সমাজ ও মানুষ গঠনে স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন

ড. উজ্জ্বল কুমার দেব | সোমবার , ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ

স্বামী বিবেকানন্দ আমার আদর্শ ব্যক্তি জেনে সম্প্রতি বুয়েটের শিক্ষক প্রফেসর ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে একটি বই আমার কাছে পাঠিয়েছেন। আমি অবাক হলাম বইটি দেখে কারণ এটি ১৯৬৩ সনের লেখা দুর্লভ একটি বই। বইটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন দর্শন ও মনোবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব। বইটি শিরোনাম হচ্ছে দ্য ফিলোসফি অফ বিবেকানন্দ এন্ড দ্যা ফিউচার অফ ম্যান‘, যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্সি প্রেস হতে প্রকাশিত। বইটি পড়তে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে নতুন করে অনেক কিছু জানলাম। মানুষের জীবনবোধ, মানুষকে মানুষঅর্থাৎ ঈশ্বরের অংশ হিসেবে স্বামীজির মুল্যায়ন তথা বেদান্ত দর্শন নিয়ে তাঁর ভাবনা নতুন করে আবিষ্কার করলাম। একবিংশ শতাব্দীতে দেশের মানুষের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর ভাবনার প্রতিফলনও উঠে এসেছে এ বইয়ে।

তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় স্বামী বিবেকানন্দ বুঝতে পেরেছিলেন যে মানবজাতি এক গভীর সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক জীবনযাত্রার উপর অত্যধিক জোর মানুষকে দ্রুত যন্ত্রের স্তরে নামিয়ে দিচ্ছে। নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ‘ক্ষুণ্ন’ করা হচ্ছে। সভ্যতার মৌলিক নীতিগুলিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। স্বামীজীর মতে মানুষ পশুত্ব, মানবতা এবং দেবত্বের মিশ্রণ। শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত আত্মপ্রচেষ্টা, আত্মোপলব্ধি এবং যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাকে পশুত্ব থেকে ঐশ্বরিক অবস্থায় উন্নীত করতে সহায়তা করা। দেশ যদি কোনও ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়, তবে নিঃসন্দেহে এটি প্রকৃত চরিত্রের মানুষ তৈরির ক্ষেত্রে। তাঁর মতে আজ সমাজের মূল উপাদান, মানুষ, প্রকৃতিগতভাবে খুব কমই ‘মানুষ’। অতএব, স্বামী বিবেকানন্দ এমন একজন মানুষ সৃষ্টির কল্পনা করেছিলেন যিনি করুণাময় এবং বুদ্ধিমান, “হৃদয়ে মহান এবং মনের দিক থেকে মহান“, এবং যিনি তাঁর কার্যকারিতার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। স্বামীজি বলেছিলেন যে, “আমরা এমন একজন মানুষ চাই যার হৃদয় পৃথিবীর দুঃখকষ্ট তীব্রভাবে অনুভব করেএবং আমরা চাই এমন একজন মানুষ যে কেবল অনুভব করতেই পারে না বরং জিনিসের অর্থ খুঁজে পেতে পারে, যিনি প্রকৃতি এবং বোধগম্যতার হৃদয়ে গভীরভাবে ডুবে থাকেন। এমন একজন মানুষ সমাজে প্রয়োজন, যিনি এখানেই থেমে থাকবেন না বরং যিনি প্রকৃত কর্মের মাধ্যমে অনুভূতি এবং অর্থ বের করতে চান। তাঁর কাছে, শিক্ষা কেবল মানসিক ক্ষমতার চাষ নয় যেমন প্লেটো ভেবেছিলেন। বুদ্ধির বিকাশ অবশ্যই হৃদয় এবং আত্মার বিকাশের সাথে হতে হবে। মানুষের হৃদয়কে অবশ্যই দরিদ্র ও নিপীড়িতদের জন্য রক্তক্ষরণ হতে হবে। প্রকৃত মানুষের আত্মাকে অবশ্যই সামাজিক কাজের জন্য প্রেরণা প্রদান করতে হবে।

স্বামীজী যখন বলেন, “যে শিক্ষা সাধারণ মানুষকে জীবন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে না, যা চরিত্রের শক্তি, দানশীলতার চেতনা এবং সিংহের সাহস বের করে আনে না তখন কি এটিকে শিক্ষা বলা যায়? প্রকৃত শিক্ষা হলো সেটা যা মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম করে।” তাঁর মতে, “শিক্ষা কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ তথ্য নয় যা আমরা আমাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করাই এবং সারা জীবন অপাচ্যভাবে সেখানে এগুলি তাণ্ডব চালাই। আমাদের অবশ্যই জীবন গঠন, মানুষ গঠন এবং চরিত্র গঠনের মাধ্যমে ধারণাগুলির আত্তীকরণ করতে হবে।” স্বামী বিবেকানন্দ কোন জিনিস জেনে কার্যে পরিণত করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন বেশী। তাঁর মতে যদি তুমি পাঁচটি ধারণা আত্মস্থ করে তোমার জীবন ও চরিত্রে পরিণত করে থাকো, তাহলে তোমার শিক্ষা এমন যেকোনো মানুষের চেয়ে বেশি, যে পুরো একটি গ্রন্থাগার মুখস্থ করেছে। একটি উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি গাধা একটি ভারী চন্দনের বোঝা বহন করে চলছে। গাধাটি কেবল চন্দনের ওজন জানে, মূল্য বোঝে না। সেরূপ যদি শিক্ষা তথ্যের সাথে অভিন্ন হয়, তাহলে গ্রন্থাগারগুলি হল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানভান্ডার এবং বিশ্বকোষ হল সবচেয়ে জ্ঞানী।অতএব, এটা স্পষ্ট যে আমরা সেই শিক্ষা চাই যার মাধ্যমে চরিত্র গঠন করা হয়, মনের শক্তি বৃদ্ধি পায়, বুদ্ধি প্রসারিত হয় এবং যার মাধ্যমে মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। এর পাশাপাশি, আজ আমাদের যা প্রয়োজন তা হল আমাদের নিজস্ব জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা এবং এর সাথে ইংরেজি ভাষা এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞান; আমাদের কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্প বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু। যাতে মানুষ সাহায্য ও সেবার সন্ধান না করে, তাদের ভরণপোষণের জন্য পর্যাপ্ত উপার্জন করতে পারে। বিবেকানন্দ বলেন, আমাদের দেশ এখন এমন মানুষ চায় যাদের থাকবে লোহার মতো পেশী ও ইস্পাতের ন্যায় স্নায়ু, এবং বিশাল ইচ্ছাশক্তি যা কোন কিছুতেই প্রতিরোধ করতে পারে না, এবং যা মহাবিশ্বের রহস্য ভেদ করতে পারে। অর্থাৎ তাঁর মতে আমরা সর্বত্র মানুষ তৈরির শিক্ষাই চাই। স্বামীজির মতে কোন মহান মানুষকে মূল্যায়ন করার জন্য তাঁর বড় কাজকে বিবেচনায় না নিয়ে, তাঁর ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে কিভাবে তিনি সফল হন সেটির প্রতি লক্ষ্য রাখতে বলেছেন। তিনি বলেন, যে কোন মানুষ জীবনে যে কোন একটি বড় কাজ করে ফেলতে পারে। সেটি দিয়েই তাঁর সাফল্য নির্ধারিত হয় না। বরং বড় কাজটিকে সফলভাবে করার জন্য তাঁর সারা জীবন নিজেকে গড়ার যে ছোট ছোট চেষ্টাগুলো ছিল সেগুলোই আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।

বইটিতে লেখক স্বামীজিকে শুধু একজন শিক্ষা সংস্কারক হিসেবেই দেখাননি। বরং একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে স্বামীজীর বেদান্ত দর্শনের ভাবনা গুলোকে তুলে এনেছেন। লেখক উনাকে সর্বজনীন ধর্মের প্রবক্তা হিসেবেও দেখাতে চেয়েছেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমস্ত ধর্মই একই সত্যের দিকে নিয়ে যায়। প্রথমত তিনি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের প্রচার করেছিলেন। তাঁর মতে সকল ধর্মের মূল এক। তাই অন্যের ধর্মকে সম্মান করো, কিন্তু নিজের ধর্মকে ভুলো না।দ্বিতীয়ত সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধের ধারণা প্রচার করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সকল মানুষই ভাইভাই। পাশাপাশি তিনি ধর্মের অভ্যন্তরীণ সত্যের উপর জোর দিতেন। তিনি বলতেন, “ধর্ম হলো অভ্যন্তরীণ অনুভূতি, বাহ্যিক আচারঅনুষ্ঠান নয়।স্বামী বিবেকানন্দের সর্বজনীন ধর্মের ধারণা বিশ্বব্যাপী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। এটি মানুষকে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সমন্বয় এবং ভ্রাতৃত্বের পথে চলতে শিখিয়েছে। সর্বজনীন ধর্মের গুরুত্বের কথা বলতে গেলে মানবতার কথা বলতে হয় যা তিনি প্রচার করে গেছেন আজীবন। মানবসেবাকে তিনি ঈশ্বরের সেবার সাথে তুলনা করেছেন। সবার উপরে গুরুত্ব দিয়েছেন দরিদ্র অসহায়দের সেবাকে। কারণ তাঁর ঈশ্বর দর্শন হতো অসহায়দের দেখলে।

পরিশেষে বলতে হয় বইটি পড়ে আবারও আবিষ্কার করলাম স্বামী বিবেকানন্দ একজন মহান দার্শনিক, তৎকালীন শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারক এবং মানবতাবাদী ছিলেন। তাঁর সর্বজনীন ধর্মের ধারণা বিশ্বব্যাপী মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। এটি মানুষকে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সমন্বয় এবং ভ্রাতৃত্বের পথে চলতে শিখিয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ আমাদের জীবনে সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রেরণা দেয়। আজ এ মহান ঋষির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা তাঁর জন্মদিনে।

লেখক : অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, চুয়েট; বিভাগীয় সম্পাদক (চট্টগ্রাম), বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদ, বাংলাদেশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসূর্য সেন : বিপ্লবের অবিনাশী নাম
পরবর্তী নিবন্ধপাকা সেতু নির্মাণ হলেই ঘুচবে দুই উপজেলার হাজারো কৃষকের দুর্ভোগ