রপ্তানিখাতে বিপর্যয় ঠেকাতে মার্কিন শুল্ক আরোপের বিষয়টির সুরাহা জরুরি

| শুক্রবার , ১১ জুলাই, ২০২৫ at ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ

উচ্চ হারের শুল্ক তিন মাস স্থগিতের পর বাংলাদেশি পণ্যে ৩৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার নতুন শুল্ক হার ঘোষণা করে তিনি বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশকে চিঠি দিয়েছেন। এ খবরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ৩৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক বহাল থাকলে দেশের রপ্তানি খাতে বিপর্যয় নামবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকখাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান এই সেক্টরটি ঝড়ের মুখে পড়বে। রপ্তানিকারকেরা বলেন, আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের অনেক বড় বাজার হচ্ছে আমেরিকায়। এখানে যদি এতো বিশাল অংকের শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে আমাদেরকে অনেক বড় ধাক্কার মুখে পড়তে হবে। সবচেয়ে শঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, তৈরি পোশাকখাতে আমাদের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী হচ্ছে ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম আমেরিকায় ২০ শতাংশ শুল্কে পোশাক রপ্তানি করবে। কিন্তু আমাদের দিতে হবে ৩৫ শতাংশ।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, প্রধান উপদেষ্টাকে শুল্ক আরোপের কথা জানিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন চিঠি দেওয়ার পর মঙ্গলবার সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে বিষয়টি নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা শুরু হয়। এদিন সচিবালয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি তুলনামূলক কম। এরপরও ৩৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের ‘ন্যায্যতা’ থাকে না। বিষয়টির সুরাহা করতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে আরেকটি মিটিং আছে। এখন বৈঠকটি মোটামুটি পজিটিভ হবে। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছেন। এখন ওয়ান টু ওয়ান নেগোসিয়েশন হবে।’

জানা যায়, সোমবার থেকে ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের চিঠি দিয়ে নতুন হারে শুল্ক আরোপের কথা জানাতে শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, বাংলাদেশ, সার্বিয়া, থাইল্যান্ড ও তিউনিসিয়ার মতো রপ্তানিকারক দেশসহ ১৪টি দেশকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ৭ জুলাই লেখা চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে, আমাদের সম্পর্ক সমকক্ষ হওয়া থেকে অনেক দূরে। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো বাংলাদেশের যে কোনো পণ্যের ওপর আমরা মাত্র ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করব।’ তিনি বলেন, ‘এই শুল্ক সব খাত ভিত্তিক শুল্কের অতিরিক্ত হিসাবে প্রযোজ্য হবে। উচ্চশুল্ক এড়াতে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো হলে তার ওপরও সেই উচ্চশুল্ক আরোপ হবে। দয়া করে এটা অনুধাবন করুন, আপনার দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বৈষম্য দূর করতে যা প্রয়োজন, তার থেকে ওই ৩৫ শতাংশ সংখ্যাটি অনেক কম।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আপনি যদি কোনোভাবে শুল্ক বৃদ্ধি করেন, তাহলে আপনি যতটা বাড়াবেন, তা আমাদের আরোপিত ৩৫ শতাংশের ওপর যোগ হবে।’

বিজিএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনা বা সমঝোতা বিষয়ে শিল্পখাতকে কোনোভাবেই অবহিত করা হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কোনো মতামতও গ্রহণ করা হয়নি। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ী সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়াই গ্রহণ করা হয়েছে, যা হতাশাজনক। বিশ্ব বাণিজ্য বর্তমানে অত্যন্ত মূল্য সংবেদনশীল বা প্রাইজ সেনসেটিভ মন্তব্য করে সেলিম রহমান বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী ভিয়েতনামের উপর শুল্ক মাত্র ২০ শতাংশ, যেখানে আমাদের ক্ষেত্রে তা ৩৫%। এটা একটি গুরুতর বৈষম্য তৈরি করছে। বর্তমান মৌসুমে হয়তো কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, কিন্তু ভবিষ্যতে এই শুল্কের প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে বড় বড় অনেক ক্রেতাই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। কারণ ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই কম খরচের বাজারে ঝুঁকবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশকে অবকাঠামো সুবিধা উন্নত করতে হবে। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন এবং কম সময়ে পণ্য পাঠাতে উন্নত বন্দর ব্যবস্থাপনা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সমন্বিত লজিস্টিকস নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এদিক থেকে উন্নতি করা গেলে বাংলাদেশ মার্কিন শুল্কের প্রভাব মোকাবিলা করে বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক বাজারে নিজেদের অংশীদারিত্ব বাড়াতে পারবে। ফলে, আশা করা যায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ধারা অব্যাহত থাকবে। তাঁরা বলেন, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যদি ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের বিষয়টির একটি সুন্দর সুরাহা করা না যায়, তাহলে আমাদেরকে অনেক চড়া মূল্য দিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে