অর্থনীতি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে

| রবিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ at ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের পূর্ণ উদ্যমে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এলডিসি উত্তরণবিষয়ক এক সভায় প্রধান উপদেষ্টা এই নির্দেশনা দেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ‘এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। এখন পূর্ণ উদ্যমে কাজ এগিয়ে নিতে হবে। সে অনুযায়ী যত ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার তা নিতে হবে, একইসঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষিতে কোনও খাত যেন কোনও ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে। পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ সুবিধা কিভাবে আদায় করা যায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।’ এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি সার্বক্ষণিক মনিটারিং করতে একটি ডেডিকেটেড টিম গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বারবার বলে আসছেন। তিনি বলেছেন, এলডিসি উত্তরণের পরে এই কাজে যেন আরও গতি পায়।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার জোরালোভাবে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ চাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছাতে সরকারের মাধ্যমে জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ জানাতে বলছে। এর কারণ বহুবিধ। সাধারণত জাতিসংঘ তিনটি মানদণ্ড বিবেচনা করে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের জন্য সুপারিশ করে থাকে। এটা করে থাকে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি)। মানদণ্ডগুলো হলোমাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দুর্বলতা। এখন প্রশ্ন হলো তিনটি মানদণ্ডে বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে? বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে এ তিন সূচকে অগ্রগতি দেখিয়েছিল। যে কারণে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি বাংলাদেশকে সুপারিশ করেছিল উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেয়ার জন্য। সে সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩৪৬ ডলারের ওপর, মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচক ছিল ৬৬ পয়েন্টের বেশি এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচক ছিল ৩২ পয়েন্টের নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে জাতিসংঘের সব শর্ত পূরণ করতে সক্ষমতা অর্জন করেছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটা নিশ্চিত যে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে বাংলাদেশকে বাণিজ্যসংক্রান্ত অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। পাশাপাশি রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে, ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট ছাড় সুবিধা হারাবে (ট্রিপস চুক্তি কার্যকর হবে)। এছাড়া স্বল্প সুদে বৈদেশিক ঋণ বন্ধ হয়ে যাবে, আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া যাবে না, উন্নত দেশে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এটাও সত্য যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হলে আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং দেশের ক্রেডিট রেটিং ভালো হবে।

অর্থনীতিবিদ মো. মাজেদুল হক তাঁর এক লেখায় প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশ এ মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে কতটুকু প্রস্তুত রয়েছে? অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয় নিয়ে কী ভাবছে? চলতি বছরের মার্চে এক বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এলডিসি উত্তরণে জাতিসংঘের দেয়া নির্ধারিত সময়সীমা পেছানো হবে না। সমপ্রতি ঢাকাভিত্তিক ১৬টি ব্যবসায়িক সংগঠন এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর জোর দাবি করেছে। ব্যবসায়িক সংগঠন বলছে, এলডিসি উত্তরণ ২০২৬ সালে হলে অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়িক সংগঠনের পাশাপাশি বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানও এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরছে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, ১৪ শতাংশ পর্যন্ত রফতানি কমে যাবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় জিএসপি সুবিধা (ইবিএএভরিথিং বাট আর্মস) বন্ধ হয়ে গেলে ১২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে রফতানি করতে হবে। এছাড়া কিছু দেশের সঙ্গে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা চলমান, তা অকার্যকর হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমার সুপারিশ হলো এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছানো যাবে না। এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ালে বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য কতটুকু প্রস্তুতি নেবে? প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এত বছর কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে? বাংলাদেশ সরকার কি জানত যে তার এলডিসি উত্তরণে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে? জানত। কিন্তু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ২০২১ সাল থেকে শক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি। প্রস্তুতির কাজ শুধু কমিটি গঠন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জিএসপি সুবিধাইবিএ বন্ধ হলে ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধার মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ৩২টি শর্ত (আন্তর্জাতিক কনভেনশন) পরিপালন করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কতটুকু অগ্রগতি করেছে? শর্তগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে