চবিতে ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন : দুর্যোগ মোকাবিলা ও নীল অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত

চবি প্রতিনিধি | শনিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৫ at ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) নির্মিত হচ্ছে ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন। চীনের কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্যাটেলাইটভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্র ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দুর্যোগ পূর্বাভাস ও নীল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এই গ্রাউন্ড স্টেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশি নির্ভরতা থেকে মুক্তির পথ : এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসের জন্য ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে করে তথ্য হাতে পেতে দেরি হয়, কখনো কখনো তা পৌঁছাতে সময় লেগে যায় ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা। তবে চবিতে স্থাপিতব্য গ্রাউন্ড স্টেশন চালু হলে চীনের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। ফলে আগাম সতর্কতা জারি করতে যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে, যা লাখো উপকূলবাসীর জীবন ও সম্পদ রক্ষায় মাইলফলক হবে।

প্রকল্প সমন্বয়ক চবির সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, এই গ্রাউন্ড স্টেশন চালু হলে আমাদের আর বিদেশি তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে না। চীনের এইচওয়াই১এসআই/ডি ও এফওয়াই৪বি স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। এর মাধ্যমে দুর্যোগ আসার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমাদেরকে অন্য দেশের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, যা পেতে দেরি হয়। কিন্তু এই গ্রাউন্ড স্টেশন কার্যকর হলে স্বল্প সময়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন : ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে, যার মূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকারও বেশি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের স্থান, অবকাঠামো নির্মাণ, নিরাপত্তা ও পরিচালনা ব্যয় বহন করছে।

চবির প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এরই মধ্যে সিভিল ওয়ার্কের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। জুলাই মাসে আনা যন্ত্রপাতি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। সম্পূর্ণ কার্যক্রম শেষ হলে এটি দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা : চবির উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মাইলফলক। এটি শুধু চবিকেই নয়, পুরো দেশকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সমুদ্র গবেষণায় নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

চবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার চলতি বছরের ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনকালে তিনি বলেছিলেন, এই গ্রাউন্ড স্টেশন বাংলাদেশের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। আমাদের দেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তা মোকাবিলায় এটি বৈপ্লবিক অবদান রাখবে।

নীল অর্থনীতি ও গবেষণায় নতুন দিগন্ত : বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগেই চারটি ফিশিং জোন চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে এসব জোনে নিয়মিত মাছ ধরা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত নয়। ২০১০ সালের পর বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা জয় করলেও ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন না থাকায় মৎস্যসম্পদসহ সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন গবেষকরা। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য মাছ ধরার অঞ্চল (পটেনশিয়াল ফিশিং জোন) শনাক্ত করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাউন্ড স্টেশন চালু হলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, স্রোতের গতি এবং ক্লোরোফিল ঘনত্বের মতো তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে সাইক্লোন ট্র্যাকিং, উপকূলীয় বন্যা মডেলিং, জলবায়ু পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মাছ ধরার অঞ্চলগুলো পুনর্বিন্যাস করে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যাবে। এতে মাছ ধরার উপযুক্ত এলাকা চিহ্নিত করে টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করবে। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার তথ্য বিশ্লেষণ করে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানেও সহায়তা পাওয়া যাবে। এই উদ্যোগটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৪নং লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

অধ্যাপক মোসলেম উদ্দিন বলেন, গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে সম্ভাব্য ফিশিং জোন নির্ধারণ করা যাবে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে মৎস্যখাতের অবদান আরও বাড়বে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ, উপকূলীয় বন্যা মডেলিং এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও এটি সহায়ক হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার মেরিন ডেটা হাব হওয়ার পরিকল্পনা : চবির সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্প চালু হওয়ার পর ধাপে ধাপে এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মেরিন ডেটা হাবে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘এসজিএসএমআরএস ২০৩৫ মাস্টারপ্ল্যান’ অনুযায়ী এআইভিত্তিক ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস মডেল তৈরি, কক্সবাজারে দ্বিতীয় ডেটা সেন্টার স্থাপন, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে তথ্য বিক্রি এবং স্থানীয় গবেষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত।

কাজ শেষ হওয়া ও উদ্বোধনের সময় : কাজ কখন শেষ হতে পারে ও উদ্বোধনের সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, গ্রাউন্ড স্টেশনের কাজ সম্পূর্ণ হতে এই বছর শেষ হয়ে যাবে। কারণ এখানে কয়েকটা ভাগে কাজ হচ্ছে। সবগুলো কাজ একসাথে করা যাচ্ছে না। যার কারণে একটু সময় লাগছে। আশা করি ২৬ সালের শুরুতে আমরা গ্রাউন্ড স্টেশনের কার্যক্রম শুরু করতে পারবো।

পর্যাপ্ত নেট, বিদ্যুৎ ও দক্ষ লোকবলের অভাব : প্রকল্প সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, আমাদের এই গ্রাউন্ড স্টেশন পরিচালনা করার জন্য যে পরিমাণ নেট ও বিদ্যুৎ সার্ভিস দরকার তা আমরা পাচ্ছি না। যার কারণে নেট সার্ভিসের সমস্যা সমাধানের জন্য বিআরটিসিএলসহ বিভিন্ন কোম্পানির সাথে আমরা আলাপ আলোচনা করছি। এবং বিদ্যুৎ সার্ভিসের জন্য ইতিমধ্যে চায়নার সাথে যোগাযোগ করে একটা পাওয়ারফুল জেনারেটর এনেছি। আর এই গ্রাউন্ড স্টেশনের মেশিনারি পরিচালানার জন্য যে রকম দক্ষ লোকবল দরকার তা আমাদের দেশে নেই। আমি চায়নায় কথা বলছি ওদের সাথে চুক্তি করতে চিঠি পাঠিয়েছি গ্রাউন্ড স্টেশন চালু হলে প্রথম দুই বছর তাদের দেশের দক্ষ কিছু জনবল আমাদের এখানে দিবে আর তাদের সাথে আমাদের দেশের জনবল কাজ করে সব কিছু শিখে নিবে। তাহলে আর আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হবে না। ইতিমধ্যে আমি বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্রের সাথেও কথা বলেছি যেহেতু তারা মোটামুটি এই সাইটে কাজ করে তাহলে আমরা গ্রাউন্ড স্টেশন চালু করলে কোনো সমস্যা হলে তাদের থেকেও সহযোগিতা নিতে পারবো। অবশ্য তারাও আমাদের থেকে প্রয়োজনে যেকোনো সহযোগিতা নিতে পারবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঝুঁকি নিয়ে পন্টুনে ওঠানামা
পরবর্তী নিবন্ধপ্রার্থীর ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক