জার্নাল সাধারণ অর্থে এক ধরনের ডায়েরি। প্রতিদিনের ঘটনাপঞ্জি লিখে রাখা। দিনের হিসাব নিকাশ টুকে বা দিনের তোলা ছবি পাতায় বা কোন স্টোরেজ মিডিয়ায় রেখে দেয়া। বলতে পারি জার্নাল হচ্ছে এক ধরনের নোটবুক। না, এ তো সাধারণ ধারণা, একাডেমিক জার্নাল এর চেয়ে বেশি। কেমন করে?
জার্নাল ব্যক্তির জন্য যদি হয়, দিনের ঘটনাপঞ্জির পরপর সন্নিবেশ, তাহলে একাডেমিক জার্নাল কেমন হবে? তা ও একাডেমিক তথ্য বা প্রবন্ধের সন্নিবেশ। তবে তা একক কোন ব্যক্তির নয়। সমাজবদ্ধ মানুষের অগ্রগামী অংশের জ্ঞানের বর্ণনের শেয়ারিং। ব্যক্তির ক্ষেত্রে যত সহজে দিনের ঘটনার সংরক্ষণ করা সহজ, তত সহজ নয় একাডেমিক তথ্যের শেয়ারিং ও তার সংরক্ষণ করা। কারণ ব্যক্তির তথ্য সংরক্ষণে যা ইচ্ছে তাই হতে পারে কিন্তু একাডেমিক তথ্য সংরক্ষণের জন্য নিয়ম– নীতি বা সিদ্ধতার প্রয়োজন আছে।
তাহলে, একাডেমিক জার্নাল কী?
একাডেমিক জার্নাল হলো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক বা বৈজ্ঞানিক মর্যাদা সম্পন্ন (সাপ্তাহিক/মাসিক/ত্রৈমাসিক ইত্যাদি) প্রকাশনা, যেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তত্ত্ব, পদ্ধতি, নীতি ও মন্তব্যসমূহ প্রকাশিত হয়। জার্নালগুলো সাধারণত– Peer-review হয়, যার মানে হলো গবেষণাপত্র সরাসরি প্রকাশিত হওয়ার আগে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যাচাই–বাছাই হয়।
বিদ্যা, এবং তা শুধুমাত্র গবেষণালব্ধ হলেই, সমাজ, অর্থব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনে কাজে লাগে। আর এজন্যই শিক্ষার সাথে জড়িতদের, বিশেষ করে শিক্ষক ও গবেষকদের তাঁদের গবেষণার ফল জার্নালে প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন। শুধু কি তাই?
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান সতত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীলতায় জ্ঞানের সর্বশেষ উল্লম্ফন দেখতে পাওয়া যায় জার্নালে। ফলে ছাত্র– শিক্ষক সহ এ বিষয়ে আগ্রহ আছে এমন ব্যক্তিরা জ্ঞানের উৎকর্ষতার সন্ধান পান জার্নালে।
উচ্চ শিক্ষায়, বিশেষত স্পেশালাইজড শিক্ষায় ছাত্র ও শিক্ষকদের সময়ের সাথে চলতি জ্ঞান সংগ্রহের জন্য উচ্চ মূল্যে বিদেশী বই কেনা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে থাকলে বা নিজস্ব জার্নালের প্রকাশনা থাকলে, উচ্চ মূল্যের বই না কিনে ও জ্ঞানের হালনাগাদ ধারণার সাথে পরিচিত হওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের তাদের প্রমোশনের জন্য কিছু শর্ত তাদের পূরণ করতেই হয়। তার একটি হচ্ছে জার্নালের প্রকাশনা। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক এই পর্যায়ের প্রমোশন বা নতুন নির্বাচনের জন্য তাদেরকে নির্দিষ্ট পরিমাণের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে প্রকাশনা থাকতে হয়। সমস্যা হচ্ছে প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে জার্নাল প্রকাশনা একটি অনিয়মিত ঘটনা। এবং শুধু তাই নয় একটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ম অনুযায়ী বিভাগ কিংবা ফ্যাকাল্টি অথবা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে জার্নাল প্রকাশ করতে পারে। চাহিদা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় জার্নালের প্রকাশনা না থাকায় শিক্ষকরা তাদের গবেষণা ও চিন্তা,ধারণা প্রকাশ করবার এবং শেয়ার করবার সুযোগ পান না। শিক্ষক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকের প্রকাশনা একটি শর্ত হতে পারে। এমনকি আন্তর্জাতিক রেটিং বা র্যাঙ্কিং সংস্থাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রকাশনা, ডিগ্রী, তাঁদের ক্লাসে উপস্থিতি এবং অন্যান্য শর্তকেও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখে। অনেক সময়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত অথবা আগেই কর্মে যোগ দিয়েছেন অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন সেটি তাঁর নেই, সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিছু শর্ত আরোপ করেন, যেমন তাঁকে একটি উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করতে হবে অথবা জার্নালে প্রকাশনা নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে কিছু বেশি থাকতে হবে ইত্যাদি, ইত্যাদি। আগেই বলেছি, ছাত্রদের হালনাগাদ তথ্য ও জ্ঞানের বিষয়গুলো অর্জনের জন্য তাঁদের জার্নালের উপরে নির্ভর করতে হয় সবচেয়ে বেশি ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এখন জার্নাল ইলেকট্রনিক্স ফরমেটেও পাওয়া যায় এবং সেগুলো বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে সাবস্ক্রাইব করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলো এগুলো সাবস্ক্রাইব করেন এবং ফলে ছাত্র–ছাত্রী এবং শিক্ষকরা এ থেকে হালনাগাদ তথ্য জেনে নিতে পারেন।
বেশ কৌতূহলের বিষয়টি হচ্ছে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ যে জার্নালগুলোর নাম প্রথমে আসে যেমন Nature, Lancet এগুলো কোনওটি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় না। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক যদিও জার্নাল নয় তবুও সেখানকার বহু প্রবন্ধ এবং ফিচারগুলো পিয়ার রিভিউ হয়ে থাকে এবং সেখানে প্রকাশিত অত্যন্ত মানসম্পন্ন প্রবন্ধ অথবা ফিচার কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে রেটিং এর ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য। জার্নালের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে যেখানে স্কিল বা দক্ষতা বেশি প্রয়োজন সেখানে অতি অবশ্যই নয়া প্রযুক্তির আবির্ভাব ও প্রয়োগের যে শিক্ষা সেটি আহরণ করবার জন্য জার্নাল ছাড়া অন্য কোনও অবলম্বন সহজে পাওয়া যায় না। আমার শিক্ষকতার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি অনেক শিক্ষকের যারা নতুন জয়েন করেন তারা জার্নাল সম্পর্কে একেবারে ওয়াকেবহাল নন এবং এটি যে তার ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একমাত্র অবলম্বন হতে পারে সেটি সম্পর্কেও সচেতন নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলার একটিভিটির ক্ষেত্রে জার্নালের প্রকাশনা বিশেষ করে নিয়মিত প্রকাশনার উপর গুরুত্ব দেয়া প্রধানতম দায়িত্ব।
আজকের পৃথিবীতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এক একটি গবেষণাগার। গবেষণা কর্মের ফল দেখা যায় গবেষণা প্রবন্ধে। আর এইটি পরবর্তী গবেষণাকে প্রভাবিত করে। আজকের সমাজ প্রগতির উপায় হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের গবেষণা। এইদিক থেকেও জার্নালের গুরুত্ব অনেক।
গবেষণার ফল যেমন নয়া গবেষণাকে প্রভাবিত করে ঠিক তেমনি যারা জার্নালের প্রবন্ধ রিভিউ করেন তারা নিজেরাও নিজেদের জ্ঞানের পরিধিটাকে বিস্তৃত করবার সুযোগ পান।
জার্নালে প্রবন্ধ লিখবার ও একটা ব্যাকরণ বা নিয়ম নীতি আছে। প্রবন্ধ প্রকাশ করবার জন্য এই নিয়ম–নীতি ফলো করতে হয়। কীভাবে সারাংশ লিখতে হয়, কীভাবে টেক্সট এর মাঝে রেফারেন্স দিতে হয়, ফুটনোট, অথবা গ্রন্থপঞ্জি লিখতে হয় রেফারেন্স হিসাবে অথবা ফুট–নট হিসেবে, কীভাবে তা শেখা যায়। রেফারেন্সিং এর একটা নিয়ম আছে, যেমন আমেরিকান সাইকোলজিকালে এসোসিয়েশন (APA)এর ফরম্যাট, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ফরম্যাট ইত্যাদি। কোন ফরম্যাটে প্রবন্ধ লিখতে হয় এ বিষয়টাও জেনে নিতে হয় অ্যাকাডেমিক রেফারেন্স, লিখবার কৌশল জানার মাধ্যমে। পাঠকের জন্য উদ্ধৃতি ও সূত্রাবলী (references) প্রতিষ্ঠিত জার্নালগুলোর সাধারণভাবে স্টাইল রুল থাকে (APA, Vancouvre, Chicago ইত্যাদি)। অনেক জার্নাল অনলাইনে পূর্ণাঙ্গ আর্টিকেল এবং সাপোর্টিং তথ্য সংরক্ষণ করে (Supplementary materials, data availability).
ইন্টারনাল–ইনডেক্সিং: Scopus, Webof Science, Pub Med প্রভৃতি ডেটাবেসে তালিকাভুক্ত হতে পারে।
জার্নালের রকমফের আছে, এই যেমন,
প্রাইমারি (Primary) আর্টিকল, নতুন গবেষণা ফলাফল সরাসরি রিপোর্ট করে।
রিভিউ (Review) আির্টিকল: পূর্ববর্তী গবেষণার সারাংশ ও বিশ্লেষণ প্রদান করে।
বিষয়ভিত্তিক জার্নাল: নির্দিষ্ট ক্ষেত্র (উদাহরণ: বায়োলজি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান) নিয়ে।
কেন জার্নাল গুরুত্বপূর্ণ:
বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও পুনরুৎপাদনশীলতা বাড়ে (Peer-review-এর মাধ্যমে).
গবেষণার ফলাফল নিশ্চিতভাবে poke করে প্রচলিত জ্ঞানকে আপডেট করে।
ক্যারিয়ার: প্রস্তাবিত অনুশীলনের জন্য Ciationsগবেষকদের নেটওয়ার্ক ও প্রোমোশন/ফান্ডিংয়ে সাহায্য করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য লাইব্রেরি যেমন প্রয়োজনীয় অংশ, ঠিক তেমনই লাইব্রেরির জন্য জার্নাল। বই সময়ের জ্ঞান সংরক্ষণ করে আর জার্নাল সেই জ্ঞানকে সময়ের সাথে উন্নত ও পরিশীলিত করে। জার্নাল তাই জ্ঞানের আর্কাইভ, বা স্টোরেজ মিডিয়া। ছাত্ররা শিক্ষকদের কাছে শেখে, শিক্ষক শেখেন লিখবার ও পাঠের অভ্যাস থেকে। বিভাগ, অনুষদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে জার্নালের সংখ্যা বৃদ্ধি, একটি সূচক, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। আর শিক্ষকের মান তাঁর জার্নালে লিখবার সামর্থ্য থেকে।
লেখক: সমাজবিজ্ঞানী; উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিজিএইএ ইউনিভার্সিটি
অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রাম।











