন্দুতে। তাহলেই সম্ভব এক নিরাপদ, সচেতন এবং সুন্দর আগামী প্রজন্মের জন্য পথ প্রশস্ত করা।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার।











