বাংলার লোকায়ত জীবন ও ভাববাদী চেতনায় যে ক‘জন পুরোধা পুরুষ এ বিশাল লোক সংস্কৃতি ও ভাববাদী চিন্তা চেতনা বিশ্বে তুলে ধরেছেন তাঁদের মধ্যে আবদুল গফুর হালীর নাম সম্মানজনক একটি অবস্থানে উঠে আসে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রশিদাবাদ গ্রামের বাবা আবদুস্ সোবহান ও মা গোল্লল্ডাজ খাতুনের ঘরে ১৯২৮ সালের ৬ আগস্ট জন্ম আবদুল গফুরের। স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে পড়া শেষে জোয়ারা বিশ্বম্ভব চৗধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার সময় সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যুদ্ধ পরবর্তী ‘৪৩ এর মন্বন্তরের কারণে আর সামনে এগুনো সম্ভব হয়নি। এ দুর্বিষহ সময়েই গফুরের দাদা সলিমুদ্দিন চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যসব লোকের মত ভাগ্যান্বেষণে বৃটিশ ভারতের ধনী অঞ্চল বার্মায় চলে যান ঘরে রেখে রূপসী দাদীকে। স্কুল ত্যাগী গফুরের তখন অঢেল সময়। কিশোর মন। সব কিছু খুঁটিয়ে দেখার বয়স। এদিকে দিন যায় মাস যায় বছর পেরিয়ে বছর। গফুরের দাদা আর আসেনা ফিরে। গফুর দেখে দাদীর বিরহী উচাটন কাতর মনের যন্ত্রণা। তাকে ভাবিয়ে তোলে। অঢেল অবসরে পাশের গ্রাম সুচক্রদন্ডীর বিখ্যাত আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের পুঁথি, শোভনদন্ডীর আসকর আলী পন্ডিত ও খাইরুজ্জামান মাষ্টারের ভাবের গান তার মনকে নাড়া দেয়। তদুপরি সে সময়ে তুঙ্গে থাকা অল্পদূরের গোমদন্ডি গ্রামের কবিয়াল রমেশ শীলের ভাবের গান, আঞ্চলিক গান তার মধ্যে ভাব সৃষ্টিতে কার্যকর ছিলনা তা বলা দুষ্কর। দাদার শোকে ব্যাকুল দাদীর বিরহী দশা তার ভাবের জগৎ কে উঁচিয়ে দেয়। চোখের সামনে বার বার ফুটে উঠে দাদার কথা।
‘রেঙ্গুনের বার্মার‘ মাইয়ার রূপে মুগ্ধ দাদা আর ফিরে না। এদিকে দাদীর বিরহ কাতরতা গফুরকে কাব্যময়তায় ভরে দেয়। অন্যদিকে গ্রামের সাথীদের সাথে শহরে গিয়ে সিনেমা দেখার বাতিকও তাকে পেয়ে বসে। অল্প পয়সায় ‘বেঙ্গুরা‘ স্টেশন থেকে রেলে শহরে গিয়ে ‘রঙ্গম সিমেনা’ অথবা ‘লায়নে’ সিনেমা দেখা আর সিনেমার গানের বই কিনে সাথীদের সাথে গলা ছেড়ে গান গাওয়া। এ অবস্থায় এক দিন গ্রামের যাত্রাপালা মঞ্চে বন্ধুরা তাকে ঠেলে তুলে দিলে গফুরের গান সবাইকে আনন্দ দেয়। গফুর রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কিন্তু গফুরের পিতার গানে ঘোর আপত্তি। তাই ছেলেকে গান থেকে ফেরানোর জন্য ২২/২৩ বছর বয়সে তার বিয়ে দিয়ে দেন। গফুরও চেষ্টা করে পিতার আদেশ ও নববধূর আবেশে ঘরমুখো হতে, পিতার ব্যবসায় হাত লাগায় গফুর। কিন্তু যার মনে ভাব, গলায় গান, প্রাণে আবেগ, ঘরের টানকি তাকে বাধতে পারে। তাকে ভাবের জগৎ প্রাণের জগৎ গানের জগৎ মাইজভান্ডার টানে। একদিন ওরশের খবর পেয়ে হাজারো লোকের মিছিলে নিজেকে শামিল করে চলে যায়। দেখে মসজিদে শত শত লোক নামাজরত, মাজারে মাজারে জিয়ারত করছে শত শত মানুষ, ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঢোলের তালে জিকির করছে হাজারো মানুষ। কোন ক্যাম্পে ভাবের গান মাইজভান্ডারী গান নিয়ে মশগুল অনেকে। ভক্তজন ভাবের আবেশে গায়কের সাথে মুদিত চোখে তালে তালে দুলছে আর আল্লাহু আল্লাহু বলে মধ্যে মধ্যে চিৎকার করে উঠছে। গফুর কখন তাদের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছে নিজেও জানেনা। একদিন ভক্তদের অনুরোধে গফুরকেও গান ধরতে হয়। চোখ বন্ধ করতেই গফুরের মধ্যে এক অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হয়। অনেকক্ষণ গান করার পর চোখ খুললে দেখে হারমোনিয়ামের উপর অনেক টাকা। গফুরের সেই প্রথম উপার্জন জিয়ারতে দিয়ে দেয়। বুঝে গান গেয়েও টাকা কামানো যায়। আর লক্ষ্য করে মাইজভান্ডারে আল্লাহ ও নবীর সঠিক বাণী পালিত হয়। মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। জাতি ধর্ম বর্ণের কোন ভেদাভেদ নেই। সবাই সমান। সবাই সে অলির উসিলায় আল্লাহ/স্রষ্টাকে পাবার জন্য ব্যাকুল। গফুরও মুগ্ধ চিত্তে বায়াত গ্রহণ করে পীরে তরিকত হযরত সৈয়দ শফিউল বশর মাইজভাণ্ডারির হাতে, যিনি তার ভিতরের মানুষের মধ্যে জজব হাল দেখে আদর করে ‘হালী‘ বলে ডাকেন। আর সেই থেকে গফুর, আবদুল গফুর হালী। মাইজভাণ্ডারের গান গেয়ে তার মধ্যে যে বোধোদয় হয় তাই পরবর্তী জীবনে চালিকা শক্তি রূপে কাজ করে গফুর নিজেই বলেন ‘মনে হল আমার উপর এক অদৃশ্য শক্তি ভর করেছে। মাইজভাণ্ডারের প্রেম সাগরে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। তখন থেকে বাড়ি ফেরার পর আমাকে কে যেন বলছেন ‘লেখ‘ ‘লেখ’। আমি লিখতে বসলাম’। নিজের ভাষায় তিনি ‘গাইতে গাইতে গায়েন’ আর এখন গানের লেখক। শুরু হলো তাঁর গান লিখা। বয়স ২৪–২৫। সময় ১৯৫৪–৫৫।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার প্রভাব: তাঁর সমস্ত ভাব ভাবনা কল্পনায় দাদা বিহীন দাদীর উচাটন মন লেখার বিষয় হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে–গফুরের কল্পনায় আসে দাদাত লাল পাঞ্জাবী পড়তো মাথার চুলে সিঁথি কাটতো, গায়ের রঙ কালো হলেও কেমন তেলতেলে মসৃণ ছিল, বড় ভালো লাগতো দাদীর– তাই লেখেন– “রসিক তেল কাজলা ঐ লাল কোত্তা ওয়ালা / দিল বড় জালারে পাঞ্জাবী ওয়ালা।” কতজনইতো বিদেশ যায়। সবাইতো ঘরে ফিরে আসে কিন্তু গফুরের দাদার সবই স্বতন্তর। দিন যায় বছর যায় বিরহ জ্বালায় গুমরে মরে দাদী রাতে ঘুম আসেনা, বিছানায় ছটফট করে। ‘আঁরে ফেলাই ঘরর মানুষ গেইয়ে বিদেশত / নিত্যি পত্তি উডেল্লে তার কথা মনত।’ এদিকে দাদীর মনের বাগানে অহোরাত্র থরে থরে ফুল সাজিয়ে গোপনে লালন করে, যদি দাদা আসে– ‘মনের বাগানে ফুটিল ফুলরে / রসিক ভ্রমর আইলনা, ফুলের মধু খাইলনা।’
শিল্পী গফুর: ইতিমধ্যে শিল্পী হিসেবে গফুরের নাম গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়লেও শহরে তেমন। পরিচিতি নেই। নিউ মার্কেটের ছোট্ট দোকানে আঞ্চলিক গানের শিল্পী শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবের কাছে রেডিওতে অডিশনের কথা শুনে গফুর হাজির হন তার লেখা প্রথম গান ‘আর কত দিন খেলবি খেলা। মরণ কি তোর হবে না।’ গফুর অডিশনে প্রথম হয়। গান গেয়ে গ্রামে পৌঁছার আগে তখনকার রীতি হিসাবে গানটি প্রচারিত হয়ে গেলে গফুর রাতারাতি শিল্পী বনে যান। ওদিকে ‘৬৩ সাল থেকে তাঁর গান রেডিওতে সমপ্রচারিত হওয়া শুরু করলেও তালিকাভুক্ত নন বলে তা সংগৃহীত হিসেবেই প্রচারিত হতো। বিপরীতে ১৯৭২ সালে তিনি গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হলে এতদিনের সংগৃহীত হিসেবে প্রচারিত সব গান তাঁর লেখা হওয়ায় তাঁর অবস্থান এবং জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে যায়। যেহেতু গফুর আস্কর আলী পন্ডিত ও খাইরুজ্জামান মাস্টারের ভার শিষ্য তাই তাঁর লেখায় তাঁদের সরাসরি প্রভাব প্রকট। তাই তাঁদের মতো তাঁর লেখায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ভীষণ ভাবে কাজ করেছে। তাঁর আঞ্চলিক গানের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। সত্তুরের দশকে মলয় ঘোষ দস্তিদারের লেখা গান দিয়ে শ্যাম, শেফালী পরিচিতি প্রাপ্ত হলেও গফুর হালীর গান তাদেরকে আঞ্চলিক গানের সম্রাট সম্রাজ্ঞী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, শুধু দেশ নয় বহির্বিশ্বেও তাদের পরিচিতি ঘটে এবং চট্টগ্রামের আইকন শিল্পী হিসেবে তারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়েন। এখানে আমরা গফুরের সেইসব কিছু গানের প্রথম কলি উদ্ধৃত করলাম– ‘সোনাবন্ধু তুই আমারে করলি দেওয়ানা মনেত মানেনা, দিলেত বুঝেনা।’ বা– ‘বাইন দুয়ারদি না আইস্য তুই নিশির কালে/ মা বাপরে লাগাই দিব মাইনষে দেখিলে।’ বা– “বন্ধু আর দুয়ারদি যঅ আর লয় কথা কেয়া ন কজ।” বা– “শঙ্খ খালর মাঝি আই তোয়ার লগে রাজি।”.
শ্যাম, শেফালী, কল্যাণী ঘোষ, বেবী নাজনীনের কণ্ঠে সমস্ত গান অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। তাছাড়াও এ ধরনের অসংখ্য জনপ্রিয় গান নামী দামী শিল্পীদের কণ্ঠে তুলে দিয়ে তাঁদেরকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন নিজেও ঋদ্য হয়েছেন। তাঁর গানে পুরুষের না পাওয়ার ব্যথার বিশেষ কোন উপস্থিতি পরিস্ফুটিত হয়না, চোখে পড়ে নারীর বিরহ দশা, কামনা বাসনা প্রেম ভালবাসার ছাপচিত্র। মূলত গফুরের মনে দাদীর যাতনার ছবি অহরহ থিতু হয়ে থাকায় তার লেখায় বিভিন্ন ভাবে নারীর যাতনা, প্রেম সোহাগ, প্রেম নিবেদনের ছাপ ফুটে উঠেছে।
গফুরের মাইজভাণ্ডারী গান : মাইজভাণ্ডারে যাওয়ার পর তাঁর যে বোধোদয় হয় এবং বায়াত গ্রহণের পরে তাঁর মধ্যে যে আত্মজিজ্ঞাসা, ভাববাদী চেতনা, ইসলামের মূল সুর তা অত্যন্ত জাজ্যল্যমান রূপে ফুটে উঠে তাঁর লেখা মাইজভাণ্ডারী গানে। মূলত মাইজভাণ্ডারী গানের আদি গীতিকারদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দ আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরি, সৈয়দ আবদুল গনি কাঞ্চনপুরি (লেখক হিসেবে দ্বিতীয়) এবং সৈয়দ আবদুস সালাম ভুজপুরী ভ্রাতৃত্রয়, বজলুল করিম মন্দাকিনী, আবদুল্লাহ বাঞ্চারামপুরী ও কবিয়াল রমেশ শীল। সাধারণত তাঁদের গানগুলো দিয়েই মাইজভাণ্ডারে সেমা জিকির মাহফিল হতো। গফুর তাঁদের গান শুনেই শুনেই ভাব বিভোর তন্ময় হয়েছিলেন। সে সমস্ত গানের অনুপ্রেরণা তেই তাঁর মাইজভাণ্ডারী গানের সোপান গড়ে তোলে।
মাইজভাণ্ডারী দর্শনের সপ্তকর্ম পদ্ধতির মূল ভাব অহংকে বিসর্জন দেয়া। অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী, মিষ্টি ভাষী, স্রষ্টা ও সৃষ্টিতে বিশ্বাসী, নবী প্রেমী, ত্যাগী, অল্পে তুষ্ট, অল্পহারী, ব্যক্তি ছিলেন গফুর তাই তার এ দর্শন মাইজভাণ্ডারী গানে মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে-“আমার নবীর পবিত্র নাম, আল্লাহ নামের পাশে / আদম আলাহিস্সালাম দেখেছেন আরশে।” “সৃষ্টির সেরা নূর মোহাম্মদ সৃষ্ট আল্লাহর নূরে / রাত্রদিন ফেরেস্তারা নামের জিকির করে।“
ইসলামে সৃষ্টির মূলের এ বানী অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে ধরা দিয়েছে তাঁর লেখায়, স্রষ্টা প্রেমী নবী প্রেমী প্রত্যয় দৃঢ় বিশাসে। অহংকে ত্যাগ করে স্রষ্টাকে খুঁজতে হয়। ইসলামের মূল এ বাণীই মাইজভান্ডারী দর্শনে বিম্বিত। তা হলেই সে অন্তরে স্রষ্টা বিরাজ করেন। মানুষতো তাঁরই যোগ্যতম প্রতিনিধি। এ দশায় উপনীত হতে পেরেই গফুরের মনে প্রশ্ন জাগে– ‘আমায় যদি না বানাইতা। খোদা তোমায় কে ডাকিত মসজিদে নামাজ পড়িত/ কে মন্দিরে পূজা দিত?
আমাকে বানিয়ে তুমি তোমার প্রতিনিধি করেছ বলেই আমি আমাতে থাকতে রাজী নই। সবইত তোমার। তোমাকে পাবার জন্যইত এতসব আয়োজন, ঘোরাঘুরি। আমার আমিত আর নই। তাই গফুর বলেন–
‘আমি আমারে বেইচ্যা দিছি মাইজভাণ্ডারে যাইরে / আমার কিছু নাইরে আমার কিছু নাই।
গফুরের মনে হয় সংসার ধর্ম করাই ভুল। যদি সংসারের পিছুটান না থাকত তা হলে– “আমি যদি ফকির হইতাম না থাকিত ঘর বাড়ি / রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিতাম গাউসুল আযম নাম ধরি।” সেই নামের গুণেই আমি স্রষ্টা পথের সঠিক যাত্রী হতে পারতাম। অন্ধনয়ন আলোকে ভরে যেত দেখতাম অন্তর মাঝে স্রষ্টাকে। কিন্তু গফুরের কোন বাধা বা ভয় নেই। স্রষ্টা প্রাপ্তির সঠিক পথের কান্ডারীকে তিনি পেয়েছেন।
লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক।