চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বৃহত্তর বাণিজ্যিক নগরী। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের উপর দেশের আমদানি– রপ্তানি, শিল্প ও বাণিজ্যের সিংহভাগ নির্ভরশীল। বলা যায় দেশের অর্থনীতির একটা বড় চাকা ঘুরে এই শহরকে কেন্দ্র করেই। অথচ আজ সেই চট্টগ্রাম শহর ক্রমশ অচল হয়ে পড়ছে যানজট কারণে। এই যানজট এখন আর শুধু শহরের মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ নয়; এটি সরাসরি দেশের অর্থনীতি জনজীবন ও মানবিক নিরাপত্তার জন্য এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ হুমকি।
যানজটের কারণে মানুষ সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারছে না। কর্ম ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে। বন্দরে পণ্য খালাসে দেরি হচ্ছে পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে ফলে ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষতি বাড়ছে। তবে এই যানজটের সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনে। বিশেষ করে চিকিৎসা সেবায়। হঠাৎ কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোই জীবন বাঁচানোর প্রধান শর্ত। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরে আজ একটি অ্যাম্বুলেন্সও যানজটের বাইরে নয়। মুমূর্ষ রোগী যানজটে আটকে থেকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারাচ্ছে এমন ঘটনা এখন আর ব্যতিক্রম নয়। কোথাও কোথাও যানজটে আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্সেই সন্তান প্রসবের মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। কেবল সড়ক ব্যবস্থা ব্যর্থতার কারণে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে—এর চেয়ে বড় দুর্ভোগ আর কি হতে পারে?
এই সংকট হটাৎ তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দায়িত্বহীন ব্যবস্থাপনা। শহরের ভেতরে রাস্তার পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্কুল– কলেজ ও হাসপাতাল। সকাল ও বিকেলের নির্দিষ্ট সময়ে এইসব প্রতিষ্ঠান থেকেই সবচেয়ে বেশি যান চাপ তৈরি হয়। একটি সরু সড়কের পাশে একাধিক বড় প্রতিষ্ঠান থাকলে যানজটে অনিবার্য এই সাধারণ বাস্তবতাকে বছরের পর বছর উপেক্ষা করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফুটপাত দখল করে হকার বসা এবং যেখানে সেখানে অপরিকল্পিত বাজার গড়ে ওঠা। ফুটপাত হারিয়ে মানুষ বাধ্য হচ্ছে রাস্তায় নামতে, ফলে যানবাহনের চলাচলের জায়গা আরো সংকুচিত হচ্ছে। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং শহরের প্রধান সড়কগুলোর কার্যকর প্রস্থ কমিয়ে দিচ্ছে। একইসঙ্গে রিকশা ও অটো রিক্সার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সড়কের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে ফেলছে আরেকটি মৌলিক সমস্যা হল সব রাস্তায় সব ধরনের যান চলাচল। বাস্তবে সব সড়ক সব ধরনের যান নেওয়ার উপযোগী নয়। আবাসিক এলাকায় ভারীযান ও প্রধান সরকে অনিয়ন্ত্রিত রিক্সা কোন সড়ক ভিত্তিক পরিকল্পনা বা স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় যানজট স্থায়ী রূপ পেয়েছে। ট্রাফিক আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল আর জনসচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ আছে, তবে তা সাহসী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব নয়। যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ধাপে ধাপে স্কুল –কলেজ ও হাসপাতালগুলোকে শহরের বাইরে স্থানান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
অপরিকল্পিত বাজার উচ্ছেদ ও কঠোর পার্কিং নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। সড়কভিত্তিক যান চলাচল নির্ধারণ করে কোথায় কোন ধরনের যান চলবে এই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এখানে শুধু প্রশাসনের উদ্বেগই যথেষ্ট নয়। জনগণে সচেতনতা ও সহযোগিতা ছাড়া কোন পরিকল্পনায় সফল হতে পারে না। ট্রাফিক আইন মেনে চলা ফুটপাত ও সড়ক দখল না করা শৃঙ্খলাবদ্ধ আচরণ এই দায়িত্ব আমাদের সবার।
চট্টগ্রামের যানজট আজ আর কেবল একটি শহরের সমস্যা নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। মাননীয় মেয়র ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি বিনীত ও দৃঢ়আহ্বান এই বাস্তব সমস্যাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর প্রদক্ষেপ নেওয়া হোক। চট্টগ্রাম সচল থাকলেই দেশ সচল থাকবে একথা এখন আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই।












