সড়ক দুর্ঘটনা মানে প্রতিকারহীন হত্যাকাণ্ড, তা থেকে পরিত্রাণ চাই

| শুক্রবার , ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে এক প্রতিকারহীন হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি দৈনিক আজাদীতে ‘সড়কে ঝরল ৬ প্রাণ’ শীর্ষক প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় গত মঙ্গলবার পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। রাঙ্গুনিয়ার তক্তারপুল এলাকায় বাসমোটরসাইকেল সংঘর্ষে দুই ছাত্র নিহত হয়। সীতাকুণ্ডে তিনটি পৃথক স্থানে পথচারীদের চাপা দেওয়ার ঘটনায় তিনজন মারা যান। লোহাগাড়ায় মালবাহী ট্রলির সঙ্গে বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পুলিশ ও হাইওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ি এখনও আটক করা সম্ভব হয়নি। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনাসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওইসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ১৪ হাজার ৮১২ জন। সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী, দুর্ঘটনা আগের বছরের তুলনায় ৬.৯৪ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। গত এক বছরে দুই হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই হাজার ৯৮৩ জন নিহত এবং দুই হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছে। এ সংখ্যা যথাক্রমে মোট দুর্ঘটনার ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যার ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যার ১৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ৪ জানুয়ারি রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এই প্রতিবেদনটি তুলে ধরে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত বছর রেলপথে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হয়েছে। নৌপথে ১২৭টি দুর্ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত, ১৩৯ জন আহত এবং ৩৮ জন নিখোঁজ হয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে সাত হাজার ৩৬৯টি। এসব দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৭৫৪ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯৬ জন আহত হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আর মৃতের হার বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আহত ১৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়েছে। আক্রান্ত যানবাহনের সংখ্যা ১০ হাজার ২৮৮। এসব দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, সড়কের নির্মাণত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ইত্যাদি। সংগঠনটি মনে করে, সরকার দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিতে পারায় পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ১২টি সুপারিশও প্রস্তাব করে।

আসলে নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও সড়কে থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাব। মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দিয়ে এবং গতি পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে চালকদের ওই নির্দিষ্ট গতি মেনে চলতে বাধ্য করা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্ল্ল্লিষ্টরা। তাছাড়া চালকের দক্ষতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে। মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ করতে হবে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে ইতোপূর্বে নানা ধরনের পরামর্শ ও সুপারিশ করা হয়। কিন্তু কেউ তাতে কর্ণপাত করেন বলে মনে হয় না। কর্তৃপক্ষও যেন নির্বিকার। ফলে একের পর এক ঘটে চলেছে দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ২০১৯ সালে একটি আইন কার্যকর করা হলেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন আজও নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন সহজেই। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় এ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমরা মনে করি, এতে চালকের দক্ষতা ও মানসিকতায় রয়েছে বড় সমস্যা। ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ছাড়া ভারী যান চালানো এবং সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছার অমানবিক প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত মানুষ মারছে। এই ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, বাধ্যতামূলক মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত রিফ্রেশার কোর্স চালু করা উচিত। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় জড়িত চালকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে বেপরোয়া মনোভাব বদলাবে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে