চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পাইপ লাইন ফুটো করে তেল চুরির এক ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অভিনব পন্থায় তেল চুরির এই ঘটনা বেশ কয়েকদিন ধরে চললেও গতকাল পাইপ লাইনে সরবরাহ চাপ বেড়ে গেলে চারদিকে তেল ছড়িয়ে পড়ে। আর এতেই ধরা পড়ে চুরির ঘটনা। মীরসরাই থানাধীন ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে চলছিল এ চুরির কাজ। এই ঘটনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটতে পারতো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এভাবে ঠিক কি পরিমাণ তেল চুরি করা হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি। তবে আগে লোপাট করা তেলের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সংঘবদ্ধ চক্র এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা তা নিয়েও চলছে জল্পনা কল্পনা।
বিপিসি এ ঘটনার ব্যাপারে সংস্থার মহাব্যবস্থাপক ( বাণিজ্য ও অপারেশন) মিজানুর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ঘটনার জন্য যাকে সন্দেহ করা হচ্ছে ওই ব্যক্তি গা ঢাকা দিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। গতরাত পর্যন্ত তার কোনো পরিচয় বা ছবিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তির ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসির পক্ষ থেকে ঘটনার ব্যাপারে একটি মামলা রুজুর প্রক্রিয়া চলছে বলে রাতে পুলিশ জানিয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহের পেট্রোলিয়াম পাইপ লাইন নির্মাণের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল হয়ে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপ লাইনটিতে ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছে। নৌপথে তেলবাহী ট্যাংকারে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত তেল পরিবহনে অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। নতুন পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র ৪ ঘণ্টায় তেল পৌঁছানো সম্ভব হয়। কিন্তু অত্যাধুনিক সেই পাইপ লাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনা নানা প্রশ্নেরও সৃষ্টি করেছে।
বিপিসি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সাথে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল সকালে উক্ত এলাকায় রাস্তা, ঘরের আঙ্গিনা এবং আশেপাশে ডোবাসহ সর্বত্র তেল ছড়িয়ে পড়ে। তেলের গন্ধে ভরে যায় পুরো এলাকা। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে খবর দিলে লাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনা সামনে আসে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই থানাধীন হাদি ফকিরহাটের সন্নিকটস্থ গাছবাড়িয়া এলাকায় মহাসড়কের পাশে আমিরুল ইসলাম ( ৪৮) নামের এক ব্যক্তি মাস খানেক আগে এক টুকরো জমি ভাড়া নেন। ওই ব্যক্তি কিছুদিন সেখানে থাকার কথা বলে টিন কাঠ দিয়ে একটি অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেন। ঘরটি নির্মাণ করা হয় ইতোমধ্যে নির্মিত জ্বালানি তেলের পাইপ লাইনের উপরেই। ধারণা করা হচ্ছে যে, ঘরটি নির্মাণের পর তিনি মাটির অন্তত ১২ ফুট গভীরে থাকা পাইপ লাইন ফুটো করার কাজ শুরু করেন এবং তাতে সফল হয়ে তেল বের করে আনেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে কোনো কারণে লাইনে তেলের সরবরাহ চাপ বেড়ে গেলে তা আর নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। তেল চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরটির পাশ্ববর্তী কচুরিপানা ভর্তি একটি ডোবাও তেলে ভরে যায়। আশেপাশের মানুষ নানাভাবে তেল সংগ্রহ করতে শুরু করে।
ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি বিপিসিকে জানানো হয়। প্রশাসন এবং বিপিসির কর্মকর্তা কর্মচারীরা এসে অস্থায়ী ঘরটি তল্লাশি করলে তেল চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। তবে প্রশাসনের লোকজন আসার আগেই আমিরুল ইসলাম নামের ওই লোক পালিয়ে যান। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এই বিষয়ে মীরসরাইয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, ঘটনাটি জানার পর দ্রুত আমরা পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানিকে খবর দিয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস পাঠাই। তিনি বলেন, মহান আল্লাহর রহমত কেউ সেখানে কেউ দিয়াশলাই বা কোনো প্রকার আগুনের স্পর্শ ছোঁয়ায়নি। তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতো। তিনি বলেন, সকাল থেকেই এসিল্যান্ড আলাউদ্দিন কাদের ঘটনাস্থলেই অবস্থান করেছেন।
অপরদিকে জমির মালিক নুর জাহান বলেন, প্রায় এক মাস আগে আমিরুল ইসলাম জায়গাটি ভাড়া নিয়ে নিজেই ঘরটি তৈরি করে নেন। তার স্বামী নুরুল আবছার ঘরটি ভাড়া দিলেও ভাড়াটিয়ার কোনো ঠিকানা সংরক্ষণ করা হয়নি। তারা তাকে চিনেন না বলে জানান।
মীরসরাই থানার অফিসার ইনচার্জ ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ঘটনা জেনেই সকাল থেকে পুলিশ টিম সেখানে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সাথে নিয়ে কাজ করছে। তেল উদ্ধারসহ সকল কাজে সহযোগিতা করছে। তিনি বলেন, আমরা জমির মালিক নুরজাহানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে এসেছি। ঘটনাস্থল থেকে একটি ড্রিল মেশিন, বেশ কিছু তেলের ড্রাম উদ্ধার করা হয়েছে। নির্গত ও বাহিরে থাকা বর্তমানে তেলের পরিমাণ কতটুকু হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘরের ভেতর লাইনের ফুটো অংশজুড়ে বড়সড় একটি গর্ত এবং পাশের ডোবা তেলে ভরে গেছে। এতে কয়েক হাজার লিটার তেল নষ্ট হতে পারে বলে তিনি অনুমান করেন।
গতকাল রাত ১০টার পরও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা মাটির অন্তত ১২ ফুট নিচে থাকা পাইপ লাইনের ফুটো মেরামত করছিলেন। সকাল থেকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের মীরসরাই ইউনিটের টিম লিডার চালেংগো মারমা বলেন, সকাল থেকে আমরা কাজ করছি। সকল ঝুঁকিপূর্ণ তেল অপসারণের চেষ্টা করেছি। এখন কোম্পানির লোকজন দায়িত্বরত আছেন।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসির কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরীক্ষণের আগে বলা সম্ভব নয় বলে তারা জানান। ঘটনার ব্যাপারে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মিজানুর রহমানকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পাইপ লাইনের ক্ষয়ক্ষতি এবং চুরি হওয়া তেলের পরিমাণ নির্ণয় করে এই কমিটিকে আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলেছেন, অত্যাধুনিক এই পাইপ লাইনে নিরাপত্তাজনিত কিছু ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর থাকার কথা। তবুও এই ঘটনা কি করে ঘটলো তাও তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে।
ঘটনাটি এলাকার পাশাপাশি পেট্রোলিয়াম সেক্টরে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এতো সুরক্ষিত একটি পাইপলাইন এভাবে কেটে তেল বের করে নেয়ার ঘটনাটিকে সহজভাবে দেখা উচিত হবে না মন্তব্য করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এটি স্রেফ বোকামি করে তেল চুরির ঘটনা নাকি সংঘবদ্ধ কোনো চক্রের কারসাজি তা খতিয়ে দেখা দরকার। ডিপোগুলো থেকে ইতোপূর্বে লুট হওয়া কয়েক লাখ লিটার তেলের সাথে অভিনব পন্থার এই তেল চুরির কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে না দেখলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
প্রসঙ্গত, দেশের চাহিদার ৭০ লাখ টন জ্বালানির অন্তত ৩০ লাখ টন ব্যবহৃত হয় ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে। এসব জ্বালানির বেশিরভাগই বেসরকারি অয়েল ট্যাংকারের মাধ্যমে নৌপথে পরিবাহিত হয়। যেখানে কোটি কোটি টাকার তেল চুরিসহ নানা ধরনের অপকর্ম ঘটে। ট্যাংকারে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে পয়েন্ট ১৭ শতাংশ সিস্টেম লস বিপিসি মেনে নেয়। বছর শেষে এই পয়েন্ট ১৭ শতাংশ বিশাল অংক হয়ে দাঁড়ায়। সিস্টেম লস কিংবা তেল চুরির এই বিশাল লোকসান থেকে দেশের জ্বালানি তেল সেক্টরকে বাঁচাতেই মূলতঃ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপ লাইন নির্মাণ করা হয়। ৫০ লাখ টন ধারণক্ষমতার পাইপ লাইনে বর্তমানে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ দেয়া হবে। জ্বালানি তেল সরবরাহ এবং চট্টগ্রাম থেকে গোদনাইলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিস্টেম লস শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
গত ১৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর থেকে এই পাইপ লাইন ব্যবহার করে তিনটি তেল বিপণন কোম্পানি জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে। এই পাইপ লাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বারুড়া হয়ে জ্বালানি তেল নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং ঢাকার ফতুল্লায় পৌঁছায়। কুমিল্লার বরুড়ায় রয়েছে এই পাইপ লাইনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ অটোমেটেড ডিপো। ডিপোতে জ্বালানি তেল গ্রহণ এবং সরবরাহ সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে। তেলের ওজন, তাপমাত্রা, সরবরাহ সবই পরিচালিত হয় কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তিতে। ম্যানুয়ালি কোনো কাজই হয় না। চট্টগ্রামের ডেসপ্যাচ টার্মিনালের স্ক্যাডা মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই পুরো পাইপ লাইনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করা হয়। স্ক্যাডা, টেলিকমিউনিকেশন এবং লিক ডিটেকশন করতে এই পাইপ লাইনের সাথে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল লাইন সংযুক্ত রয়েছে। ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপ লাইনের ২৪১ কিলোমিটার অংশে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ বসানো হয়েছে, যা পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশাপাশি, গোদনাইল থেকে ফতুল্লায় ডিপো পর্যন্ত ৮.২৯ কিলোমিটার পৃথক ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়েছে।
বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, ভূ–গর্ভস্থ এই পাইপ লাইন ২২টি নদী ও খালের নিচ দিয়ে এসেছে এবং পুরো রুটে মোট ৯টি পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ট্যাংকারে তেল পরিবহনে বিপিসির বার্ষিক খরচ হতো প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা। পাইপ লাইনে তেল সরবরাহে খরচ মাত্র ৯০ কোটি টাকা। এতে বছরে অন্তত ২২৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বিপিসির। এছাড়া সিস্টেম লস এবং চুরি ঠেকানোর মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা রক্ষা পাবে বলেও উদ্বোধনের সময় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। আর বলা হয়েছিল, অত্যাধুনিক এই পাইপ লাইনে কোনো ধরনের চুরির সুযোগ নেই।












