মরুর নরেশ পরেশ
তারুণ্যের ঠিক কোন প্রহরে হায়দারাবাদের তরুণ সৈয়দ রিজভি এসেছিল এই মরুতে, তা জানি না। এটুকু জানি যে তারপর পার হয়ে গেছে একে একে মরুতে তার ২৮ বছর। মরু খররোদে তারুণ্য ও যৌবন শুকিয়ে, রিজভি পৌঁছেছে এখন অবসর ছুই ছুই সময়ে। শুরু থেকেই মোটামুটি ভাল চাকুরী করা রিজভি, বউ ছেলে মেয়ে দেশে রেখে কেন যে এই মরুতে থাকছে একাকী, তাও জিজ্ঞেস করিনি। ওরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্কতো নয় তার সাথে আমার।
তদপুরি শুরু থেকেই দেখে আসছি, কাজের ফাঁকে ফাঁকে, আর অবসরে, নিজ রুমে বসে একমনে ভারতীয় ওয়াজ ব্যবসায়ী জাকের নায়েকের ওয়াজ শোনা নিয়ে থাকা, রাজভি সুযোগ পেলেই দিতে চায় আমাকে জাকেরি সবক। আর কোম্পানির কাজ নিয়ে বা সৌদি মার্কেট নিয়ে কথা বলতে গেলেই, উচ্চ নিনাদে শুরু করে নিজ ঢোল পেটানো। এ যাবতকাল অগ্রাহ্য করেছি যা। শুনেও না শোনার ভান করে মৃদু হেসেছিই, শুধুমাত্র বয়সের কারণে শ্রদ্ধা করার এশিয়ান সংস্কৃতি মেনে।
এ ছাড়া লক্ষ করেছি কম্পিউটারের এক্সেল প্রোগ্রামে বেশ দক্ষ সৈয়দ রাজভির বরাবরের স্টাইল হলো, যে কোন মার্কেট এনালাইসিস করা শেষে, তাতে নেগেটিভ কিছু পেলেই, সাথে সাথেই মার্কেটিং এর সংশ্লিষ্টজনকে তীব্র দোষারোপ করে মন্তব্য জুড়ে দিয়ে, কম্পানিজুড়ে মেইল দিয়ে দেয়া। শুরুতে আমারই টিমের নানানজনকে দোষারোপ করে দেয়া ঐ মেইলগুলোতে কিছুটা বিচলিত বোধ করে, নেগেটিভ কিছু বের করার জন্য প্যারালাইসিস করার মতো তার এনালাইসিসগুলো ভাল করে লক্ষ করতেই দেখেছি বেশীরভাগই হল ওসব ভাসা ভাসা। আর সেই ভাসা ভাসা এনালাইসিসের উপর ভিত্তি করে টানা তার উপসংহারই হয়ে উঠে স্বভাবতই খুবই খেলো। এমনকি অনেক সময় সেসব হয়ে দাঁড়ায় যা, তা হলো তৃতীয় মিথ্যা। মানে পরিসংখ্যানগত মিথ্যা।
এই যেমন হয়তো স্টক না থাকার কারণে কোন মাসে কোন প্রোডাক্টের সেলস কম হল। মাস শেষে রিজভি তারা রুটিন এনালাইসিস করার আগে সাপ্লাইচেইন বা আমাদের ডিস্ট্রিবিউটরের সাথে কথা বলে মূল কারণটি না জেনেই, দেখা যায় সেলস কম হওয়ার কারণ হিসাবে মার্কেটিং ও সেলসের লোকজন ঠিকমতো কাজ করছে না বলে মন্তব্য জুড়ে দেবে। উপরন্তু দীর্ঘ সময় কর্মক্ষেত্রে মিশরিসমৃদ্ধ পরিবেশে মিশরিপরিবেষ্টিত অবস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন রাজভি, কী কারণে যেন ঘোরতর রকমের মিশরি বিরোধী হয়ে গেছে। তাই, মিশরি কারো তিল পরিমাণ ভুলকে তাল করে তোলার তালে থাকে সে সব সময়। এতে মিশরিসমৃদ্ধ আমার টিম এবং সেলস টিমের কারো কাছেই নাই তার একবিন্দু গ্রহণযোগ্যতা! এর চেয়েও বড় ব্যাপার হচ্ছে তার নিজের টিমের সদস্য তালাত ও ইসামের সাথেও নাই তার কোন সখ্য।
অবশ্য ঐ টিমের বাকী দুজনেরও অবস্থা তথৈবচ। একটা ব্যাপারেই এই ত্রিমূর্তির আছে তুমুল মিল, তা হল ছুতানাতা কিছু পেলেই দেয় দৌড় তিনজনেই সোজা কান্ট্রি হেড ফিলের রুমে। তবে সে সময়ও যায় তারা আলাদা আলাদা, একজোট হয়ে না। অবশ্য তিনজনের কাজের ক্ষেত্র তিন রকম হওয়ায়, কোন কাজ নিয়েই তাদের একাট্টা হওয়ার সুযোগ নাই। কোম্পানির সর্বোচ্চ পদাধিকারীর রুমের আশেপাশে কারণে অকারণে ঘোরাঘুরি করার স্বভাব অবশ্য একটু বেশি বেশিই আছে ইসামের মধ্যে।
ঐটুকু ছাড়া নিজ বসের মতোই সারাক্ষণ একতলার নিজ অফিস রুমে নিজেকে আবদ্ধ রেখে, স্বল্পভাষী ও সবজান্তা ভাবের প্যালস্টাইনি ইসাম, সেলস ফোর্সের ইফেক্টিভনেস নিয়ে যে রিপোর্ট পাঠায় দিকে দিকে, তা নিয়ে প্রবল আপত্তি আছে হেড অব সেলস সৌদি খলিল থেকে শুরু করে গোটা সেলস টিমেরই। বক্তব্য হল তাদের, ইসাম সবসময় ভুল রিপোর্ট পাঠায়। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে সেলস টিমের গুরুতর অভিযোগ হলো, ইচ্ছা করেই সে সেলসের সব ডাটা সময়মতো সিস্টেমে ইনপুট না দিয়ে, এমন খণ্ডিত রিপোর্ট বানায়, যাতে সেলসকে দোষারোপ করা যায়। হেড অব সেলস খলিল থেকে শুরু করে সেলস ও মার্কেটিং এর বেশির ভাগেরই মত হল, ইসাম হল এক ধুরন্দর ঘুঘু। কিন্তু ভাব ধরে থাকে যে ভাঁজা মাছটি উল্টে খেতে পারে না।
জানি না চুম্বকের সমমেরুর একে অপরে বিকর্ষণ করার যে নিয়ম আছে, সে নিয়ম মেনে একই টিমে কাজ করলেও স্বভাব দুজনের এক হওয়ার কারণেই সম্ভবত ইসাম ও রাজভি একজন আরেকজনকে মোটেও সহ্য করতে পারে না। লক্ষ্য করেছিলাম এই ব্যাপার কিছুদিন আগে একদম কাছে থেকে, দিয়েছিলাম যখন তাদেরকে বাজেট প্লানিংয়ের কিছু কাজ। কিভাবে যে সে সময় তাদের কাছ থেকে কাজ বের করিয়ে নিতে পেরেছিলাম, জানি না! তবে আবারো স্বীকার করছি কাজ তারা ভালই করে, এবং দুজনেই তারা যে নিজেকেই, এই অফিসের এক ও অদ্বিতীয় এক্সেল এক্সপার্ট ভাবে, টের পেয়েছিলাম তাও সে সময়।
বুঝতে পারছি না, সদ্য বিদায় নেয়া তাদের বস, এদেরই যন্ত্রণাতে সৌদি ছাড়লও কী না? নাকি তাদের বস মানে আমাদের ভূত পূর্ব স্ট্রাটেজি হেড আহমেদ আল বাদাউয়ির, যাকে বলে লিসি ফেয়া (Laissez Faire) লিডারশিপ, সেটির কারণেই হয়েছে তাদের এই অবস্থা! এদিকে স্ট্রাটেজি টিমের একমাত্র মিশরি সদস্য, ইন্সটিউটিওনাল সেলস ম্যানেজার, তালাত আল দিব ছাড়া এ দুজনেরই তুমুল ক্ষোভ দেখি তাদের বসের বিরুদ্ধেও। এ কি তবে দুজনেরই মিশরিদের বিষয়ে নিছকই জাতিগত বিদ্বেষের ফল?
অনেকবারই ভেবেছি স্ট্রাটেজি টিমে মার্কেটিং রিসার্সের রাজভির থাকা যুক্তিযুক্ত মনে হলেও, বাকী দুইজন মানে ইসাম আর তালাতের থাকার মানে কী? ওরা দু জন তো সরাসরি অপারেশনাল লোক।ফলে জিজ্ঞেসও করেছিলাম তা একদিন বস কে। উত্তরে স্বভাবগত উচ্চ হাসি হেসে বলেছে ফিল– “শিউর আই এম, ইউ ইয়োরসেলফ কেন ফাইন্ড ইট আউট!”
বসের ঐ উত্তর শোনার পর, নিজে নিজে ভেবে এই ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম, তা হল অনেক সময়ই দেখা যায় স্ট্রাটেজি টিম চমৎকার সব ভাষায় আর নানান ভঙ্গির গ্রাফে গ্রাফে, এমন সব পরিকল্পনার গল্প ফেঁদে বসে যে, প্রায়োগিক বাস্তবতা মানে অপারেশনাল রিয়েলিটি থেকে হয় তা “দিল্লি দূর অস্ত” জাতের। তদুপরি, এখানে আসার পর থেকেই দেখেছি স্ট্রাটেজি হেড, সকালবেলা অফিসে এসেই চতুর্থ আসমানে উঠে, মানে চারতলাস্থ তাঁর হুজরায় ঢুকে সেই যে গ্যাঁট হয়ে বসে, এর মাঝে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য হুজরা থেকে বের হয় কি না সে, তা না কেউ জনালেও বেরুয় যে সে ঐ অফিস থেকে শুধুমাত্র অফিস ছুটির সময়, এ সত্য সর্বজনবিদিত। এই দুই কারণ মিলিয়ে তাই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম যে ফিল হয়তো, তার স্ট্রাটেজি হেড যাতে অপারেশনাল খোঁজ খবরও রাখে, সেই জন্যই তার টিমে ঐ ইসাম আর তালাতকে জুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও কাজ হয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না।
সে যাক, ঐ ডিপার্টমেন্ট নিয়ে এতোক্ষণের এই গৌরচন্দ্রিকার কারণ হল, নিজেদের বস চলে যাওয়ার পর, তারা তিনজনই মনে হচ্ছে নিজেরাই ফিলকে বানিয়েছে তাদের বস। ফলে যখন তখন ছোটখাট সব ব্যাপার নিয়ে হাজির হচ্ছে ফিলের রুমে। তাতে সময় থাকলে ফিল কখনো কখনো তাদের কথা শোনে কি করতে পারিনি সে হদিস। শুধু এটুকু টের পেয়েছি, ঐ রুম থেকে বেরিয়ে আসে সোজা তারা আমার রুমে। ধারণা করি ফিলই দেয় পাঠিয়ে এইদিকে এবং নিশ্চয়ই হয় না তা তাদের মনোপুত। ফলে আমার কাছে এসেই দিতে শুরু নানান যন্ত্রণা, যা বেশীর ভাগ সময়েই না যায় কওয়া না যায় সওয়া!
এই যেমন একটু আগে ঝড়ের বেগে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সৈয়দ রাজভি আমার রুমে এসেই উচৈঃস্বরে নিজ বক্তব্যের উপক্রমনিকা হিসেবে যখন ঘোষণা করল, “২৮ বছর হল আছি আমি সৌদিতে। আমার সাথে ধড়িবাজি? মার্কেটিং ডিপার্টন্টেকে আমি মার্কেটিং কাকে বলে এক্কেবারে শিখিয়ে দিতে পারি। কি মনে করে নিজেকে আহমেদ রাদি”
হ্যাঁ গত দুইদিন ধরে আমার টিমের আহমেদ রাদির সাথে সৈয়দ রাজভির, গরম গরম চিঠি চালাচালি দেখলেও, মাথা ঘামাইনি তা নিয়ে। কারণ সময় কোথায়? একদিকে তুমুল দৌড়ঝাঁপ আর একটানা কাজ করে, আমাদের বাজেট প্লানিং এর কাজ অবশেষে শেষ করলেও, হেডকোয়ার্টারের সাথে সেটির ডিফেন্স মিটিং হওয়ার কথা আজই বিকেলে, ভিডিও কনফারেন্সিং এ। সে কারণে চুপচাপ বাজেট প্লানিং ডেক দেখতে দেখতে, বিকেলের মিটিং এর জন্য প্রস্তুত করছিলাম নিজেকে যখন ঠাণ্ডা মাথায়, তখনই কি না রাজভির মুখে ঐ কথা শুনে হারালাম মেজাজ এখন, অবলীলায় অগ্রাহ্য করেছি যা এতোদিন! কেন না জানি মনে হল এখন যে, নাহ একে আর বাড়তে দেওয়া যায় না। শক্ত একটা বার্তা দেওয়া দরকার তাকে। এই ভেবে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে উচৈঃস্বরে নয়, একদম নিচু ও ঠাণ্ডা গলায় বললাম, শোনেন মিঃ রাজভি, সবার কাছ থেকেই আমি শিখি, তবে কেউ যখন আমাকে শেখানোর চেষ্টা করে তার কাছে আমি কিন্তু হয়ে উঠি বড়ই বেয়াড়া রকমের ত্যাঁদড়।
কাজ হল আমি আমার গলার সুরে ও স্বরে, ভড়কে গেল রিজভি আমার বলা শব্দ ও বাক্যে নিশ্চিত নই। হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীচের দিকে চোখ নামিয়ে আমতা আমতা কর বলল , “না না আমি তো তোমাকে শেখাবার কথা বলিনি;” এটুকু বলেই খেলল সে রিজভি তার মিশরবিদ্বেষ কার্ড! ফিস ফিস করে বলল, “শোন মিঃ সেলিম আমি বলে দিচ্ছি এই মিশরিরাই তোমাকে ডোবাবে।” এটুকু শুনেই তাকে আরো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বললাম–
মিঃ রাজভি আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি যা বলছেন, অত্যন্ত বর্ণ বিদ্বেষী কথা তা, যার কোনই স্থান নাই আমাদের কোম্পানিতে। কেউ যদি এ বিষয়ে রিপোর্ট করে হেডকোয়ার্টারে, তা হলে কী হতে পারে অবস্থা, তা কী জানেন?
“আমি তো ফিলের কাছে গিয়েছিলাম । ফিলই তো আমাকে এখানে আসতে বললো?” কিছুটা তোতলাতে তোতলাতে রিজভি এ কথা বলতেই শীতলতর গলায় বললাম ফের কেন? আপনি ফিলের কাছে যাবেন কেন? উনি তো আপনার বস না। আপনার বস চলে যাওয়ার পর বারবারই তো উনি বলেছেন, আপনাদের যেকোন বিষয়েই আমার সাথে যোগাযোগ করতে আগে। শোনেন অফিসিয়ালি আপনার বস না হলেও, রাদির কিন্তু অফিসিয়াল বস আমি । রাদির ব্যাপারে আমাকে বাদ দিয়ে, কে কী করতে পারে আমি যে তা দেখবো, তা কি বুঝেছেন? এ বিষয়ে না জানলে পরিষ্কার জেনে রাখেন এখন, আমার লোক যা ই করুক কিম্বা হোক সে যে ই, আমি থাকতে তার কোন ক্ষতি হতে দেব না! শোনেন, আগামীকাল বিকেলে বসবো আমি আপনার আর রাদির ঐ মেইল চালাচালি বিষয়ে। এখন একটু বিকেলের মিটিংয়ের প্রস্তুতি নিতে দেন আমাকে! এতে জোকের মুখে লবণ পড়ার মতো অবস্থায় পরে সৈয়দ রাজভি, “সরি সরি”, “ওকে ওকে” বলে নিষ্ক্রান্ত হতেই ভাবলাম, পড়লাম এ কোন যন্ত্রণায়!
একদিকে আমার নিজেরই টিমে আছে আফিফির মতো এক ফাঁকিবাজ ত্যাঁদড়, তদপুরি জুটেছে কি না মরুতে এই দুই নরেশ পরেশ, অফিসিয়ালি আমি যাদের বস নই। ছুতানাতা বিষয় নিয়ে যতোই ঢোকে গিয়ে তারা বসের অফিসে, ততোই ফিল পাঠিয়ে দেয় তাদের আমার কাছে! জানি না বসের মনেই বা আছে কী?
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ সাহিত্যিক।












