শিক্ষার মানোন্নয়নে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি

শাহেদ আলী টিটু | রবিবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৫ at ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন করা। এখন আামাদের সমাজে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পড়াশোনার মান যাচাই করা হয়। এ কারণে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন নয় পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের জন্য প্রতিযোগিতা করে। শ্রেণিকক্ষের চেয়ে কোচিং নির্ভর পড়ালেখায় বেশী মনোযোগী হয়। অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা যায় তারা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সময় দেয় না। কোচিং এ তারা ছাত্রছাত্রীদেরকে বেশি সময় দেয়। আগে কোচিং সেন্টার ছিল শহরভিত্তিক এখন গ্রামেগঞ্জে কোচিং সেন্টার প্রসারিত হয়েছে। কোচিং সেন্টারে পূর্ববর্তী বছরগুলোর প্রশ্ন পত্রের ভিত্তিতে কিছু সম্ভাব্য প্রশ্ন তৈরি করা হয়। কিছু শিক্ষার্থী সেই সব নির্ধারিত প্রশ্ন পড়ে ভাল ফলাফল করলেও শিক্ষার্থীদের পুরো বই সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা তৈরি হয় না। এতে শিক্ষার্থীদের সঠিক মান যাচাই করা যায় না। প্রতিটি দেশে শিক্ষা নিয়ে গবেষণা থাকেএকটি মূল্যায়ন থাকে। যার উদ্দেশ্য হলো একজন শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যতে তাকে একজন দক্ষ জনশক্তি রূপে গড়ে তোলা। আমাদের দেশে দক্ষ জনশক্তির বড় অভাব। আমরা যদি স্কুল পর্যায়ে সফট স্কিল এবং হার্ড স্কিল এর দিকে নজর দিতে পারি তাহলে আমাদের একটা দক্ষ প্রজন্ম তৈরি হবে। আমাদের দেশের শ্রমিকদের নিম্ন বেতনে অপেক্ষাকৃত অধিক শ্রমগণ কাজ করতে হয়। বিদেশে গিয়ে তারা যদি প্রযুক্তি নির্ভর কাজে দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারে তাহলে তারা অধিক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। বিদ্যালয়গুলোতেও ভাল শিক্ষকের অভাব রয়েছে। আবার একজন ভাল ছাত্র পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে চায়না। কারণ বর্তমানে জীবনযাত্রার মানের সাথে একজন শিক্ষকের মাসিক বেতন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মানসম্মত শিক্ষা পেতে হলে অবশ্যই মানসম্পন্ন শিক্ষক প্রয়োজন। আর এই মানসম্পন্ন শিক্ষক তখনই মিলবে যখন তার বেতনটাও মানসম্মত হবে। এখানে শিক্ষকদেরও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে হবে। কি কারণে বৈশ্বিক মান বিবেচনায় আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মান কমে যাচ্ছে তার জন্য অবশ্যই গবেষণার প্রয়োজন আছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার পতনের পর দেশের সর্বত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে কলেজের অধ্যক্ষকে পর্যন্ত স্বৈরাচারের দোসর ট্যাগ দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করানো হয়। একসময় শিক্ষার্থীরা দাবী আদায়ের জন্য ক্লাস পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালন করতো। কিন্তু ৫ই আগস্ট পরবর্তীতে তারা সড়কমহাসড়ক অবরোধ করে দাবি আদায় করে। এই সব অবরোধের সময় চরম ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ জনগণ। এমনকি সচিবালয়ের মত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে বাদ পড়েনি।

বলা জরুরি যে, সর্বশেষ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মান নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটেল ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ একাদশ শ্রেণিতে যা শিখেছে তা আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণির দক্ষতার সমান। এই ইনডেক্সে বাংলাদেশের সর্বশেষ ২০২০ সালের তথ্য উঠে এসেছে। হিউম্যান ক্যাপিটেল ইনডেক্স এর আগের সংস্করণের তথ্যের সাথে তুলনা করে দেখা গেছে দিন দিন বাংলাদেশের শিক্ষার মান অবনমন ঘটেছে। ইনডেক্সের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী ঐ সময়ে একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে যে দক্ষতা অর্জন করত, তা ছিল আন্তর্জাতিকমানে সপ্তম শ্রেণির দক্ষতার সমান। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষামানের আরও অবনমন ঘটেছে। অটোপাস, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের কারণে শিক্ষার এই অবনমন ঘটে। ব্রিটিশ কারিকুলামের সঙ্গে বাংলা কারিকুলামের শিক্ষার বড় ধরনের পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। ‘ও’ লেবেল ‘এ’ লেবেল এর সঙ্গে বাংলা মিডিয়ামের এসএসসি ও এইচএসসির ব্যাপক ব্যবধান। এর ফলে বাংলা মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা মেধা ও যোগ্যতার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে। যে কারণে বাংলা মিডিয়ামের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ব্রিটিশ কারিকুলামের দিকে ঝুঁকে পড়ছে অভিভাবকরা।

করোনা ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাবের ফলে ২০২০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অটোপাস দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। আর ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সর্বশেষ জুলাই আগস্ট আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এইচএসসির যেসব পরীক্ষা স্থগিত হয়েছিল সেসব বিষয়ে অটোপাস দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা সচিবালয় ঘেরাও করে। পরে সচিবালয়ের গেট ভেঙে তারা দাবি আদায়ের জন্য সচিবালয়ে অবস্থান করে। এক প্রকার শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে তাদেরকে অটোপাস দিতে বাধ্য হয় সরকার।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৮০.৩৯ এবং ৮৩.৭৭ শতাংশ। গত ৪ বছরের মধ্যে এ বছরই প্রথম এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পূর্ণ সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হয় এবং পাসের হার ছিল ৬৮.৪৫ শতাংশ।

ফলাফল পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছেনগত ১৬ বছরে যে সরকার ছিল তারা সরকারের সাফল্য দেখানোর জন্য জিপিএ৫ এর সংখ্যা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ফলাফল প্রকাশ করতো। কিন্তু এবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য না থাকায় পাসের হারে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডসহ মাদ্রাসা ও কারিগরী শিক্ষাবোর্ড মিলে এবার অকৃতকার্য শিক্ষার্থী ৬ লাখের বেশী। এই যে জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় পাস করতে পারলো না এর দায়ভার শুধু শিক্ষার্থীদের নয়। অভিভাবক এবং শিক্ষকদের উপরও এর দায় বর্তায়। করোনাকালীন শ্রেণি কক্ষে দুবছর পাঠদান হতে পারেনি এটা সত্য। কিন্তু এর আগে বা পরে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শিক্ষার মানোন্নয়নে সর্বস্তরে মেধাবী শিক্ষকদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মেধাবীরা তখনই এই পেশায় আসতে আগ্রহী হবে যখন সম্মানজনক বেতনভাতা নিশ্চিত হবে। অকৃতকার্য প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে অনেকের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে বেশীর ভাগেরই শিক্ষাজীবনের এখানেই ইতি ঘটবে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে যেসব শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়েছে তারা মূলত নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত। উচ্চবিত্তরা ঠিকই তাদের সন্তানদের ব্যয় বহুল বিদ্যালয়ে পড়িয়ে মানোন্নয়ন বা দক্ষতা নিশ্চিত করতে পারে। আমাদের মূলত নজর দিতে হবে যেসব শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়েছে তাদের দিকে। বলা হয়ে থাকে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। তাই জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করতে হলে দরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার ভিত মজবুত করা। শিক্ষা শুধু সুযোগ নয় অধিকার। শিক্ষার মানোন্নয়নে যথাযথ ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে পারে আমাদের শিক্ষা। আর শিক্ষার গুণগত মান উন্নীত হলেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত হবে।

লেখক : নাট্যকার ও উপসচিব, সিসিসিআই

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ