বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে ধস

লাইটারেজ জাহাজের সংকট অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা ও অবস্থানকাল বাড়ছে রমজানের পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ার শঙ্কা জরুরি পদক্ষেপ চান ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা

হাসান আকবর | বুধবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বের নানা দেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসা একেকটি মাদার ভ্যাসেলের চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে সময় লাগত ৭১০ দিন। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে এক মাসেও পণ্য খালাস হয়নি এমন মাদার ভ্যাসেলও রয়েছে। অপরদিকে বহির্নোঙরে পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা গড়ে ৪০টির মতো থাকত। গত কিছুদিনে তা ৮০টি ছাড়িয়ে গেছে। এতে জাহাজগুলোর ভাড়া এবং ডেমারেজ বাবদ কোটি কোটি ডলার গচ্ছা দেয়া ছাড়াও বন্দরের ইমেজ নিয়ে সংকট তৈরি হচ্ছে। লাইটারেজ জাহাজের সংকটে সবকিছু হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন রুটে পণ্য পরিবহন মুখ থুবড়ে পড়ায় বহির্নোঙরের কার্যক্রম মূলত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে জাহাজের অবস্থানকালও। পণ্য বোঝাই জাহাজগুলো অলস বসে থাকায় আসন্ন রমজানে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা, নিজেদের মধ্যকার বিরোধ এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরটিতে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আমদানিকারকরা মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাতকে উন্মুক্ত করে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া সিন্ডিকেট করে চট্টগ্রাম থেকে চলে যাওয়া জাহাজগুলো চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। সূত্রে জানা যায়, দেশের আমদানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ হ্যান্ডলিং করা হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। ৯০ শতাংশ পণ্যের ৫২ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় বন্দরের অভ্যন্তরে, বাকি ৪৮ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় বহির্নোঙরে। বহির্নোঙরে হ্যান্ডলিংকৃত পণ্যের পুরোটা পরিবাহিত হয় লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে। বন্দরের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের ইকুইপমেন্ট থাকলেও বহির্নোঙরে তেমন ইকুইপমেন্ট নেই। জাহাজের ক্রেনের পাশাপাশি গিয়ার, গ্রাব, পেলোডারের মতো যন্ত্রপাতি দিয়ে বছরে কয়েক কোটি টন পণ্য হ্যান্ডলিং হয়।

বিশ্বের নানা দেশ থেকে লাখ লাখ টন পণ্য নিয়ে আসা বড় বড় মাদার ভ্যাসেলগুলো বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না। এসব বড় জাহাজ থেকে পণ্যগুলো বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজে বোঝাই করা হয়। মাদার ভ্যাসেলের ক্রেনের সাথে গ্রাভ ব্যবহার করে লাখ লাখ টন পণ্য নামানো হয় লাইটারেজ জাহাজে। একেকটি মাদার ভ্যাসেলে একসাথে তিনচারটি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করার সুবিধা থাকে। মাদার ভ্যাসেল থেকে নামানো পণ্য কর্ণফুলী নদীর ষোলটি ঘাটের পাশাপাশি দেশের অন্তত ২৫টি স্থানের ৪১টি ঘাটে প্রেরণ করা হয়। অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সেক্টরের নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করে লাইটারেজ জাহাজগুলো পণ্য পরিবহন করে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে।

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন বার্থিং সভা করে মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে চাহিদা অনুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয় বিডব্লিউটিসিসি, যেগুলো বহির্নোঙরে গিয়ে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করে। কিন্তু গত বেশ কিছুদিন ধরে এ সেক্টরে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। প্রতিদিন তো দূরের কথা, দুইতিন দিনেও বার্থিং মিটিং হচ্ছে না। জাহাজ না থাকায় বার্থিং মিটিং করা সম্ভব হয় না। একেকটি মাদার ভ্যাসেলের পণ্য খালাস করতে যেখানে প্রতিদিন তিনচারটি করে লাইটারেজ জাহাজের চাহিদা থাকে, সেখানে প্রতিদিন গড়ে একটি জাহাজও পায়নি এমন জাহাজের সংখ্যাও অনেক। ফলে বহির্নোঙরে আমদানিকৃত হাজার হাজার টন পণ্য নিয়ে অলস বা সীমিত পরিসরে কাজ চলে জাহাজগুলোতে। ৭ থেকে ১০ দিনে যেখানে একটি মাদার ভ্যাসেল পণ্য খালাস করে ফিরতি পথে যাত্রা করতে পারে, সেখানে এক মাস অবস্থান করছে এমন জাহাজও রয়েছে। রমজানের পণ্য নিয়ে আসা অনেকগুলো জাহাজ লাইটারেজ জাহাজের সংকটের কারণে অপেক্ষার প্রহর গুনছে। এসব জাহাজের প্রতিদিনের ফিঙড অপারেটিং কস্ট বা এফওসি বাবদ গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার গুনতে হচ্ছে। বহির্নোঙরে জাহাজের সংখ্যাও বাড়ছে। লাইটারেজ জাহাজের সংস্থান না হলে এসব জাহাজে থাকা রমজানের ভোগ্যপণ্য সময়মতো বাজারে আসা নিয়ে সংশয় ব্যক্ত করা হয়েছে।

হঠাৎ করে লাইটারেজ জাহাজের সংকট হলো কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিশৃঙ্খলার তথ্য মিলেছে। বিডব্লিউটিসিসিকে কেন্দ্র করে লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের তিনটি সংগঠনের বিরোধ তুঙ্গে। বিশেষ করে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার প্রেক্ষিতে বিরোধ বেড়েছে। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে ঢাকার অনেক জাহাজ মালিক তাদের জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে মোংলা, পায়রা ও ভারতে নিয়ে গেছে। প্রায় ৫শর মতো লাইটারেজ জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

অপরদিকে বেশ কিছু পণ্যবোঝাই জাহাজ ৪১টি ঘাটে আটকে রয়েছে। ঘাটগুলোর অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকার পাশাপাশি শ্রমিক সংকটসহ নানা কারণে পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে। কিছু কিছু আমদানিকারকের বিরুদ্ধে জাহাজকে ভাসমান গুদাম বানানোর অভিযোগ করা হয়েছে। তবে আমদানিকারকেরা এই অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করে ঘাটে গিয়ে খালাস করাতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। ঘাটের সমস্যার কারণে অনেক সময় তা ২৫ দিনে গিয়ে ঠেকে। কিন্তু এর বেশি সময় ধরে পণ্য নিয়ে জাহাজ অলস বসে আছে এমন সংখ্যা একেবারে হাতেগোনা। ভাসমান গুদাম তখনই বলা যাবে যখন একদেড় মাস ধরে জাহাজ অলস ভাসে। এখন গত এক সপ্তাহ আগে যে জাহাজ পণ্য লাইটারিং করেছে সেটিকেও ভাসমান গুদাম বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।

বিষয়টি দুঃখজনক মন্তব্য করে একাধিক আমদানিকারক বলেছেন, এই সেক্টরে বিভিন্ন সিন্ডিকেট সক্রিয়, যারা নানাভাবে লুটপাটে ব্যস্ত। তাদের কারণে পুরো সেক্টরটি ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশৃঙ্খলা স্থায়ীভাবে বসে আছে। সরকার বিডব্লিউটিসিসিকে লাইটারেজ জাহাজের সিরিয়াল রক্ষা করে পরিচালনার দায়িত্ব দিলেও অভ্যন্তরীণ বিরোধসহ নানা কারণে তারা তা পারছে না। আমরা যদি নিজেদের মতো করে জাহাজ ভাড়া করে আমাদের পণ্য পরিবহন করার সুযোগ পেতাম তাহলে এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

সংকটের কথা স্বীকার করে বিডব্লিউটিসিসির নির্বাহী পরিচালক মেজর (অব.) জিএম খান বলেন, রমজানকে সামনে রেখে আমদানি পণ্য নিয়ে প্রচুর মাদার ভ্যাসেল এসেছে। ৪০টির মতো মাদার ভ্যাসেল এলে আমরা চাপে পড়ে যাই; সেখানে এখন মাদার ভ্যাসেলের সংখ্যা ৮০টি ছাড়িয়ে গেছে। এত জাহাজ আমরা আগে দেখিনি। এছাড়া ৪৫০টির বেশি জাহাজ, যেগুলো আগে এখানে চলাচল করত সেগুলো মোংলা, পায়রা ও ভারতে চলাচল করছে। বিডব্লিউটিসিসিকে বেকায়দায় ফেলার জন্য চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ১৫০টির মতো জাহাজ গম এবং সার নিয়ে ভাসমান গুদাম হিসেবে আটকে রয়েছে। এতে করে সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। আমরা প্রতিদিন বার্থিং করতে পারছি না, জাহাজ দেয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

একটি শিল্পগ্রুপের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের জাহাজ দেয়া হচ্ছে না, অথচ আমরা রমজানের পণ্য আমদানি করেছি। শিল্প গ্রুপগুলোর কোনোটিকে জাহাজ দেয়া হচ্ছে, কোনোটিকে দেয়া হচ্ছে না। জাহাজ বরাদ্দ নিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। তিনি বলেন, লাইটারেজ জাহাজ সেক্টরকে উন্মুক্ত করে দিলে এই সংকটের সুরাহা হবে। মোংলা ও পায়রার কথা উল্লেখ করে বলেন, ওখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। উন্মুক্ত বাজার থেকে যে আমদানিকারকের যে জাহাজ ইচ্ছে সেটি সংগ্রহ করছেন। ফলে সেখানে ভাড়া নিয়ে সমস্যা নেই, জাহাজেরও সংকট নেই।

লোকাল এজেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি আজিজুর রহমান বলেন, লাইটারেজ জাহাজের সংকটে বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিং ব্যাহত হচ্ছেএটা ঠিক। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে চলাচল করত এমন অনেকগুলো জাহাজ মোংলা, পায়রা ও ভারতে চলাচল করছে। তাই এখানে সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আমদানি পণ্য নিয়ে আসা মাদার ভ্যাসেলের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।

বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদ বলেন, সরকারের সার নিয়ে আসা মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করে আটকে গেছে বেশ কিছু লাইটারেজ জাহাজ। বস্তার অভাব, লেবারের অভাবসহ নানা কারণে তারা সারগুলো সময়মতো খালাস করতে পারছে না। এতে করে অনেকগুলো লাইটারেজ জাহাজ সার নিয়ে আটকে গেছে। তাছাড়া বেশ কিছু জাহাজ এখান থেকে চলে গেছে। সবকিছু মিলে লাইটারেজ জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকগুলো ঘাটের অবকাঠামো মান্দাতার আমলের। ওখানে পণ্য খালাসে সংকট হচ্ছে, লেবারের সংকট রয়েছে। ফলে লাইটারেজ জাহাজ যত দ্রুত ফ্রি হওয়ার কথা সেভাবে হচ্ছে না।

শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের নেতা এবং সেভেন সী’জ শিপিং লাইন্সের সিইও আলী আকবর বলেন, অনেকগুলো মাদার ভ্যাসেল বসে আছে। এখানে জাহাজের অবস্থানকাল বেড়ে যাচ্ছে। বাড়ছে আমদানিকারকের খরচ। যার যোগান মূলত ভোক্তাদেরই দিতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেকগুলো মাদার ভ্যাসেল অনেকদিন ধরে অলস সময় কাটাচ্ছে। জাহাজগুলোতে একেবারে সীমিত পরিসরে কাজ হচ্ছে। লাইটারেজ জাহাজের অভাবে পণ্য খালাসে গতি নেই। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরের ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহুজাইফার মাথার খুলি খুলে রাখা হয়েছে, পাঠানো হলো ঢাকায়
পরবর্তী নিবন্ধএক দম্পতির ১০ বছরের দণ্ড