‘সাগর মেঘলা গিরি কুন্তলা’ আমাদের চট্টগ্রামের ইতিহাস আর ঐতিহ্য প্রাচীন কাল থেকেই অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যপূর্ণ আর প্রাণ প্রাচূর্যে ভরা। যুগে যুগে কালে কালে চট্টগ্রাম বিভিন্ন শাসকের অধীনে ছিল। ইতিহাসের দূর অতীতের পাতা খুললেই এই নগরের গোড়াপত্তনের কাহিনি শুনে চমকে যেতে হয়। ১৭৭৬ সালের মানচিত্রে চট্টগ্রাম নামের কোন উল্লেখ ছিল না। এর আগে ১৬৬৬ সালে মুগল সুবেদার এই অঞ্চলের নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। স্থানীয়রা এর নাম দেন চাটিগাঁও। এই নিয়ে কিংবদন্তী ও প্রচলিত। পাহাড় আর বন জঙ্গল–এ ভরা ছিল বিধায় এখানে নাকি জ্বীন পরীদের আস্তানা ছিল। ইসলাম প্রচারের জন্য পীর দরবেশ আউলিয়ারা আসলে জ্বীনরা শংকিত হয়। দরবেশরা তাদের কাছে একটি চাটি বা চেরাগ বাতি জ্বালানোর অনুমতি চায়। অনুমতি পেয়ে বর্তমান চেরাগী পাহাড়ে একটি চেরাগ বা চাটি জ্বালিয়ে দিলে জ্বীনরা চেরাগের আলো দেখে পালিয়ে যায়। এই কাহিনির কারণেই এই এলাকার নাম চেরাগী পাহাড়। চাটিগাঁও এর সংস্কৃত উচ্চারণ চট্টগ্রাম। ব্রিটিশরা এই নামটিই গ্রহণ করে। অনেকে চাটগাঁও বলেন। আর চট্টগ্রামের সাধুরূপ হলো চট্টলা। কালক্রমে পাল বংশের উত্থান হলে এখানে আরব পর্যটকরা এসে চট্টগ্রাম বন্দরকে সমন্দর নামে চিহ্নিত করেন। পাল বংশের পর হিন্দু দেবরাজ বংশ হয়ে চতুর্দশ শতকে চট্টগ্রাম মোগলদের হাতে এসে মুসলমান শাসকদের অধীনে আসে। ইতিপূর্বে দশম ও একাদশ শতকে আরাকানের চন্দ্র বংশীয় রাজা ‘সু না তাইং আরাকান থেকে চট্টগ্রাম না এসে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে গিয়ে একটি স্তম্ভ নির্মাণ করে সেখানে শিলালিপি তে লিখেন ‘চেত ত গোং‘ এর অর্থ হলো যুদ্ধ বন্ধ করা। আরাকানী পুঁথিতেও এই নামের উল্লেখ রয়েছে। ধারণা করা হয়, ‘চেত তো গোং’ থেকেই চাটিগ্রাম, চট্টলা এবং চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। মূলত; তখন চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই ছিল। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ এ এর প্রমাণ মেলে। তবে তিব্বতীয় এক পুঁথিতে এখানে পণ্ডিত বিহার নামে একটি বিহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেটি নিয়ে বর্তমানে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গবেষণাও চলছে। ১৩ ৪৬ শতকে বিশ্ব পরিব্রাজক ‘ইবনে বতুতা’র লেখনীতে চট্টগ্রাম বন্দরের উল্লেখ রয়েছে। তিনি মহা সমূদ্রের তীরে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘সোদ কাওয়াত’ নামে উল্লেখ করেন।আরো পরে ১৫/ ১৬ শতকে হুসেন শাহী আমলে বাণিজ্য করতে পর্তুগীজরা চট্টগ্রামে আসে। তবে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল জলদস্যুতা আর লুটপাট করা। হুশেন শাহ এদের কঠোর হস্তে দমন করছিলেন। কিন্তু আফগান শাসক শের শাহ বাংলা আক্রমণ করতে চাইলে হুশেন শাহ পর্তুগিজদের সহায়তা কামনা করেন। বিনিময়ে বন্দরে তাদেরকে একটি কুঠি স্থাপনের অনুমতি দেন। কিন্তু সেটি সফল হয়নি। শের শাহ বাংলা দখলে নিলে পর্তুগিজরা পালিয়ে যায়। এর পর আফগানী শাসন হয়ে মোগল শাসনের শেষ সম্রাট নবাব সিরাজুদদৌলাকে পলাশীর প্রান্তরে পরাজিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী রাজত্ব দখলে নেয়। বাংলায় তখন নেমে আসে এক ঘোর অমানিশা। এই ব্রিটিশ বেনিয়াদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাঙালি একদা দ্রোহে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সেই দ্রোহ আর ক্ষোভের ফলেই সিপাহী বিপ্লব, স্বদেশী আন্দোলন, ইংরেজ দের বিতাড়ন, বঙ্গ ভঙ্গ, ভাষা আন্দোলন এবং সর্বশেষ মহান মুক্তিযুদ্বের মাধ্যমে আমরা আজকের এই চট্টগ্রামে বাস করছি। এই চট্টগ্রাম প্রীতিলতার চট্টগ্রাম, এই চট্টগ্রাম আলাউলের চট্টগ্রাম, হেমচন্দ্র নবীন চন্দ্রের চট্টগ্রাম। চাকমা রাজকন্যার কানের ফুল হারিয়ে যাওয়া নদী কর্ণফুলীর চট্টগ্রাম। যে নদীতে কেবল সাম্পান চলতো সেই, সাম্পান কেবল চট্টগ্রামেরই ঐতিহ্য। কর্ণফুলী আর সাম্পান নিয়ে সাহিত্য আর গান চট্টগ্রামের সংস্কৃতির একটি অংশ। এছাড়া ও ভাষা, পোশাক আশাক, আতিথেয়তা আর রান্না বান্নায় রয়েছে চট্টগ্রামের একেবারেই নিজস্ব কিছু রীতি। এক সময়ে বিয়ে শাদীতে পাল্কী আর চদুলের প্রচলন ছিল। গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়িরও ব্যবহার ছিল। পাল্কী কিংবা অন্য বাহন যেমন রিক্সা, টেক্সীতে পর্দা দিয়ে ঢাকতে দেখেছি প্রায় ৫০ বছর আগে। বিয়ে শাদী ছাড়াও কান ছেদানী ছেলেদের খৎনাতে ও চাটগাইয়ারা অনুষ্ঠান করে আনন্দে মেতে উঠতো। গ্রামে মাটির ঘরের নান্দনিকতায় মুগ্ধতার রেশ ছিল। এখন প্রায় বিলুপ্ত।
ঘরে ঘরে ঢেঁকি ছিল। আর বিজলি বাতি আসায় হ্যারিকেন, চেরাগ আর কুপি বাতি হারিয়েই গেলো। এসব সরঞ্জাম এখন এনটকে পরিণত। সাজ সজ্জায় ও ছিল ব্যতিক্রম। প্রায় ঘরেই সুরমাদানি থাকতো। মহিলারা চোখে সুরমা দিতেন। আর কাঁঠাল পাতায় তেল লাগিয়ে তা কুপির তেলে পুরিয়ে কাজল বানিয়ে চোখে লাগাতেন, কপালে টিপ দিতেন। নাকে বেশর আর লুলুরি দিতেন। কানে অনেকগুলো ফুটো, করে দুল পরতেন। আর খাবার দাবারে দুরুছ, দোমাছা, লাউ পাতায় নোনা ইলিশ, তাল পিঠা মধুভাত কেবল চট্টগ্রামেরই স্পেশাল খাবার। অন্যদিকে মহেশখালীর মিষ্টি পান, হাটহাজারীর লাল মরিচ, চন্দনাইশের পেয়ারা, ডাবুয়ার ফুতা বেগুন, মাইজভাণ্ডার এর ভাণ্ডারী মুলা, চকরিয়া/ পেকুয়ার মহিষের দই, গনি বেকারির বেলা বিস্কুট এখনো চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে অত্যন্ত জৌলুসের সাথে বহন করে চলেছে। আর চিটাগাং এর আঞ্চলিক গানের রাজা রানি শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব আর শেফালী ঘোষের খ্যাতি তো বিশ্বজোড়া। অনেক, হিট গান রয়েছে এই জুটির। ‘যদি সুন্দর এক খান মুখ ফাইতাম, মহেশখালীর ফানের খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম। এছাড়া মালকা বানু মনু মিয়ার কাহিনি, আলাওলের দিঘি, চাকমা রানি. কালিন্দীর রাজবাড়ি, চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যেরই অংশ। বার আউলিয়ার এই পুণ্য ভূমিতে রয়েছে অনেক মাজার। বদর শাহ, শাহ আমানত, বায়েজীদ বোস্তামীর মাজারসহ অনেক মাজার আছে। বায়েজীদ বোস্তামীর গজারি মজারি দেখতে এখনো মানুষ ভীড় করে। আর মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ তো এক বিশাল এলাকাজুড়ে ভাণ্ডারী তরিকা নিয়েই বিস্তৃত। অন্যদিকে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়, বোয়ালখালীর মেধস মুনীর আশ্রম, বু–আলী কালান্দর শাহ এর মাজার, চট্টেশ্বরী কালী মন্দির এবং বৌদ্ধ মন্দির, রাঙামাটির স্বর্ণ মন্দির, রামুর সীমা বৌদ্ধ বিহার, কুতুবদিয়ার বাতিঘর, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, কাপ্তাই তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মৃতিবিজড়িত ‘ওয়ার সিমেটি’, ফয়’স লেক চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভ্রমণ, স্পট, ইতিহাস, আর ঐতিহ্যের সাথে জড়িত ওতোপ্রোতভাবে। হালদা নদীর মাছের পোনার প্রজনন ক্ষেত্র, জব্বারের বলী খেলা, লালদিঘি, ময়দান, কোর্ট বিল্ডিং, বাটালী হিল, ডিসি হিল, সি আর বির শিরীষতলা, চট্টগ্রাম বন্দর, কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত, আর পতেংগার কর্ণফুলির মোহনা চট্টগ্রামের ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে এখনো ধারণ করে রেখেছে। আসলে এই বিষয়টির বিস্তৃতি ব্যাপক। আমি অতি সংক্ষিপ্তভাবে আমাদের চট্টগ্রামের ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। এখানে প্রতিটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক।











