এ্যানি জেকবসন আমেরিকান অনুসন্ধানী সাংবাদিক। দীর্ঘ সাংবাদিকতার জীবনে সামরিক বিষয়াদি বিশেষ করে পরমাণু যুদ্ধ বিষয়ে কাজ করতে করতে পারমাণবিক যুদ্ধের উপর রচনা করেন ‘নিউক্লিয়ারওয়ার: এ্যা সিনারিও’। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এ বইটি বিশ্বব্যাপী সচেতন পাঠকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ আলোড়নের কারণ বইটির বিষয়বস্তু। এ বইয়ে এ্যানি জেকবসন মিনিটের হিসাবে হিসাবে কীভাবে পৃথিবী পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পরে ধ্বংস হবে তার লোমহর্ষক স্ববিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন। সে অভূতপূর্ব বর্ণনা পাঠকদের জন্য তুলে ধরার ইচ্ছায় আজকের এ লেখা।
জেকবসন তার বই’এ দৃশ্যকল্প শুরু করেছেন যেভাবে! নর্থ কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র সজ্জিত আই সি বি এম (ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল) আকস্মিক আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করা হয়। পর মুহূর্তে নর্থ কোরিয় সাবমেরিন থেকে আমেরিকার কালির্ফোনিয়াস্থ দিয়াবলু কেনিয়ন নিউক্লিয়ার স্থাপনায় আঘাত হানার উদ্দেশ্যে আরো একটি পরমাণু অস্ত্র সজ্জিত মিসাইল উৎক্ষেপিত হয়।
নর্থ কোরিয় মিসাইল দুটি উৎক্ষেপণের মুহূর্তে আমেরিকার মহাকাশস্থ স্যাটেলাইট তার ভূ–তাপ সেন্সর এর মাধ্যমে উদঘাটনের সাথে সাথে আমেরিকান নিউক্লিয়ার ওয়ারফেয়ার কমান্ডকে অবহিত করে। নিউক্লিয়ার ওয়ারফেয়ার কমান্ড তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এন্টি নিউক্লিয়ার ওয়ার ফেয়ার ব্যবস্থা সচল করে। এসব ব্যবস্থা নর্থ কোরিয়ার পারমানবিক অস্ত্র সজ্জিত আই সি বি এম’কে ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন এবং কালিফোর্নিয়াস্থ আমেরিকার দিয়াবলু কেনিয়ন নিউক্লিয়ার স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্ত্তূপে পরিণত হয়।
আমেরিকা কোরিয়ার উপর প্রতি আক্রমণে তৎপর হয়। দ্রুততম সময়ে নর্থ কোরিয়ায় আক্রমণ পরিচালনা করতে হলে আমেরিকান ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলিকে উড়ে যেতে হবে নর্থ পোল হয়ে। যা রাশিয়ান আকাশ সীমার উপর দিয়ে। রাশিয়ান আকাশসীমা ব্যবহারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগে আমেরিকার মরিয়া প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। আমেরিকা নর্থ পোল তথা উত্তর মেরু হয়ে নর্থ কোরিয়ার উদ্দেশ্যে তার পরমাণু অস্ত্র সজ্জিত ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোড়ে। নর্থ পোলের উদ্দেশ্যে আমেরিকান মিসাইল উৎক্ষেপিত হওয়ার সাথে সাথে তা রাশিয়ান এন্টি নিউক্লিয়ার ওয়ার ফেয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জেনে যায়। মুহূর্তে পরমাণুু অস্ত্র সজ্জিত ৯০০ (নয়শত) রাশিয়ান ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপিত হয় আমেরিকার বিভিন্ন লক্ষ্যবস্ত্তুর উদ্দেশ্যে।
স্যাটেলাইট এর ভূ–তাপ সেন্সর এর মাধ্যমে এটা জেনে আমেরিকা তার মওজুদের পরমাণু অস্ত্র সজ্জিত সব ব্যালিস্টিক মিসাইল রাশিয়ার উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করে।
ইতিমধ্যে রাশিয়া আমেরিকার মিত্র ন্যাটোর সদস্য দেশগুলির উপর পারমাণবিক অস্ত্র থাকা না থাকা নির্বিশেষে সবার উপর পারমাণবিক আক্রমণ পরিচালনা করে। এর মাঝে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানী, তুরস্ক, কেউ বাদ যায় না। এক মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবী ধ্বংস স্তূপে পরিনত হয়।
এরই মাঝে পৃথিবীর ৬০% মানুষ মৃত্যুর করুন বেদনাময় এক পরিণতি ভোগ করে। যারা বেঁচে যায় তারা পারমাণবিক বিকিরণে ধুঁেক ধুঁকে মরার দিকে আগায়। এ অপেক্ষমাণদের মাঝে থাকবে অষ্ট্রেলিয়, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদির মত দূরবর্তী দেশের কিছু মানুষ। এরাও বিকিরণের হাত থেকে বাঁচতে গুহায় আশ্রয় নেবে।
পারমাণবিক যুদ্ধের ধূলি ঝড়ে পৃথিবীর বুকে আলো পৌঁছাতে পারবে না। পৃথিবী জুড়ে নেমে আসবে নিকষ কালো এক অন্ধকার। ক্রমে পৃথিবীর নানা অঞ্চল বরফে আচ্ছাদিত হবে।
পারমাণবিক যুদ্ধের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের আবার শুরু হবে গুহা জীবন। মানুষ ফিরে যাবে আদিমতায়।
পারমাণবিক বিকিরণ সহনশীল পশুরা পৃথিবীর বুক জুড়ে দাপটের সাথে বিচরণ করবে। মানুষ ভয়ে গুহায় আবদ্ধ থাকবে।
পারমাণবিক বিকিরণে পৃথিবীর ছাদ আয়োনস্পিয়ার ক্ষয়ে যাবে। আয়োনস্পিয়ার সূর্যের অতি বেগুনিরশ্মি বা আল্ট্রাভায়োলেট রে প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে পড়বে। এটির কারণে বেঁচে থাকা মানুষেরা আরোগ অযোগ্য নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে।
মুহূর্তে ঘটে যাওয়া পারমানবিক এই তাণ্ডবে ক্ষতবিক্ষত জীর্ণ পৃথিবী ফিরে যাবে ২৪০০০ (চব্বিশ হাজার) বছর পিছনে। আবার চলতে থাকা পৃথিবীর নতুন মানুষেরা একদিন জানবে কী অবিবেচক অবিশপ্ত ছিল পারমাণবিক যুদ্ধের শিকার মানুষেরা। বর্তমানের শিশুরা যেমন ইতিহাস পাঠ নেয় কীভাবে ডাইনোসররা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছিল, কীভাবে এক এ্যাসিড বৃষ্টিতে ডাইনোসররা হারিয়ে গিয়েছিল তেমনি চব্বিশ হাজার বছর পিছিয়ে যাওয়া পৃথিবীর মানুষেরা একদিন পাঠ গ্রহণ করবে কীভাবে একবিংশ শতাব্দীর মানুষেরা এক পরমাণু যুদ্ধের শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল।
এ্যানি জেকবসন তার বইতে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকির যে প্রবল দিকটি তুলে ধরেছেন তা হল এক ব্যক্তির হাতে এর চাবিকাঠি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার।
এধরনের আশঙ্কা এবং ঝুঁকির বিষয় এ্যানি জেকবসন তার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে প্রসঙ্গক্রমে তুলে ধরেছেন। তার বর্ণিত বিষয়টি ছিল এরকম, ওয়াটারগেট কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়া তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন তার পতন প্রায় আসন্ন। এ অবস্থায় নিঙন একদিন অতিরিক্ত মধ্যপান করেন এবং তার অবস্থা তখন টালমাটাল। মাতাল অবস্থায় নিক্সন ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি পৃথিবী ধ্বংস করে দেবেন, প্রয়োজনে তিনি লক্ষ মানুষ খুন করবেন। তৎকালীন আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার উপস্থিত থেকে নিক্সনের এ বেগতিক নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এ ঘটনার পরপরই তিনি তার দেশের জয়েন্ট চীপ অব স্টাফকে যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কোন প্রকার আদেশ পালন করার আগে তার সাথে পরামর্শের অনুরোধ করেন।
এ থেকে এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট পারমাণবিক যুদ্ধ যেখানে পৃথিবীর লক্ষ কোটি মানুষ তথা পৃথিবীর পরিণতি নির্ভরশীল, সেখানে এমন একটি চূড়ান্ত পরিণতির বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভার একজন ট্রাম, একজন কিম, একজন পুতিন, একজন স্টারমার, একজন নরেন্দ্র মোদি, একজন নেতানিয়াহু, একজন আসিফ মুনির, একজন শি পিং এবং একজন ম্যাক্ররনের হাতে। এ কয়জনের নাম উল্লেখ করলাম কারণ যাদের নাম উল্লেখ করেছি তাদের দেশ সমূহ এখন পামানবিক অস্ত্রের অধিকারী।
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে বিশ্ব–সংস্থার মাধ্যমে গঠিত হয়েছে এন পি টি তথা নন প্রলিফেরেশন ট্রিটি। একই সাথে আন্তর্জাতিক এ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি বা আই এ ই এ। এদের মধ্যে এন পি টি’র কাজ বিস্তার রোধ এবং আই এ ই এ’র কাজ ট্রিটি ভঙ্গ করে কেউ ভিতরে ভিতরে বিস্তার ঘটাচ্ছে কিনা তা সময়ে সময়ে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত রাখা। দুর্ভাগ্য সাম্প্রতিকের ইসরাইল – ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে এ দুটি সংস্থা ব্যর্থতার পরিচয় এবং বির্তক সৃষ্টির অবকাশ সৃষ্টি করেছে।
ব্যর্থতার কারণ আমেরিকা এবং ইসরাইল কর্তৃক ইরানী পারমাণবিক স্থাপনা আক্রমণের সময় আন্তর্জাতিক এই সংস্থাসমূহ কোন ধরনের প্রতিরোধক ভূমিকা পালন করতে পারেনি। অন্যদিকে আই এ ই এ ইরান এন পি টি’র শর্তাবলী ভঙ্গ করছে তেমন এক বক্তব্য দিয়ে ইসরাইলের ইরান আক্রমণের ক্ষেত্র প্রস্ত্তুত করে। এ প্রেক্ষাপটে ইরান আই এ ই এ’ কে এখন থেকে তার পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং আই এ ই এ’ প্রটোকল থেকে তারা নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবও তাদের সংসদে অনুমোদন করে নিয়েছে।
পক্ষান্তরে ইসরাইল এন পি টি’ স্বাক্ষর করেনি অথচ ইসরালের রয়েছে প্রচুর পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র।
পশ্চিমা বিশ্ব এখন ইরানকে চাপ দিচ্ছে আই এ ই এ’ কে তার পারমানবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দিতে, একই অবস্থান ইউরোপিয় ইউনিয়নেরও। কি দ্বিমুখি নীতি! হোয়াট এ ডাবল স্ট্যান্ডার্ড! এরা একবারও ইসরাইলের ব্যাপারে রা শব্দটিও উচ্চারণ করছে না।
পশ্চিমা বিশ্বের এসব ডাবল স্ট্যার্ন্ডাড! নীতির ফলশ্রুতিতে হয়ত একদিন পৃথিবীতে এ্যানি জেকবসন কল্পিত পারমাণবিক যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং হয়ত বাহাত্তর মিনিটেরও কম সময়ে পৃথিবীর মানুষ তার চরম পরিণতি ভোগ করবে। কারণ সেদিনও অর্থাৎ ২১ জুন ২০২৫ আমেরিকা ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নাম দিয়ে ইরান আক্রমণ করে এবং সে আক্রমণে বি ৫২ বোমারু বিমানের মাধ্যমে প্যাট্রিয়ট নামক বাংকার বাস্টার বোমা যার একেকটির ওজন ৩০০০০ (ত্রিশ হাজার) পাউন্ড সে রকম ১৪ (চৌদ্দ) টি বোমা ইরানের বুকে বর্ষণ করে। কি অপরিনামদর্শী ক্ষমতার দাপট। এ দাপটই একদিন পৃথিবীর মরণ ডেকে আনবে নিশ্চিত!
‘দি ডে আফটার’ আমেরিকার বিখ্যাত নির্মাতা নিকোলাস মেয়্যার এর ছবি। এই ছবির দৃশ্যকল্পে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কানসাসে ভাই ফুটবল খেলছে বোন খেলা দেখতে গেছে। হঠাৎ ওরা কিছুই দেখতে পায় না। পারমাণবিক বিকিরণে ভাইবোন হাজারো মানুষের মত তখন দৃষ্টি হারা। হাসপাতালে নেওয়া হয় ভাইটিকে হাসপাতালের অপারেশন বেডে শুয়ে বার বার সে তার দেখতে না পাওয়া বোনকে দেখতে চায়, সে বুঝতে চায় না যে সে তার দৃষ্টি হারিয়েছে! এ করুন অমানবিক অবস্থায় এক ডাক্তার অপর ডাক্তারকে প্রশ্ন করে ‘হোয়াট ইজ গোয়িং অন?’ উত্তরে অপর ডাক্তার বলে ‘সিম্পলি স্টুপিডিটি অব হিউম্যানবিইং’ এ হল মানুষের নিতান্তই এক বোকামি!
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট; সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।