জুম্’আর খুতবা

নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ধরাধামে শুভাগমন

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৫ at ৫:০১ পূর্বাহ্ণ

হে মানব মণ্ডলি! আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করুন। জেনে রাখুন। নিশ্চয়ই আল্লহ তায়ালা আমাদের নবীকে সকল নবীদের উপর মর্যাদামন্ডিত করেছেন। আল্লহর সুস্পষ্ট কিতাব ও নবীজির সুন্নাত তথা আদর্শ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করুন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম চরিত্র অনুসরণে আদর্শ জীবন গঠন করুন। যাঁর প্রসঙ্গে তাঁর প্রভূ এরশাদ করেছেন, (হে প্রিয় হাবীব) আপনি সুমহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। (সূরা: কলম: আয়াত: )

ইসলাম পূর্ব তোমরা লাঞ্ছিত বঞ্চিত ও অপমানিত ছিলে। আল্লাহ তায়ালা নবীজির আদর্শ অনুসরণের বদৌলতে মানবজাতিকে সম্মানিত করেছেন। তারা জাহান্নামের গর্তের দ্বার প্রান্তে উপনীত ছিলো। নবীজির দাওয়াতী হিকমাত ও উত্তম আদর্শিক শিক্ষার বদৌলতে মহান আল্লাহ তা থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। মানবতা অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ছিলো, মহান প্রভুর নিদর্শনাদি ও উত্তম হিদায়তের আলোকে তিনি সত্যান্বেষীদের আলোর পথে দিশা দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআনের আলোকে নূর নবীজির শুভাগমন:

আল্লাহর নিকট হতে এক নূর ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের কাছে এসেছে। যারা আল্লহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায় এর দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন। এবং অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান। (সূরা: মায়িদা, আয়াত: ১৫১৬)

মহান আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে আরো এরশাদ করেছেন, “তিনি আল্লাহ যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন। অপর সমস্ত ধর্মের উপর বিজয়ী করার জন্য, আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা: ফাতহ: আয়াত: ২৮)

হাদীস শরীফের আলোকে নবীজির মর্যাদা:

সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা। জেনে রাখুন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মর্যাদা প্রসঙ্গে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে, নিম্নে কয়েকটি হাদীস শরীফ উপস্থাপন করা হলো। নবীজির পাঁচটি বিশেষ মহিমান্বিত নাম। হযরত জুবাইর ইবন মুতঈম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমার পাঁচটি নাম আছে, আমি মুহাম্মদ (প্রশংসিত), আহমদ (প্রশংসাকারী), আমি মাহি (মোচনকারী), আল্লাহ তায়ালা আমার দ্বারা কুফরী নিশ্চিহ্ন করবেন। আমি হাশির (একত্রিতকারী), সব লোককে কিয়ামত দিবসে আমার কদমের নিকট সমবেত করা হবে। আর আমি আকিব (সর্বশেষ আগমনকারী সর্বশেষ নবী) (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৩৩৩৯, মুসলিম শরীফ, হাদীস নং: ২৩৫৪)

নুরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্ব প্রথম সৃষ্টি: জেনে রাখুন। বিশ্বনবী হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন বিশ্বসৃষ্টির মূল উৎস। সৃষ্টির রূহ। প্রসিদ্ধ কিতাবে মাতালিউল মুসাররাত এ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস এরশাদ হয়েছে, নবীজি এরশাদ করেছেন, “আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর সৃজন করেছেন, আমার নূর হতে প্রতিটি বস্তু সৃজিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন, সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রাণ এবং বিশ্বসৃষ্টির অস্তিত্বের রহস্য।

কুরাইশের বনু হাশেম গোত্রে নবীজির শুভাগমন:

হযরত ওয়াসেলা ইবন আসকা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম এর সন্তানদের মধ্যে বনু কেনানাহকে মনোনীত করেন, এবং তাদের মধ্যে কুরাইশকে এবং কুরাইশদের মধ্যে বনু হাশেমকে এবং আল্লাহ তায়ালা আমাকে বনু হাশেম থেকে মনোনীত করেছেন। (মুসলিম, হাদীস নং: ২২৭৬, তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৬০৫)

নবীজির বংশধারা ছিল পূত: পবিত্র: “আল্লামা ইমাম আবু নুয়াঈম (রা.) তাহাকীকুল মাকাম আল কিফায়াতিল আওয়ামকিতাবে উল্লেখ করেন, কতেক ইমাম রাসূলুল্লাহর হাদীস দ্বারা দলীল উপস্থাপন করেছেন, আদম (🙂 ও হাওয়া (🙂 পর্যন্ত তাঁর সমস্ত পিতৃকুল ও মাতৃকুলের মধ্যে কেউ কাফির ছিলেন না। সবই ছিলেন পুতঃপবিত্র। কেননা ঈমানদার ছাড়া কেউই পবিত্রতার গুণে গুণান্বিত হয় না। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমি নিকাহের মাধ্যমে জন্ম গ্রহণ করেছি, আমি শরীয়ত বিরোধী অপবিত্র পন্থায় আগমন করিনি। হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে আমার পিতামাতা হযরত আবদুল্লাহ (রা.) ও হযরত মা আমেনা (রা.) পর্যন্ত আমার বংশধারায় অপবিত্র রক্ত অনুপ্রবেশ করেনি। (তাবরানী, হাদীস নং: ৪৭২৮, বায়হাকী: খন্ড: , পৃঃ ১৯০)

নবীজি ছিলেন অতুলনীয় সর্বোত্তম সৃষ্টি:

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অনুপম সৌন্দর্যের আঁধার, মানব কুলের সর্দার, সৃষ্টি রাজির মধ্যে তিনি অনন্য, অতুলনীয়। তাঁর যথাযথ গুণগান শানমান শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার বর্ণনা শেষ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর পবিত্র সত্তা, গুণাবলী, ও উত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্টাবলীর বর্ণনা প্রসঙ্গে অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে, “উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, হযরত জিবরাঈল (🙂 আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল আমি মাশরিক মাগরীব তথা বিশ্বের সর্বত্র ঘুরে দেখেছি। আমি মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রেষ্ঠ কাউকে পাইনি, এবং বনু হাশেমের ঘরের চেয়ে উত্তম কোন ঘর আমি দেখিনি। (তাবরানী, হাদীস নং: ৬২৮৫)

আল্লাহ তায়ালা নবীজির নূর মুবারককে প্রথমে চারভাগে ভাগ করেছেন: হযরত জাবের ইবন আবদিল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মাতা পিতা আপনার উপর কুরবান হউক, আমাকে বলুন। আল্লাহ তায়ালা সমস্ত সৃষ্টিরাজির পূর্বে কী সৃষ্টি করেছেন? নবীজি এরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা সবকিছুর পূর্বে সর্বপ্রথম তোমার নবীর নূরকে তাঁর নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। অত:পর সে নূর আল্লাহর কুদরতে যেখানে ইচ্ছা পরিভ্রমণ করেছে, সে সময় ছিলনা লওহ, ছিলনা কলম, ছিল না জান্নাত ও জাহান্নাম, না ছিল ফেরেস্তা, না ছিল আসমান, না ছিল জমীন, না ছিল সূর্য, না ছিল তারকা, না জ্বিন ছিল, না মানুষ ছিল। আল্লাহ তায়ালা যখন সৃষ্টি জগত সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি সে নূরকে চারভাগে বিন্যস্ত করলেন। প্রথম ভাগে কলম, দ্বিতীয় ভাগে লওহ, তৃতীয় ভাগে আরশ সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর চতুর্থ ভাগকে চারভাগে বিন্যস্ত করেছেন, এর প্রথম ভাগ থেকে আরশ বহনকারী ফেরেস্তাদের সৃষ্টি করেছেন, দ্বিতীয় ভাগ থেকে কুরসী, তৃতীয় ভাগ থেকে অবশিষ্ট ফেরেস্তা সৃষ্টি করেন। অত:পর আবার চতুর্থ ভাগ কে চার ভাগে বিভক্ত করলেন, প্রথম ভাগ থেকে নভোমন্ডল, দ্বিতীয় ভাগ থেকে ভূমন্ডল এবং তৃতীয় ভাগ থেকে জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। (আবদুর রাযযাক, আল মুসান্নাফ, হদীস নং: ৬৩)

মহান আল্লাহ আমাদের আপনাদেরকে আলআমীন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমাদেরকে আপনার নৈকট্য ধন্য বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আল্লাহ আমাদের সকলকে কুরআনের বরকত দান করুন, কুরআনের আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা পরিত্রাণ নসীব করুন। নিশ্চয়ই তিনি মহান দানশীল, সৃষ্টি জগতের মালিক, পুণ্যময়, অনুগ্রহশীল, দয়ালু। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসাএ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর,

খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনিয়তি
পরবর্তী নিবন্ধ৭০-এর নির্বাচনে মনোনয়ন : এড. বদিউল আলম এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ