ইংরেজি প্রোকাস্টিনেশন শব্দটির সঠিক বাংলা কী হবে? হবে কি এটা তবে– বিলম্ব করা বা দীর্ঘসূত্রতা করা? নাকি হাতের কাজ ফেলে রাখা? নাকি সময়ের কাজ সময়ে না করা? সময়ের কাজ সময়ে না করার ব্যপারে বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়।’ ছোটবেলায় বহুবার আব্বার এই সবক পেয়েছিলাম। নাহ, প্রোকাস্টিনেশনের বাংলা কি হলে ইংরেজি ঐ শব্দটির সঠিক ব্যঞ্জনা আনা যায় বুঝতে পারছি না তা, ভাষাজ্ঞানে আমড়া কাঠের ঢেঁকি আমি। অতএব থাক ওটা ইংরেজিই। ব্যাপার হচ্ছে, অফিসের কাজের ব্যাপারে এই ব্যাপারটি করা আমার একদম ধাতে সয় না। নিজে তো তা করিই না তা, অন্যেও যখন করে ওটা, ভীষণ খারাপ হয় মেজাজ তখন। তবে, কী জানি এক অদ্ভুত কারণে নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারে ওটা কেন জানি প্রায়শই করে থাকি। ছোটবেলার সবই যেহেতু ছিল ব্যক্তিগত ব্যাপার, আর তা নিয়ে পুত্রের এই ধাত লক্ষ করেই বোধ হয় আব্বা আমাকে ঐ প্রবাদটির সবক দিতেন বারবার।
অফিসের কাজ সময়ে না করে অসময়ে করলে সবসময় দশ ফোঁড় না দিতে হলেও, নিতান্তই অজরুরি অগুরুত্বপূর্ণ কাজও হয়ে ওঠে অবশ্যই তুমুল জরুরি এক সময়। ওইরকমই একটা কাজ নিয়ে পেয়েছি একটু আগে হেডকোয়ার্টারের থার্ড রিমাইন্ডার! ঠিক করেছি তাই, আজ বুধবার, মানে সৌদি কর্মসপ্তাহের শেষদিনের শেষবিকেলের এই সময়ে, যখন অফিসের এই তলা একদম ফাঁকা হয়ে গেছে, তখন এটি শেষ করেই বেরুবো।
আসলে ইচ্ছে করে তো ফেলে রাখিনি কাজটা। সারাক্ষণই নানান জরুরি কাজ করতে করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তদুপরি এটি অফিসিয়াল ব্যাপার হলেও, এর লক্ষ ব্যক্তিগতভাবে আমি। তাই তিন নাকি চার সপ্তাহ আগে, এক সপ্তাহের ডেডলাইন সম্বলিত এটি হাতে এলেও সময়মতো কাজটি করার ব্যাপারে মনযোগী হতে পারিনি। আজ যখন থার্ড রিমাইন্ডার এলো, আছি বড়ই অস্বস্তিতে।
নাহ এ কোন জটিল কাজ না। এ হল আমাদের গ্লোবাল অফিসের যে টিম, আমার মতো যাদেরকে ডাকা হয় ‘আন্তর্জাতিক এসাইনি’ নামে, তাদের দেখভাল করার কাজে নিয়োজিত, রুটিন কাজ এটা তাদের। আর তা হলো যখন কোন আন্তর্জাতিক এসাইনি নতুন কোন দেশে গিয়ে যোগ দেয়, তাদের কাছে তারা একগাদা প্রশ্নের ডকুমেন্ট পাঠায়, উত্তর দিতে হয় যেটির নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। তারপর ওটা নিয়ে কী যে করে কে? তা অবশ্য জানা নাই। এর আগে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম যখন কাজ করতে, তখনও এই প্রশ্নপত্রের ডকুমেন্টসটি পেয়েছিলাম। সেসময় তাৎক্ষণিকভাবেই ঐটির সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলাম। এবারও যখন সেটি এসেছিল, ভেবেছিলাম দেব উত্তর সময় করে। কিন্তু ঐ যে বললাম সারাক্ষণই ফায়ার ফাইটইং জাতের জরুরি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায়, গিয়েছিলাম ভুলে।
এখন প্রায় মিনিট বিশেক আগে প্রশ্নপত্রটির প্রশ্নসমূহের একে একে উত্তর দিতে গিয়ে বুঝতে পারছি বাংলার পলিমাটি থেকে উপড়ে এনে এই মরুতে আমাকে যে কোম্পানি রোপণ করেছে, তাতে চলছে কেমন এখানে আমার যাপিত জীবন এ বিষয়ক এই প্রশ্ন সিঙ্গাপুরে যতো সহজে পূরণ করতে পেরেছিলাম এখানে তা করা যাচ্ছে না, যদিও প্রশ্নগুলো একই। মহামতি আইনষ্টাইনের জটিল আপেক্ষিকতার সূত্র যতোটা বুজি এই নির্বোধ, তাতে এইমাত্র আবারো হৃদয়ঙ্গম হল যে, সিঙ্গাপুরের পারিপার্শিকতায় যে প্রশ্নের উত্তর সহজে দিতে পেরেছিলাম এক বছর আগে, এখন সৌদি প্রেক্ষিতে সেই একই প্রশ্নের উত্তরে, কবিগুরুর অনুকরণে সহজ কথা আর যাচ্ছে না বলা সহজে!
যেসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, এমনিতে সেসবকে বেশ সহজ, সরল, আর নিরীহ মনে হলেও, উত্তর দিতে গিয়ে মনে হচ্ছে এখন, ব্যাপার কিন্তু তা নয়। কিছু প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ বা ‘প্রযোজ্য নয়’ এর যে কোন একটিতে টিক দিতে হয়। মজার ঘটনা হলো “হ্যাঁ” তে টিক দিলে কোন চিন্তা নাই। কিন্তু যখনই ‘না’ বা ‘প্রযোজ্য নয়’ এর ঘরে টিক দিচ্ছি তখনই, কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে আসছে ‘ব্যাপারটি ব্যাখ্যা কর!’
কিম্বা যে সব প্রশ্নের উত্তরে ০ থেকে ১০ এর স্কেলে নম্বর দিতে বলছে, যার মধ্যে শূন্য মানে খুবই খারাপ, ১০ মানে খুবই ভাল, তাতে কোন উত্তরে ৫ এর কম দিলেই, ঐ প্রশ্নের নীচে ভেসে উঠে ‘বিষয়টি ব্যাখ্যা কর। প্যাঁচ খেয়ে গেছি সেই ব্যাখ্যা নিয়েই –শুরুর দিকে নানান প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ, কিম্বা নম্বর দেয়ার ব্যাপারে ৮/ ৯ দিয়ে সহজে উৎরে গেছি। যেমন একটি প্রশ্ন ছিল– ‘তুমি কী সময়মতো ও তোমার মনমতো বাড়িতে উঠতে পেরেছো?’ এর উত্তরে সময়ের ব্যাপারটি আর বাড়ি পাওয়ার ব্যাপারে বাঙালী হওয়ার কারণে যে ঝামেলা হচ্ছিল তা অবলীলায় ভুলে গিয়ে, চমৎকার গ্রানাডা কমপ্লেক্সের বলতে গেলে বিলাসবহুল আমার ফ্লাটটির কথা মনে করে মহানন্দে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’তে টিক দিয়েছি। কিন্তু যখনই পরের প্রশ্ন, “তোমার বাচ্চাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের স্কুল পেয়েছ কী?” এর উত্তরে সিঙ্গাপুরে যেমন লিখেছিলাম প্রযোজ্য নয়, আর তাতে যখন ব্যাখা দাবী করেছিল, তখন ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম যে, আমার পরিবারকে আমি সিঙ্গাপুরে আনবো না বলে ঠিক করেছি। সমস্যা হচ্ছে এখানে লিখতে পারছি না তা। কারণ গ্লোবাল থেকে ঠিক করা আমার বেতনভাতাদি নিয়ে বস ফিল ঘোরতর দ্বিমত পোষণ করে, ব্যাপারটি নিয়ে তুমুল যে দর কষাকষি করছে বলে জানিয়েছিল সেদিন, তখন বলেছিল বস, যে আমার পরিবার এখানে আসবে এমন ধরে নিয়েই সে দর কষাকষি করছে। তারপর যদি কোম্পানি তাদের জন্য ভিসার ব্যবস্থা না করতে পারে, সেটা কোম্পানির সমস্যা। তা বলে ইন্টারন্যাশানাল এসাইনিরা কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী তাদের সন্তানদের জন্য যে শিক্ষাভাতা প্রাপ্য, তা থেকে কোম্পানি আমাকে বঞ্চিত করতে পারে না। এ হলো ফিলের যুক্তি।
হ্যাঁ অন্তত আমার এই ক্ষেত্রে এটি যে অবশ্যই একটি ‘সাদা মিথ্যা’ মানে হোয়াইট লাই, এটাও মানে ফিল। কিন্তু কথা হল তার, টিমের কারোর ভালর জন্য সে একটু আধটু হোয়াইট লাই বলতে মোটেও দ্বিধা করে না! এ বিষয়ে যুক্তি তার, সারা পৃথিবীই তো চলছে নানান মিথ্যা আর ভাওতাবাজিতে! জানি না এইরকম নারী বৈরি পরিবেশের কারণেই এখানে বসবাসকরা নারীরা বেশী সাহসী হয়ে উঠে কী না? সেদিনকার সেই জর্ডান সুন্দরী নাদিয়ার মতো ইনি বেপরোয়া রকমের সাহসী না হলেও, ইনারও সাহস তো কম মনে হচ্ছে না। যতোই আমি শুধু লেডিস ফার্স্ট নিয়ম না শুধু, ইনি যেহেতু আজকের কাজের জায়গা সেই পলিক্লিনিকটির পথপ্রদর্শকও বটে, তাই ওনাকে আগে হাঁটতে দিয়ে, বেশ পিছিয়ে হাঁটতে চাচ্ছি, তাতেও ফলাফল দাঁড়াচ্ছে, নিজ গতি কমিয়ে উনি অচিরেই আসছেন চলে পাশাপাশি!
দু’বার এমন হতেই, মনে হল নাহ! এরকম স্পিকটি নট হয়ে আমার পিছিয়ে হাঁটার ব্যাপারটাকে ইনি আবার আমি বাঙ্গালের কাপুরুষতা ভেবে বসেন কি না? বলা তো যায় না। কিন্তু তা হতে দেবার সামান্যতম সুযোগও তো দেয়া যাবে না। পড়ে যদি তাতে ঘাড়ে মোতাওয়ার বেত, পড়ুক! নেই কুছ পরোয়া! এই ভেবে তৃতীয়বার উনি পিছিয়ে আসতেই, অনুচ্চ স্বরে বলতে শুরু করলাম টুকটাক কথা। এভাবে টুকটাক কথায় প্রথমে জানলাম, উনি প্যালেস্টাইনি। খুব বেশী দিন না, বছরখানেক হল যোগ দিয়েছেন আমাদের সেলস টিমে মেডিক্যাল এডুকেটর মানে রিপ্রেজেন্টিভ হিসেবে এবং তিনি একজন ফার্মাসিস্ট। ব্যক্তিগত তার পরিচয় জানার সাথে জানা গেল কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যে সব তথ্য, তাও। যেমন জেনেছি, এখানে যে কোন হাসপাতালেই মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত রেস্টট্রিক্টেড। কিছু কিছু হাসপাতালে খুব জোর এক ঘণ্টার একটা সময় দেয়া থাকে ডাক্তার ভিজিট করার জন্য, তাও আবার সপ্তাহের প্রতিদিন না। হাসপাতালের সিকিউরিটিদের চোখে নানান কায়দায় ধুলো দিয়ে, কাজ সারতে হয়। সে হিসাবে মেয়েদের একটা বিশেষ সুবিধা হল, আবায়ায় মুখ ঢাকা থাকায় সিকিউরিটিরা চিনতে পারে না। আর এ কারণেই তারা শুধু নিজেদের ব্যাক্তিগত হ্যান্ডব্যাগ নিয়েই যায় কাজে। অফিসের দেয়া মার্কামারা ব্যাগ না।
এছাড়া পলিক্লিনিক শব্দটি এতোদিন নানান ডকুমেনটস দেখলেও এবং নানানজনের মুখে উচ্চারিত হতে শুনলেও এটি যে আসলে কী তা বুঝতাম না। বুঝলাম তা এখন যে এ হলো আসলে আমাদের দেশে যেকম ডায়গনোস্টিক কাম কন্সালসেশন সেন্টার আছে, যেখানে বসে ডাক্তাররা রোগী দেখেন; ঐরকম একটা ব্যাপার। তবে এখানে অতিরিক্ত যা আছে তা হলো রোগীদের জরুরি চিকিৎসা সেবা দেবার ব্যবস্থা। সব পলিক্লিনিকই বেসরকারি।
সরকারি হাসপাতালে ফ্রি তে অনেক সেবা পাওয়া গেলেও, খুব দরিদ্র না হলে ওখানে যায় না সৌদিরা। এমনিতে পলিক্লিনিকগুলোতে এখানকার বিদেশী কর্মীরা চিকিৎসা নিতে গেলেও, এখন যেটিতে যাচ্ছি আমরা সেটিতে মূলত সৌদিরাই যায়। তবে এটির ডাক্তাররা সবই বিদেশী। এখন পলিক্লিনিকটিতে মোটামুটি ৭/৮ জন ডাক্তার পাওয়া যাবে। এর সাথে মিস খালেদি বেশ আনন্দের সাথে জানালো, এটি তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পলিক্লিনিক, কারণ এখান থেকে সে বেশ ভাল ধরনের সেলস পায় আমাদের ব্যাথার ঔষধ ভ্লটারেন ইঞ্জেকশনের।
হ্যাঁ এই বাঙ্গাল যে কাপুরুষ না তা প্রমাণ করার জন্য কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে কথাবার্তা শুরু করাতেই অবশেষে পেয়ে গেলাম কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য যেমন, তেমনি কপালগুনে কোন ঝুট ঝামেলা ছাড়াই পৌঁছে গিয়েছিলাম পলিক্লিনিকে। তদপুরি এই সব কথাবার্তায় মনে হল মিস ইনারার যে আড়ষ্টভাবটি ছিল শুরুতে, কেটেছে তাও। যা একটি ভাল খবর।
কিন্তু নাহ! গন্তব্যে পৌঁছে ক্লিনিকটির করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হল আবারো সে হয়ে পড়েছে নার্ভাস। হড়বড় করে জানাচ্ছে তাই যে, এখানে রিপ্রেজেন্টেটিভদের ভিজিটিং টাইম সকাল সাড়ে ৮ থেকে সাড়ে নটা। বাজছে এখন সকাল ৮ঃ২০। কিন্তু এরই মধ্যে সে বুঝতে পারছে যে নানান কোম্পানির লোক ঢুকে পড়েছে ক্লিনিকে। অতএব ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকতে গিয়ে লাইনে পড়তে হতে পারে! এ কারণে সে বেশ অনিশ্চিত আশংকা চোখে নিয়ে তাকালো আমার চোখে চোখে।
দ্রুততার সাথে তাই তাকে অভয় দিয়ে বললাম যে, নো টেনশন। আমিও একসময় রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলাম। এই কাজের যাবতীয় চ্যালেঞ্জ আমার জানা। বিশাল কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম বি এ করার কারণে কোম্পানিতে যোগ দিয়েই চিফ মার্কেটিং অফিসার হয়ে যাইনি আমি। প্রতিনিয়ত সে যেভাবে কাজ করে, করবে ওটাই, আজও সে। তার কাজের ভুল ধরতে আসিনি আমি। এসেছি বরং কাজ করতে গিয়ে সেলসের লোকজন কী কী ও কেমন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তা বোঝার জন্য। ক্লিনিকের টানা করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলছি যখন এসব, তখনি মিস ইনারা উত্তেজিতভাবে বললো
ড. সেলিম ঐ যে, ঐ ডাক্তারের চেম্বারের সামনে কোন রিপ্রেজেন্টেটিভ দেখছি না। ইনি খুব ভ্লটারেন ইঞ্জেকশন লিখেন। বলেই দ্রুত পায়ে গিয়ে ঐ দরজার ঝুলতে থাকা পর্দা ফাঁক করে সম্ভবত সালাম দেয়ার সাথে ভেতরে ঢোকার অনুমতি নিয়ে সে রুমে ঢুকে পড়তেই, নিয়েছিলাম পিছু আমিও!
লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক