কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিশুদের লার্নিং সেন্টার থেকে চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের লাঠিচার্জে অন্তত ১০ জন শিক্ষক আহত হন। তাদের মধ্যে তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কক্সবাজারের সমন্বয়ক জিনিয়া শারমিন, শিক্ষক নেতা সাইদুল ইসলাম, সুজন রানা, আবু ইমরান, তারেকুর রহমান, সাকিব হাসান, ঊর্মি আক্তারসহ ২৭ আন্দোলনকারীকে আটক করে। তবে পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল পর্যন্ত কক্সবাজার–টেকনাফ সড়কের উখিয়া ডিগ্রি কলেজ এলাকার ফলিয়াপাড়ায় ও উখিয়া থানা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। অবশ্য বিকেলে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতা হয়। স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতারা এতে সমন্বয় করেন।
জানা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে চাকরিহারা শিক্ষকেরা গত সোমবার উখিয়ার কোটবাজারে দিনভর সড়ক অবরোধ করে রাখেন। ওই দিনের ঘোষণার পর আন্দোলনরত শিক্ষকেরা গতকাল বুধবার সকাল ৭টায় উখিয়া ডিগ্রি কলেজ এলাকায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন। সাড়ে ৯টার দিকে প্রধান সড়কের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশের বিভিন্ন সংযোগ সড়ক বন্ধ করে দেন তারা। এতে সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। খবর পেয়ে উখিয়া থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে অভিযান শুরু করে। এসময় আন্দোলনকারীরা অনড় অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের উপর ব্যাপক লাঠিচার্জ করে।
এই বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষকেরা অভিযোগ করেন, পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি তারা সড়কের এক পাশে শান্তিপূর্ণভাবে করছিলেন। কিন্তু সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাঠিচার্জ শুরু করে। এতে অন্তত ১০ জন শিক্ষক আহত হন। তাদেরকে কক্সবাজার প্রেরণ করা হয়। এই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কক্সবাজার প্রতিনিধি জিনিয়া শারমিন রিয়াসহ ২৭ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর তাদের মুক্তি ও থানার ওসির প্রত্যাহার দাবিতে থানার সামনের সড়কে বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা।
তবে পুলিশের দাবি, ফলিয়াপাড়া রাস্তার মোড়ে ৪০–৫০ জন শিক্ষক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছিলেন। তাতে জনদুর্ভোগ বাড়তে থাকে। পুলিশ জনদুর্ভোগ দূর করতে অবরোধ তুলে নিতে বলেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা পুলিশের প্রতি উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আটকদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনকারীরা থানার সামনে অবস্থান নিলে তাদের সাথে যোগ দেন তাদের আত্মীয়–স্বজনসহ স্থানীয়রাও। তারা মুহূর্মুহু শ্লোগান দিয়ে আটকদের মুক্তি এবং ওসির প্রত্যাহার দাবি করেন। এর মধ্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম–সদস্য সচিব এসএম সুজা উদ্দীনসহ কক্সবাজারের নেতারা ঘটনাস্থলে যান। তারা পুলিশের সঙ্গে আলোচনার জন্য থানায় প্রবেশ করেন। একই সাথে উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী এবং উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুল করিমও পুলিশের সাথে আলোচনা করতে থানায় যান। এর মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এসময় কয়েক দফা ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে আটক আন্দোলনকারী, তাদের প্রতিনিধি এবং বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করে পুলিশ। এক পর্যায়ে বিকাল ৫টার দিকে উভয় পক্ষের বেশ কিছু শর্তের মাধ্যমে সমঝোতা হয়। তারপর আটক করা ২৭ আন্দোলকারীকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এই বিষয়ে জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দীন চৌধুরী বলেন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। এরপর আরো ঘটনা ঘটে। তবে শেষ পর্যন্ত সমাধান হয়েছে। সমাঝোতার মাধ্যমে আটকদের বিকেলে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর থেকে আইন–শৃক্সখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষকেরা জানান, তহবিল সংকটের অজুহাতে ১ হাজারের বেশি শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাতে রোহিঙ্গা শিশুদের লেখাপড়া যেমন বন্ধ হয়ে গেছে, তেমনি শিক্ষকেরাও আর্থিকভাবে দুর্দশায় পড়েছেন। চাকরিতে পুনর্বহালের আশ্বাস দিয়ে বন্ধ থাকা শিক্ষাকেন্দ্রগুলো আবার চালু করা হয়েছিল। এখন আমাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, তহবিল সংকটের কারণে আশ্রয় শিবিরের ১ হাজার ১৭৯ জন স্থানীয় (বাংলাদেশি) শিক্ষকের চাকরির চুক্তি শেষ হয়। কিন্তু শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে আশ্রয় শিবিরের সব শিক্ষাকেন্দ্র অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর ৩ জুলাই শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করে বন্ধ থাকা শিক্ষাকেন্দ্রগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এক মাসের মধ্যে ইউনিসেফ তহবিল সংগ্রহ করতে পারলে শিক্ষকদের চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এখনো তহবিল সংগৃহীত হয়নি। তিনি আরও বলেন, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়া শিক্ষকদের বিষয়টি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাধ্যমে আশ্রয় শিবিরে ১৫০টি শিক্ষাকেন্দ্র চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে চাকরি হারানো শিক্ষকদের মধ্য থেকে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চাকরি দেওয়া হবে। ৭ আগস্ট আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টি জানানোও হয়েছে। তারপরও রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হচ্ছিল।