অনুগল্প

সুজিত চৌধুরী | রবিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ at ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ

আমার সাথে ২২ বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিলো সমিরের। আমার নাম শিউলি, বেশ ভালোই চলছিলো আমাদের সংসার। যৌথ হওয়াতে পুরো পরিবার একসাথে থাকতাম। শান্ত স্বভাবের হওয়াতে সবার সাথে আমার সম্পর্ক খুব ভালোই ছিলো। আমাকে সবাই ভালোবাসতো। বিয়ের প্রায় তিন বছর অতিক্রম হওয়ার পরও যখন আমাদের সন্তান হচ্ছিল না তখন আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমাকে বিভিন্ন চাপ দিতে লাগলো। অবশেষে রিপোর্ট থেকে জানতে পারি, আমি কখনো মা হতে পারবো না। এরপর শুরু হয় শ্বশুর বাড়ির বিভিন্ন মানসিক যন্ত্রণা। তবুও নিশ্চুপ ছিলাম কারণ আমার পাশে আমার ভালোবাসার মানুষ সমির ছিলো। কিন্তু কিরকম জানি সুখ আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে লাগলো। পরিবারের চাপে সমিরও আমার থেকে দূরত্ব নিয়ে নিলো। তবুও নিজের মনকে মানাতাম যে মানুষটা মনের কষ্টে হয়তো এমন করছে। এখন দেখি সকলের লাঞ্চনা গঞ্চায় শ্বশুর বাড়িতে থাকাটা যখন অনেকটা যন্ত্রণাদায়ক হয়ে গেলো তখন ঠিক করলাম কিছুদিন বাপের বাড়িতে গিয়ে উঠবো এতে হয়তো পরিবেশ কিছুটা শান্ত হবে। যেদিন সমিরকে বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা জানালাম সেদিন তার কোনো উত্তর পেলাম না। কিন্তু আগেরকার সময়ে বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা বললে তার মুখটা কালো হয়ে যেতো, এবারে তার মধ্যে তেমন পরিবর্তন হলো না। বাপেরবাড়ি যাওয়ার পরে সপ্তাহ যায়, মাস যায়, আমার খবর কেউ নেয় না। প্রায় তিনমাস বাদে একটা কুরিয়ার এলো যাতে লেখা আছে সমিরের বিয়ের কথা আর আমাদের ডিভোর্সের পেপার। চিঠি আর ডিভোর্স পেপারটা হাতে নিয়েই আমার পুরো মাথা ভারী হয়ে গেলো। বুঝতে বাকি রইলো না পুরা বিষয়টা বহুদিন আগে থেকে পরিকল্পিত। শুধু আমি বের হওয়ার অপেক্ষায় ছিলো। যার জন্য এতো কষ্ট আর অপমান সইয়ে ছিলাম সেই যখন পাশকেটে চলে গেলো তখন নিজেকে পুরো একা মনে হলো। ভাবলাম ঐ বাড়ি গিয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করবো, প্রতিবাদ করবো কিন্তু মনে হলো যার জন্য ও বাড়িতে যাবো সেই তো আমাকে চায় না, তাই গিয়ে লাভ কি! ডিভোর্স পেপারে সাইন করে পাঠিয়ে দিলাম। ডিভোর্স পেপার পাঠানোর পর তার সাথে আর কখনো দেখা বা যোগাযোগ হয়নি কারণ আমি নিজেই সবটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

ক্ষণে ক্ষণে মনে হতো আমার মতো নিঃসন্তান, স্বামী ত্যাগী মেয়ের পৃথিবীতে না থাকা শ্রেয়, কিন্তু একটা সময় বুঝতে পারলাম নিজের জন্য না হলেও অন্যের জন্য বাঁচতে হবে। পেছনে ফেলে আসা মানুষগুলোর প্রতি কোনো অভিযোগ রইলোনা। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, অতীতকে ভুলে, কঠোর পরিশ্রমে একদিন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। স্থাপিত করলাম শিশু শিক্ষা নিকেতন। ক্রমে ক্রমে শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকলো স্কুলে।কয়েক বছরে সুনাম ছড়িয়ে পড়ল আমার আর শিশু শিক্ষা নিকেতনের। শিশুদের জন্য কিছু করতে পারাটাকে নিজের জন্য অনেক সৌভাগ্যের মনে হলো। হঠাৎ একদিন সমির এসে উপস্থিত হলো আমার সামনে। দেখে অসুস্থ আর অস্বাভাবিক মনে হলো সমিরকে।

করযোড়ে বলতে লাগলো, ক্ষমা করো আমাকে! দোষ তোমার ছিল না? দোষছিল আমার। ঐদিনের রিপোর্টটা ভুলছিল! যে রিপোর্টের জন্য তোমাকে ত্যাগ করেছিলাম সেটা ভুলছিল। আসলে আমি কোনদিন বাবা হতে পারবো না। যার প্রমাণ দ্বিতীয় বিয়ে করার পরেও আমার কোন সন্তান হয়নি। আমি নাহয় তোমার খবর নেয়নি, তুমি তো পারতে আমার খবরটা নিতে? বলতে বলতে সমিরের দু’চোখ বেয়ে ঝড়ে পরে অশ্রু। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আর মনে মনে চিন্তা করলাম, বড্ড দেরী করে এলে তুমি। একসময় নিঃসন্তান হওয়ায় আমাকে ছেড়েছিলে তুমি, আর আজ আমি অনেক সন্তানের জননী। আর তুমি নিঃসন্তান? এটাই হয়তো প্রকৃতির নিয়তি!

পূর্ববর্তী নিবন্ধভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে সচেতনতা চাই
পরবর্তী নিবন্ধঘুরে এলাম জ্যাকারান্ডার শহর সিডনি