বাংলা সাহিত্যে ঘুম : এক নান্দনিক অনুষঙ্গ

কুমুদিনী কলি | শনিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৫ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ

সেই কবে মা কোলে নিয়ে গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন আমাদের ‘ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি, মোদের বাড়ি এসো’! ব্যস, আমাদের চোখে নেমে আসতো সাত রাজ্যের ঘুম। সেই প্রথম অবচেতন মনে কবিতা কিম্বা গানের সুরে সুরে ঘুমের সাথে আমাদের প্রথম পরিচয়। মায়েরা এখনো শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আর অতি আবশ্যিকভাবেই জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ এই ঘুম নানা ভাবে জায়গা করে নিয়েছে বাংলা সাহিত্যে। বাংলা সাহিত্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ এই ঘুম।

সাহিত্য মানবজীবনের দর্পণ স্বরূপ। জীবনের এমন কোনো বিষয় নেই যা সাহিত্যে স্থান করে নেয়নি। ঘুমও এমন একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ নানা ভাবে নানা রূপকতায় তুলে ধরেছেন ঘুমকে। তাঁর কবিতায় তথা সাহিত্যে ঘুম অনেক সময় শান্তির প্রতীক, আবার কখনো মৃত্যুর রূপক।

ঘুমিয়ে পড়ো, চঞ্চলা মন, শান্তি চায় যে প্রাণ।’ এখানে ঘুম এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি, যা চঞ্চল, অস্থির মনকে প্রশান্ত করে, স্থির করে, মানসিক দৃঢ়তা অর্জনে সাহায্য করে। ‘শেষ প্রশ্ন’ উপন্যাসে ঘুম ও জাগরণের দ্বন্দ্ব মানুষের আত্মার প্রশ্নকে ঘিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘুম’ বিষয়ক কবিতা বা গানগুলোতে ঘুমকে কখনও শান্তির আশ্রয়, কখনওবা জীবনের রহস্যময়তার প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পড়া ওই ছায়া

ভুলালোরে ভুলালো মোর প্রাণ!’ অথবা, ‘তোমায় গান শোনাবো, / তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো, / ওগো, ঘুম ভাঙানিয়া’

অথবা, যখন তিনি বলে ওঠেন– ‘জাগরণে তারে না দেখিতে পাই/ থাকি স্বপনের আঁশে / ঘুমের আড়ালে যদি ধরা দেয়

বাঁধিব স্বপন পাশে!’ এমন নানা ছত্রে ছত্রে তিনি ঘুমকে নান্দনিক আয়োজনে বর্ণনা করেছেন। কখনো শান্তির আধার রূপে, আবার কখনো নতুন করে শুরু করার আগে ভীষণ রকম আবশ্যকীয় উপাদানে।

বাংলা গানের ভাণ্ডারে এত রোমান্টিক গান আর কে বা লিখতে পারেন। ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর!

কাজী নজরুলের এই এক অনবদ্য কালজয়ী সৃষ্টি! ঘুমের এমন পরিপাটি ভুবনে প্রিয়তমকে একবার আসার জন্য আকুল আবেদন প্রিয়তমার। অথবা, ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে, আমার গানের বু্‌লবলি! পুত্র হারানোর কী নিদারণ শোকগাথা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু উপলক্ষ্যে লিখলেন, ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’। অথবা, ঘুমের অভাবে হাহাকার– ‘নিশি নিঝুম ঘুম নাহি আসে’। এমন অনেক অনেক হৃদয়ের আকুলতা তিনি তুলে ধরেছেন।নজরুলের কবিতায় ঘুম কখনো বিদ্রোহের বিরাম, কখনো নরম আবেগের প্রকাশ। ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত রবি, ঘুমায় পুবের আকাশ।’

এখানে দিনান্তে প্রকৃতির ঘুম শাশ্বত চক্রের অংশ। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলতে চেয়েছেনঘুম একধরনের নেশা বা বিমূর্ত জগতে ডুবে যাওয়া। ‘ঘুম পায়, ঘুম পায়, / প্রেমের মতন এক ধরনের ঘুম।’ শক্তির কবিতায় ঘুম এক রকম মাতাল স্বপ্নজগৎ নিয়ন্ত্রণহীন, কল্পনাপ্রবণ। ‘আমি ঘুমিয়ে পড়ি, যেন পাখি হয়ে উড়ি / এই শহরের মাথার ওপর দিয়ে’ঘুম মানে এখানে বাস্তব থেকে পালানো, এক ফ্যান্টাসি। জীবনানন্দ দাশএর কবিতায় ঘুম মানে নিসর্গের সঙ্গে মিশে যাওয়া, এক ধরনের স্বপ্নঘোর। ‘রাতের গাঢ় গাঢ় ঘুমে একা একা নিঃসঙ্গতা / আমার হৃদয়ের মতো ঘুমোয় দূর বন।’ এখানে ঘুম মানে নিঃসঙ্গতায় ডুবে যাওয়া, প্রেমহীনতার একাকীত্ব। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে ঘুম প্রায়ই ব্যবহার হয় চরিত্রের মানসিক অবস্থা বোঝাতে। যেমন: ঘুম না আসা মানে অস্থিরতা, আর গভীর ঘুম মানে আত্মপ্রাপ্তি। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাসে নায়িকা রাবেয়ার ঘুমের বর্ণনা: ‘সে ঘুমায়, কিন্তু তার ঘুম অস্থির যেন একটা অজানা শঙ্কা তাকে কুঁকড়ে রাখে।’ এই ঘুম শারীরিক নয়, বরং এক মানসিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।

লোকসাহিত্য ও শিশুসাহিত্যে ঘুম একধরনের পরির রাজ্যে প্রবেশ, আবার শিশুসাহিত্যে ঘুমের ব্যবহার স্নেহ ও কোমলতার প্রতীক। ‘ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি / মোদের বাড়ি এসোএই ছড়ার প্রতিটি চরণে চরণে যে স্নেহের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তা বাংলার চিরায়ত। আধুনিক লেখকদের লেখায় ঘুম অনেক সময় মানসিক ক্লান্তি, পালানোর ইচ্ছা, অথবা অবচেতনের জগতে প্রবেশের উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সেলিনা হোসেন, সৈয়দ শামসুল হকতাঁদের লেখায় ঘুম কখনো প্রেম, কখনো মৃত্যু, আবার কখনো নিঃসঙ্গতার রূপ পায়।

বাংলা সাহিত্যে ‘ঘুম’ একটি বহুল ব্যবহৃত এবং তাৎপর্যপূর্ণ উপাদান। এটি কেবল শারীরিক বিশ্রাম বা ইন্দ্রিয়সংক্রান্ত বিষয় নয়, বরং এটি বিভিন্ন রূপে প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। কবিসাহিত্যিকরা ঘুমকে কখনও জীবনের অলসতা, মৃত্যুসমতা, আবার কখনও শান্তির আশ্রয় বা কল্পনার জগৎ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। ঘুমের মধ্যে মানুষ স্বপ্ন দেখে, যা বাস্তবতার থেকে ভিন্ন। এই স্বপ্নময় জগৎ সাহিত্যিকদের কাছে কল্পনার নতুন দিগন্ত খুলে দেয় এবং অনেক সময় গল্পের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘ঘুম’ শব্দটিকে অনেক সময় কর্মবিমুখতা বা জীবনের প্রতি উদাসীনতার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। যারা কর্মবিমুখ, তাদের ‘ঘুমন্ত’ বা ‘অলস’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ‘ঘুম’ কখনও কখনও রহস্যময়তা বা গা ছমছম করা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বিশেষ করে, রাতের বেলা বা গভীর ঘুমে থাকা অবস্থায় অদ্ভুত ঘটনা বা অভিজ্ঞতা সাহিত্যের পাতায় উঠে আসে। প্রেয়সীর ঘুমন্ত মুখ অথবা বিরহের কারণে বিনিদ্র রজনী – ‘ঘুম’ এখানে প্রেম ও বিরহের অনুভূতি প্রকাশ করার একটি মাধ্যম। শিশুদের ঘুমন্ত মুখের ছবি, তাদের নিষ্পাপ ও শান্তিপূর্ণ প্রকৃতির প্রতীক। ‘ঘুম’ বাংলা সাহিত্যে একটি বহুমাত্রিক শব্দ, যা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়ে এক নান্দনিকতায় রূপ লাভ করেছে।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রকৃতিতে এসেছে শরৎ
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে