জীবনকে আমরা প্রায়শই একটি অজানা নদীর মতো ভাবি–একটি প্রবাহিত স্রোত যা কখনও শান্ত, কখনও তীব্র। প্রতিটি মানুষের জন্ম যেন সেই নদীতে একটি নতুন তরঙ্গের সূচনা, আর মৃত্যু হলো সেই তরঙ্গের আবার অসীম জলরাশিতে মিশে যাওয়া। আমাদের চোখে প্রতিটি জীবন একটি স্বতন্ত্র গল্পের মতো, কিন্তু সেই গল্পের সীমানা আমরা প্রায়শই ধরতে পারি না। কেউ দীর্ঘ একশো বছর বেঁচেও অনবদ্যভাবে জীবনের প্রবাহে নিজেকে রাখে, আবার কেউ বসন্তের প্রথম ফুলের মতোই ক্ষণিকের জন্য ফুটে ঝরে যায়। এই বৈপর্যয়ই আমাদের অবাক করে, আমাদের প্রশ্নে ফেলে–এই জন্ম ও মৃত্যুর এত ভিন্ন চিত্রের পেছনে কি কোনো ন্যায়বিচার বা বিধান কাজ করছে, নাকি সবই একটি অন্ধ দৈবচক্রের খেলা?
জীবনের এই বৈপর্যয় বোঝার জন্য আমাদের দৃষ্টি একমাত্র নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, এক বৃহত্তর চিত্রের দিকে সমপ্রসারিত হতে হবে। আমরা যেন সেই মহাকাব্যের অল্প অক্ষর মাত্র, আর এই মহাকালের রচয়িতা যে সূক্ষ্ম নকশায় প্রতিটি অক্ষর সাজাচ্ছেন, আমরা তা পুরোপুরি দেখতে পারি না। তাই যখন একটি জীবন হঠাৎ থেমে যায়, আমরা বলি–এটা অসময়ে হয়েছে। কিন্তু মহাকালের দৃষ্টিতে প্রতিটি জন্ম, প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি বিপর্যয়, প্রতিটি আনন্দ–সবই সুনির্দিষ্ট সময় এবং স্থানে ঘটে। এটাই হলো জীবনের সুতো, এবং এই স্রোতেই প্রতিটি মানুষের ভূমিকার পূর্ণতা নিহিত।
জন্ম হলো ক্যানভাসে প্রথম তুলির স্পর্শ। এটি নিশ্চিত, কারণ গল্প শুরু হবে–বেশি বা কম, দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত। মৃত্যুও তেমনি নির্ধারিত, কারণ কোনো গল্পই চিরন্তন নয়। কিন্তু সেই গল্পের দৈর্ঘ্য, তার বিস্তার, তার গভীরতা–এটি নির্ভর করে সেই বৃহত্তর চিত্রের প্রয়োজনীয়তার ওপর। কেউ আসেন পৃথিবীতে কেবল একটি বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিতে; তার কাজ শেষ হলে তিনি চলে যান। আমাদের কাছে সে জীবন হয় ‘ক্ষুদ্র’, কিন্তু মহাকালের দৃষ্টিতে তা পূর্ণ।
এখন প্রশ্ন আসে–এই বিধানটি কি কোনো ব্যক্তির খামখেয়ালির ফল? নাকি কোনো শক্তির ইচ্ছার খেলা? এ প্রশ্নের উত্তর নেহাত সহজ নয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি হলো কর্ম, কারণ এবং অভিজ্ঞতার জটিল জাল। প্রতিটি আত্মা একটি দীর্ঘ যাত্রার যাত্রী। যখন সে জন্ম নেয়, তখন তার কাঁধে থাকে একটি অদৃশ্য ঝুলি; তাতে কিছু অসমাপ্ত কাজ, কিছু শেখার বাকি পাঠ, এবং কিছু ঋণ শোধ করার দায়িত্ব থাকে। তার জন্মস্থান, পরিবার, শরীর–সবই তার সেই পাঠ শেখার জন্য সর্বোত্তম মঞ্চ। তার জীবনকালও ঠিক সেই সীমা পর্যন্ত নির্ধারিত হয় যা তার সেই ভূমিকাকে সম্পূর্ণ করতে যথেষ্ট।
কখনও কখনও আমরা দেখি একজন মানুষ বিপদের মধ্যেও বেঁচে ফিরে আসে। আমরা বলি–এটি ভাগ্যের দান। কিন্তু গভীরে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, তার বেঁচে থাকা কোনও ‘মিরাকল’ নয়। এটি তার নির্ধারিত পথের অংশ। মহাকালের চূড়ান্ত পরিকল্পনায় তার ভূমিকা তখনও অসম্পূর্ণ ছিল। তার বেঁচে থাকা মানে, তার মধ্য দিয়ে আরও কিছু সম্পন্ন হওয়া বাকি ছিল, যা অন্য সময়ে অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
আরেকটি রহস্য হলো ‘অকাল’ মৃত্যু। কেউ যদি আকস্মিকভাবে চলে যায়, আমরা তাতেই বলি–সময়ের আগে। কিন্তু মহাকালের দৃষ্টিতে ‘সময়ের আগে’ বা ‘পরে’ বলে কিছু নেই। প্রতিটি মৃত্যুরই একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। আমাদের যন্ত্রণা আসে শুধু আমাদের সীমিত বোঝার কারণে। সেই আত্মা হয়তো এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিল, যা তার সহনশীলতার বাইরে ছিল, অথবা তার যাত্রাপথ এমন বাঁক নিয়েছিল যা আমাদের দৈনন্দিন যুক্তিতে মেলে না।
এই ধরনের মৃত্যুর প্রভাব তার চারপাশের মানুষের ওপর গভীর হয়। শূন্যতা তৈরি হয়, প্রেম, মায়া, ত্যাগের অনুভূতি জন্মায়, নতুন উপলব্ধি এবং শিক্ষার দরজা খুলে যায়। তার শক্তি বিলীন হয় না, বরং রূপান্তরিত হয়ে অন্য রূপে ছড়িয়ে পড়ে। তার বিদায় নেমে আসে, কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায়–অদৃশ্য প্রেরণার রূপে, যা অন্যদের পথ চলায় গাইড হয়ে কাজ করে।
জীবনের এই আসা–যাওয়ার মধ্যে নিহিত মূল শিক্ষার দুটি স্তম্ভ হলো–ভারসাম্য এবং শিক্ষা। পৃথিবী স্থবির থাকলে নতুন কিছু সৃষ্টি হতো না। যদি সবাই অমর হতো, জীবন স্থবির হয়ে যেত। আবার যদি সবাই একই সময়ে চলে যেত, বৈচিত্র্য হারাত। যেকেউ আগে আসে, কেউ পরে–এই চক্রের মধ্যে জন্ম নেয় সম্পর্ক, ভালোবাসা, ত্যাগ, এবং সংযোগ।
শুধু সম্পর্কই নয়, জীবন এবং মৃত্যু আমাদের শেখায় সময়ের গুরুত্ব। মৃত্যুর উপস্থিতিই জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে। সময় সীমিত বলেই মানুষ কাজ করতে, ভালোবাসতে, ক্ষমা করতে, এবং সৃষ্টি করতে শেখে। যদি সময় অসীম হতো, আমরা সব কিছুই ‘পরের জন্য’ ফেলে দিতাম। সীমিততার মধ্যে আমরা শিখি–যা করতে হবে, তা এখনই করতে হবে। যা বলতে হবে, তা এখনই বলা জরুরি।
জীবনের এই অনিশ্চয়তাই একে সুন্দর করে তোলে। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, কারণ আমরা জানি না পরের মুহূর্তে কী ঘটবে। এই শিক্ষাই আমাদের দেয় একটি গভীর দার্শনিক উপলব্ধি–আমরা সবাই মহাকালের স্রোতে ভাসমান যাত্রী। প্রত্যেকেরই একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে, তা ছোট হোক বা বড়। সেই ভূমিকাটি শেষ হলে আমাদের বিদায় নিতে হয়, যেন নতুন কেউ এসে তার ভূমিকা পালন করতে পারে। এই চলমানতা, এই আসা–যাওয়ার চক্রই মহাকালের শাশ্বত বিধান।
জন্ম এবং মৃত্যু, বসন্তের ফুলের মতো ফুটে ওঠা এবং ঝরে যাওয়া–সবই এই বৃহত্তর প্রবাহের অংশ। মানুষের চোখে জীবন ছোট বা দীর্ঘ, সুখ বা দুঃখময়–কিন্তু মহাকালের দৃষ্টিতে প্রতিটি মুহূর্ত পূর্ণ, প্রতিটি জীবন অর্থপূর্ণ। এই উপলব্ধি আমাদের শেখায়–জীবন কখনো ফুরিয়ে যায় না; তা শুধু রূপান্তরিত হয়, নতুন শিক্ষার, নতুন সংযোগের, নতুন প্রেরণার আকারে।
এইভাবে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি হারানো বা পাওয়া–সবই মহাকালের সুতোতে বোনা। আর এই সুতোই আমাদের শেখায়–প্রতিটি জীবন পূর্ণ, প্রতিটি মৃত্যু প্রয়োজনীয়, প্রতিটি সময় মূল্যবান। মহাকালের বিধান অদৃশ্য হলেও স্পষ্ট, এবং এই বিধানেই নিহিত আছে জীবন, মৃত্যু, এবং বসন্তের চিরন্তন চক্র।
লেখক : কবি–গল্পকার ও শিক্ষক











