দেশের মোট জনসংখ্যার দুই–তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম বলে তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল– ইউএনএফপিএ। সংস্থাটির হিসাব বলছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে ১১ কোটি ৫ লাখই কর্মক্ষম বয়সের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের সামনে জনসংখ্যার এ লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগানোর সুযোগ থাকার কথা বলছে সংস্থাটি।
গত ৮ জুলাই দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সোমবার ঢাকার জাতিসংঘ কার্যালয়ে ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি রিপোর্ট ২০২৫’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপরিউক্ত তথ্য তুলে ধরেন ইউএনএফপিএ’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বিপরীতে বয়স্কদের বিষয়ে নজর দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জনসংখ্যার ৭ শতাংশ (১ কোটি ২ লাখ) ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি, যা আবার জনসংখ্যার বার্ধক্যের সূচনাও নির্দেশ করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ বা ৩ কোটি ৩০ লাখের মতো কিশোর–কিশোরী। আবার ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সি যুবগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি, অর্থাৎ ২৮ শতাংশ। ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৮২০ কোটি হওয়ার তথ্য ইউএনএফপিএ’র প্রতিবেদনে উঠে আসার তথ্য দেন তিনি। নতুন প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী জন্মহারের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈপরীত্য উঠে আসার তথ্য দিয়ে ক্যাথরিন কামকং বলেন, আমরা এমন একটি বৈশ্বিক জনসংখ্যাগত বৈপরীত্যের সাক্ষী হতে যাচ্ছি, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উচ্চ আয়ের দেশগুলিতে ফার্টিলিটি তলানিতে নেমে এসেছে। বিশ্বব্যাপী সর্বনিম্ন সংখ্যা নিয়ে সেখানে এই হার প্রতি নারীর মাত্র শূন্য দশমিক ৮ জন সন্তান।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ৪০ শতাংশ যুবক কোনো ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ গ্রহণ অথবা কর্মের মধ্যে নেই। তারা পড়াশোনা যতটুকু করার করেছেন এবং বসে আছেন। জীবনের কোনো পরিকল্পনা নেই, প্রচেষ্টা নেই কর্ম সুযোগ তৈরি করার। একটাই পরিকল্পনা, একটাই প্রত্যাশা যে কবে চাকরি হবে। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের এ মুহূর্তে প্রধান কাজ হলো যতদূর সম্ভব দক্ষ জনগোষ্ঠী বিশ্বের শ্রমবাজারে রপ্তানি করা। যে দেশের জন্য কাজ করতে চাই সে দেশের কর্মুকৌশল রপ্ত করাতে হবে। যদি জার্মানিতে কাজ করতে চাই তবে ঐ দেশের কর্ম–প্রশিক্ষণ গ্রহণ করাতে হবে। এভাবে প্রতিটি দেশে দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রেরণের কৌশল জানতে হবে, যুবকদের জানাতে হবে এবং বিশ্ববাজারে কোথায় কী কী ধরনের কাজের সুযোগ আছে, তার জন্য কী কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন, তার আলোচনা হতে হবে। এ বিষয়ে কলাম লেখক সুধীর সাহা লিখেছেন, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির সবচেয়ে দুর্বল দিক তার দক্ষতার ক্ষেত্র। দক্ষতার ঘাটতি এবং দক্ষতার অমিল উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। পৃথিবীর মোট শ্রমশক্তির শতাংশ হিসাবে দক্ষ শ্রমিকের অনুপাত চীনে ২৪, আমেরিকায় ৫২, ইংল্যান্ডে ৬৮, জাপানে ৮০ এবং ভারতে মাত্র ৩। বাংলাদেশ সে হিসাবে এখনো শূন্যের কোঠায় অবস্থান করছে। সুতরাং বৈশ্বিক উৎপাদন হতে হলে বাংলাদেশকে প্রথমেই শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত নারী শ্রমশক্তির বিষয়টিও। সেখানে বাংলাদেশকে কাজ করতে হবে অনেক বেশি। নারী শ্রমশক্তির সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি এখানে শ্রমশক্তির দক্ষতাও বৃদ্ধি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমছে না। কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষায় যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের চাকরির বাজারে ভালো চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদানুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকারগণ ব্যর্থতা ও হতাশায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক সময় চেষ্টা ও সংগ্রামে বিফল হয়ে ধ্বংসাত্মক কাজে আত্মনিয়োগ করছে, যা কেবল তার নিজের বা পরিবারের জন্য নয়, গোটা সমাজের জন্য হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর। এমতাবস্থায় করণীয় হচ্ছে, এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় বের করা।
একটি দেশে জনসংখ্যা তখনই সম্পদে পরিণত হয়, যখন প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা যায়। কিন্তু এ চাহিদাগুলো পূরণে এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিকল্পনার অভাবে পুরো জনসংখ্যাকে কার্যকর জনসম্পদে পরিণত করা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে বৈষম্য। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে এ ঘাটতিগুলো পূরণ করতে হবে।