শীত মৌসুম এলেই অনেক মানুষের জীবনে নীরবে নেমে আসে এক পরিচিত অস্বস্তি – জয়েন্ট ও বাতের ব্যথা। সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁটু বা কোমর শক্ত লাগা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর দাঁড়াতে কষ্ট হওয়া কিংবা অল্প হাঁটাচলাতেই ব্যথা অনুভব করা শীতকালে বহু মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। যদিও সব ধরনের বাত বা জয়েন্টের ব্যথা শীতকালে বাড়বেই – এমন নয়, তবু নির্দিষ্ট কিছু রোগ ও শারীরিক অবস্থায় ঠাণ্ডা মৌসুমটি অনেকের জন্য বিশেষভাবে কষ্টকর হয়ে ওঠে।
যারা ঝুঁকিতে আছেন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭১ কোটি মানুষ অস্টিওআথ্রাইটিস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত বা এর উপসর্গ বহন করছেন। শীতকালে এসব রোগের উপসর্গ অনেক ক্ষেত্রেই তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষ করে হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত মানুষের জন্য শীত মানেই বাড়তি ব্যথা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা। বয়স্ক ব্যক্তি, আর্থ্রাইটিস বা অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত রোগী, যাদের আগে জয়েন্টে আঘাত লেগেছে বা অস্ত্রোপচার হয়েছে, অতিরিক্ত ওজনের মানুষ এবং শীতে শারীরিকভাবে কম সক্রিয় ব্যক্তিরা এই সময় তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
শীতকালে ব্যথা বাড়ার শারীরবৃত্তীয় কারণ: শীতকালে জয়েন্টের ব্যথা বাড়ার পেছনে একাধিক শারীরবৃত্তীয় কারণকাজ করে। তাপমাত্রা কমে গেলে শরীরের রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে জয়েন্ট ও আশপাশের পেশিতে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। এর ফল হিসেবে জয়েন্টে ব্যথা, শক্তভাব ও আড়ষ্টতা বাড়ে। একটি গাড়ির ইঞ্জিন সাবলীলভাবে চলতে যেমন লুব্রিকেন্ট হিসেবে মবিল ব্যবহৃত হয়, তেমনি একটি জয়েন্টের সাবলীল চলনের জন্য লুব্রিকেন্ট হিসেবে কাজ করে সাইনোভিয়াল ফ্লুয়িড নামক একধরনের তরল। ঠাণ্ডা আবহাওয়া জয়েন্টের ভেতরের এই তরলের ওপরও প্রভাব ফেলে; তরলটি তখন ঘন হয়ে যাওয়ায় জয়েন্টের স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত হয়। পাশাপাশি শীতে স্নায়ুর স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা কমে গিয়ে অল্প উদ্দীপনাতেই ব্যথা তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হতে পারে।
ঠাণ্ডার কারণে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কম চলাফেরা করে। দীর্ঘ সময় শুয়ে বা বসে থাকলে জয়েন্টের স্বাভাবিক লুব্রিকেশন কমে যায়, পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জয়েন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া শীতকালে বায়ুচাপ ও আর্দ্রতার পরিবর্তনের ফলে জয়েন্টের ভেতরে সামান্য ফোলাভাব তৈরি হতে পারে, যা আথ্রাইটিস রোগীদের ব্যথা আরও বাড়িয়ে দেয়। শীতে তৃষ্ণা কম লাগায় অনেকেই পর্যাপ্ত পানি পান করেননা–এরফলে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, যা পেশি ও জয়েন্টের শক্তভাব আরও বাড়িয়ে তোলে। পাশাপাশি রোদের তীব্রতা কম থাকায় ভিটামিন ডি–এর ঘাটতিও বেড়ে যেতে পারে, যা হাড় ও জয়েন্টের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ব্যথা কমাতে করণীয়: শীতকালীন জয়েন্ট ও বাতের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সঠিক যত্ন ও সচেতন জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীর ও আক্রান্ত জয়েন্ট উষ্ণ রাখা এ ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান করণীয়। গরম পোশাক পরা, হাঁটু বা কোমরের সাপোর্ট ব্যবহার করা এবং ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শ এড়িয়ে চললে ব্যথা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শীতকালে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জয়েন্টকে সচল রাখা–তবে তা হতে হবে নিরাপদভাবে। ব্যথা আছে বলে একেবারে নড়াচড়া বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। বরং প্রতিদিন হালকা স্ট্রেচিং, ধীরে হাঁটা এবং জয়েন্টের স্বাভাবিক নড়াচড়া বজায় রাখা ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। বাইরে বের হওয়া সম্ভব না হলে বাসার ভেতরেই ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটাচলাও কিছু নিয়ন্ত্রিত শারীরিক নড়াচড়া করা যেতে পারে। সকালে বা ব্যায়ামের আগে হালকা গরম সেঁক বা, ময়েস্ট হিট (গড়রংঃ যবধঃ) দিলে পেশিতে রক্তসঞ্চালন বাড়ে, পেশি প্রস্তুত হয় ফলে, ব্যায়াম করা সহজ হয়। প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে জয়েন্টভিত্তিক থেরাপিউটিক ব্যায়াম ও কিছু আধুনিক ইলেক্ট্রো–ফিজিক্যাল থেরাপি গ্রহণ করতে হবে, যা ব্যথা কমানো ও চলাচল স্বাভাবিক করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
দৈনন্দিন জীবনে সতর্কতা: শীতে হঠাৎ ভারী কাজ করা, দ্রুত ঝুঁকে পড়া বা দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে থাকা ব্যথা বাড়াতে পারে। তাই ধীরে চলাফেরা করা, সিঁড়ি কম ব্যবহার করা, নিচু মোড়া বা পিঁড়িতে বসা এড়িয়ে চলা এবং ভারী জিনিস না তোলাই নিরাপদ। দীর্ঘ সময় ঠাণ্ডা মেঝেতে বসা বা শোয়া থেকেও বিরত থাকা উচিত।
জয়েন্ট সুস্থ রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প নেই। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, প্রোটিন ও ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার – যেমন দুধ, ডিম, ছোট মাছ, শাকসবজি, ফলমূল ও বাদাম – হাড় ও জয়েন্টের জন্য উপকারী। পর্যাপ্ত পানি পান জয়েন্টের স্বাভাবিক লুব্রিকেশন বজায় রাখতে সাহায্য করে, আর ওজন নিয়ন্ত্রণ করলে ওজনবাহী জয়েন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে।
নিজে নিজে কোনো ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যথানাশক বা প্রদাহনাশক ওষুধ অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে। নিয়ম মেনে চলার পরও যদি ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয়, জয়েন্টে ফোলা বা লালচে ভাব দেখা দেয় কিংবা হাঁটাচলায় গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
শীতকাল জয়েন্ট ও বাতের ব্যথার রোগীদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত ও নিরাপদ নড়াচড়া এবং সমন্বিত চিকিৎসায় এই সময়টিও অনেকটাই স্বস্তিতে ও সক্রিয়ভাবে কাটানো সম্ভব।
লেখক: ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ইনচার্জ, ফিজিওথেরাপি বিভাগ সিআরপি চট্টগ্রাম– এ.কে. খান কেন্দ্র।












