ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মোট ভোটারের ৪৭ শতাংশই নারী। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ ৪ শতাংশেরও কম। গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ১১৩ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। এর মধ্যে নারী আছেন মাত্র ৪ জন। তারা লড়ছেন পৃথক তিনটি আসন থেকে। এছাড়া এবার নির্বাচনে অংশ নেয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৫টি দল প্রার্থী দিয়েছে চট্টগ্রামে। এর মধ্যে মাত্র দুটি দল– বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন তিন নারী। বাকি একজন লড়ছেন স্বতন্ত্র হিসেবে। অর্থাৎ বিএনপি–জামায়াতসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলো কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি চট্টগ্রামে।
রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার চট্টগ্রামের নারী প্রার্থীদের মধ্যে চট্টগ্রাম–১০ আসনে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) আসমা আক্তার ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের সাবিনা খাতুন এবং চট্টগ্রাম–১১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) দীপা মজুমদার। এছাড়া চট্টগ্রাম–২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন অ্যাডভোকেট জিন্নাত আকতার। অবশ্য চট্টগ্রাম–৫ আসনে বিএনপি নেত্রী শাকিলা ফারজানা মনোনয়নপত্র জমা দিলেও তা বাতিল হয়।
জানা গেছে, গত (দ্বাদশ সংসদ) নির্বাচনে চট্টগ্রামে একজন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই হিসেবে এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু তা প্রত্যাশিত নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এবারের সংসদীয় নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।’
উল্লেখ্য, নারী প্রার্থীর সংকট শুধু চট্টগ্রামে নয়। এ চিত্র সারা দেশের। যেমন এবার ৩০০ সংসদীয় আসনের বিপরীতে জমা দেয়া ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিল মাত্র ১০৯ জন নারী। এর মধ্যে অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিলও হয়। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে নারী প্রার্থী দিয়েছে ২১টি দল।
উল্লেখ্য, এবার চট্টগ্রামে মোট ভোটার ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭ জন। নারী ভোটার হচ্ছেন ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০ জন।
বাসদের দুই নারী প্রার্থী : বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) এর দুই নারী প্রার্থীর মধ্যে চট্টগ্রাম–১০ আসনের আসমা আক্তার দলটির চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্র চট্টগ্রাম জেলা আহবায়ক। তিনি মিঠানালা রাম দয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, মীরসরাই ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি ও অনার্স, চট্টগ্রাম কলেজ থেকে মাস্টার্স এবং ফেনী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, বিএড ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ‘গৃহকর্মী অধিকার রক্ষা কমিটি’র সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসরত শ্রমজীবী মানুষদের কাজ, আবাসন, শিক্ষা–স্বাস্থ্যের দাবিতে তিনি সোচ্চার এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে ফ্রি স্কুল ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত আছেন। আসমা আক্তার জানান, তিনি শোষণ–বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে চান।
এদিকে বাসদের অপর প্রার্থী দীপা মজুমদার টিএন্ডটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, পোস্তার পাড় আসমা খাতুন সিটি কর্পোরেশন কলেজ থেকে এইচএসসি, সরকারি সিটি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স করেন। তিনি বাসদ (মার্কসবাদী) জেলা কমিটির একজন সদস্য। এর আগে তিনি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট চট্টগ্রাম নগরের সভাপতি ছিলে। শিক্ষার সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন তিনি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের নেতৃত্বে বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলা ও সংগঠিত করার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই ভূমিকা রেখেছেন বলে জানায় জানায়।
দীপা মজুমদার বলেন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাথে যুক্ত হয়ে আমি রাজনীতির পাঠ শুরু করি। শিক্ষার অধিকার আদায়ের লড়াইসহ জনজীবনের সকল সংকট ও সুস্থ সংস্কৃতি নির্মাণের লক্ষে সব সময় কাজ করার চেষ্টা করেছি।
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ : ২০১০ সালে গঠিত হয় ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ। তবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয় ২০২৩ সালের ৮ মে। নিবন্ধন না পাওয়ায় ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলটির ৮ জন প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেন। এর মধ্যে সাবিনা খাতুনও ছিলেন। সেবারও তিনি চট্টগ্রাম–১০ আসন থেকে নির্বাচন করেন।
সাবিনা খাতুন আজাদীকে বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী মানবতার সংকট রয়েছে। মানুষ মানুষকে মারতে দ্বিধাবোধ করছে না। জুলুম, অন্যায়–অবিচার এগুলো হচ্ছে স্বৈর–রাজনীতির একেকটি প্রোডাক্ট। এখান থেকে মানুষকে মুক্ত করতে চাইলে প্রয়োজন সব ধরনের বিভেদ, বৈষম্য ভুলে গিয়ে মানবতার রাজনীতির মাধ্যমে, মানবতার ভিত্তিতে সব মানুষকে একত্রিত করে একই প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করে যদি মানবতার রাষ্ট্র গড়া। যে রাষ্ট্র একক ধর্ম, একক গোত্র, একক সম্প্রদায় বা একক লিঙ্গের কথা বলবে না। যে রাষ্ট্র সব মানুষের কথা বলবে, যে রাষ্ট্র হবে সার্বজনীন। সেটা সম্ভব মানবতার রাজনীতির মাধ্যমে। তাই নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে মানবতার সংকটে মানবিক মানুষ হিসেবে আমার দায়িত্ব হচ্ছে এগিয়ে আসা। সেজন্য সব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। তিনি বলেন, ধর্মের নামে অর্ধম, উগ্রবাদী স্বৈররাজনীতি আছে, এরা আমাদের মা–বোনদের এগিয়ে আসতে দিচ্ছে না। তারা মা–বোনদের অবলা প্রাণী মনে করে। তারা নারী হিসেবে সম্বোধন করে মানবিক অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাকে অস্বীকার করে।
একমাত্র স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী : একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে লড়ছেন অ্যাডভোকেট জিন্নাত আকতার। আজাদীকে তিনি বলেন, আমি পিছিয়ে পড়া নারী সমাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। জনগণকে সাথে নিয়ে ফটকিছড়িতে প্রচুর উন্নয়ন করতে চাই। আমি ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সাহায্য চাচ্ছি। আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নেই। ফটিকছড়ির সন্তান হিসেবে সবাইকে নিয়ে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ শক্তিশালী ফটিকছড়ি গড়ার স্বপ্ন দেখি। সকলের সহযোগিতা পেলে সেটা পূরণ করা কঠিন হবে না। পার্শ্ববর্তী থানাগুলো থেকে ফটিকছড়ি অনেক পিছিয়ে।












