লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণ আগামী বছরের মাঝামাঝি

এই টার্মিনাল নাইট নেভিগেশন এবং বড় জাহাজ ভিড়ানোর সুযোগ থাকবে । বিদেশি অপারেটর নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ আলোচনা

হাসান আকবর | রবিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম টার্মিনাল হিসেবে লালদিয়ার চর টার্মিনাল চালু হলে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা নয়, বহু সীমাবদ্ধতারও অবসান ঘটবে। এই টার্মিনালে নাইট নেভিগেশন এবং বড় জাহাজ ভিড়ানোর সুযোগ দেশের শিপিং বাণিজ্যে ভিন্নমাত্রা যোগ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। তবে চুক্তির শর্ত এবং বন্দরের চ্যানেলের মুখে বিদেশি অপারেটর নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। পক্ষবিপক্ষের নানা আলোচনার মাঝে আগামী বছরের মাঝামাঝি লালদিয়ার চর টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হতে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি কন্টেনার টার্মিনাল রয়েছে। যেখানে জাহাজে কন্টেনার ওঠানোনামানোর মাধ্যমে পরিচালিত হয় দেশের শিপিং বাণিজ্য। চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান চারটি টার্মিনালের সক্ষমতা প্রসঙ্গে জার্মানভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিং বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের এই চারটি টার্মিনালে বছরে ৩৫ লাখ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর গত বছর ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করেছে। চলতি অর্থবছরে এই সংখ্যা ৩৪ লাখ টিইইউএস ছাড়িয়ে যাবে। আগামী বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতায় টান পড়বে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, তখন দেশের আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের জন্য লালদিয়ার চর টার্মিনালই রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা দেবে। ২০৩০ সালে লালদিয়ার চর কন্টেনার টার্মিনাল চালু হলে বছরে ৮ লাখ কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তখন চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা গিয়ে ঠেকবে ৪৩ লাখ টিইইউএসে। ওই সক্ষমতা বেশ কয়েক বছর দেশের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে বলে বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।

শুধু সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, লালদিয়া টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘদিনের অপূর্ণতায় পূর্ণতা নিয়ে আসবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এই টার্মিনালে নাইট নেভিগেশন করতে না পারার সীমাবদ্ধতা থাকবে না। রাতের বেলায়ও এই টার্মিনালে জাহাজ ভিড়ানো সম্ভব হবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে গতি আসবে।

সূত্রগুলো বলেছে, জোয়ারভাটা নির্ভর চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর গুপ্ত বাঁক। চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনালে এই বাঁক পার হয়ে জাহাজ চলাচল করতে হয়। এই বাঁকের কারণে তিনটি টার্মিনালের জেটিতে বড় জাহাজ ভিড়ানো সম্ভব হয় না। একইসাথে এই বাঁক নাইট নেভিগেশনের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে রয়েছে। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮শ টিইইউএস কন্টেনার নিয়ে জাহাজ আসাযাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। অধিকাংশ জাহাজ এর থেকে কম কন্টেনার নিয়ে চলাচল করে।

কিন্তু লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মিত হলে এই বাঁকের ব্যাপারটি থাকছে না। এই বাঁকে না এসেও লালদিয়া টার্মিনালে রাতেদিনে জাহাজ ভিড়তে বা নোঙর তুলতে পারবে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হবে বড় জাহাজ ভিড়ানো। লালদিয়া টার্মিনালে ৬ হাজার কন্টেনার বোঝাই বেশি ড্রাফটের বড় জাহাজ ভিড়ানো যাবে। অর্থাৎ বর্তমানে বন্দরে দুটি জাহাজ যে কন্টেনার আনানেওয়া করে লালদিয়ায় একটি জাহাজ তার চেয়ে বেশি কন্টেনার পরিবহন করতে পারবে। বড় জাহাজ থেকে বন্দরের জেটিতে কন্টেনার খালাসের যে সীমাবদ্ধতা তা থেকেও চট্টগ্রাম বন্দর কিছুটা রক্ষা পাবে মন্তব্য করে বন্দর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, লালদিয়া টার্মিনাল কন্টেনার নিয়ে সরাসরি ইউরোপআমেরিকায় জাহাজ চলাচল করার একটি দ্বার উন্মোচিত হবে। ফিডার ভ্যাসেলে সিঙ্গাপুর, কলম্বো বা মালয়েশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টে নিয়ে মাদার ভ্যাসেল ধরার প্রয়োজন পড়বে না। এতে দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আসবে।

উল্লেখ্য, লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের মায়ের্সক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এই টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের কোম্পানিটির সঙ্গে ৩৩ বছরের জন্য কনসেশন চুক্তি হয়েছে। শর্ত পূরণ করা হলে আরো ১৫ বছর পরিচালনার সুযোগ পাবে এপিএম টার্মিনালস। প্রকল্পটির কিউএনএস কন্টেনার সার্ভিসেস স্থানীয় অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এই চুক্তির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে স্কপ ও বন্দর রক্ষা পরিষদসহ অনেকগুলো সংগঠন। বিভিন্ন ব্যক্তির পক্ষ থেকেও বন্দর ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে দেশকে ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তারা বলেছেন, চুক্তিতে কি আছে তা জনগণ জানে না। চুক্তির শর্তগুলো গোপন রাখা হয়েছে। মোহনার এত কাছে বন্দর চ্যানেলে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ পুরো বন্দরকে অনিশ্চয়তায় ফেলছে। শুধু লালদিয়া নয়, চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো অংশই বিদেশিদের হাতে দিলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সী কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিরুল হক বলেছেন, বিদেশি অপারেটরের সাথে বিদেশি প্রযুক্তি আসবে। আমাদের বন্দর বিশ্বমানের হবে। এতে দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের লাভ হবে। দুটি আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর নিয়োগ চট্টগ্রাম বন্দরের বিশ্বমানের যাত্রা। তবে বন্দরের মাশুল নিয়ে তিনি বলেন, যেভাবে মাশুল বাড়ানো হয়েছে সেভাবে না করে ধীরে ধীরে বাড়ালে দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ত না।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ জাফর আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে শুধু বন্দরের নয়, দেশেরই উন্নতি হবে। বিদেশি অপারেটরদের ছোট একটি কাজ দেওয়া হচ্ছে। বন্দরের মূল ব্যবস্থাপনাসহ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব ক্ষমতা চট্টগ্রাম বন্দর তথা সরকারের হাতে থাকছে। বিদেশি অপারেটর নিয়োগের ব্যাপারে অহেতুক ভীতি ছড়ানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার মজুমদার বলেন, বন্দর বিদেশিদের হাতে দিলে আমাদের দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিদেশি অপারেটর নিয়োগের এই তোড়জোড়ে আমরা সবাই শঙ্কিত, ক্ষুদ্ধ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসড়কবাতির সঙ্গে সিসিটিভিও থাকবে
পরবর্তী নিবন্ধখালেদার দ্রুত আরোগ্য কামনায় দোয়া ও মোনাজাত