সবুজে ঘেরা গ্রামের বুকে রঙিন ছেলেবেলা কাটাচ্ছে আবইয়াজ। তার বয়স মাত্র দশ বছর। কিন্তু বুদ্ধিতে সে দশজনকে হার মানায়। বইয়ের চেয়েও বেশি তার পছন্দ গাছে পাখির বাসা দেখা, পোকামাকড়ের লুকোচুরি খেলা, আর সবচেয়ে প্রিয় ছিল পেছনের বাগানের এক পুরনো আমগাছ।
এই আমগাছটা রোপণ করেছিলেন আবইয়াজের বাবার দাদা। এখনো সে গাছটি বেঁচে আছে, কিন্তু বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়েছে। পাতা কম, ডালপালা শুকনো, ফলও হয় না আর। অনেকেই বলে গাছটা কেটে ফেলতে, কিন্তু আবইয়াজ রাজি নয়। সে বলে, “এই গাছটা শুধু গাছ না, এটা আমার প্রপিতামহের স্মৃতি।”
একদিন স্কুলে সাইদুল স্যার বললেন, “সবাই আগামী সপ্তাহে ‘গাছ আমাদের বন্ধু’ এই বিষয়ে একটি প্রজেক্ট তৈরি করবে।” সবার মাঝে গুঞ্জন শুরু হলো–কে কী করবে! কিন্তু আবইয়াজ চুপচাপ। সে কিছু ভাবছে।
বাড়ি ফিরে সে আমগাছটার পাশে গিয়ে বসল। গাছে হাত রেখে বলল, “বন্ধু, তোর তো এখনো অনেক কিছু দেওয়ার বাকি। আমি প্রমাণ করব তোকে এখনো আমাদের কাজে লাগে।”
পরের দিন থেকেই সে কাজে লেগে গেল। শুকনো ডালগুলো কেটে ফেলল, গাছের গোড়ায় সার দিল, নিয়ম করে পানি দিতে লাগল। এমনকি তার চাচাতো ভাই আছিমের সাথে আলোচনা করে সে গাছের নিচে একটি ছোট্ট পাঠাগার বানানোর পরিকল্পনাও করল–যেখানে গ্রামের সবাই বই পড়তে পারবে, বিশেষ করে শিশুরা।
এক সপ্তাহ পর, প্রজেক্ট উপস্থাপনের দিন এসে গেল। সবাই ছবি, পোষ্টার আর বড় বড় কথা নিয়ে হাজির। আর আবইয়াজ?
সে একটি ছবি আঁকা চার্ট নিয়ে এলো একদিকে গাছটি ছিল শুকনো, আরেকদিকে নতুন চেহারায় সবুজ পাতায় ভরা। এরপর সে গল্প বলল কীভাবে সে সেই পুরনো আমগাছটিকে রক্ষা করেছে এবং কীভাবে সে গাছটির নিচে শিশুদের জন্য পাঠাগার তৈরি করেছে।
সবাই স্তব্ধ। সাইদুল স্যার দাঁড়িয়ে বললেন, “এই হলো প্রকৃত শিক্ষা। শুধু মুখে বললে হয় না, কাজে প্রমাণ করতে হয়। আবইয়াজ আমাদের সবাইকে গাছের প্রতি ভালোবাসা আর দায়িত্বশীলতার একটা বাস্তব উদাহরণ দিয়েছে।”
এরপর গ্রামের সবাই আমগাছটিকে নতুন করে দেখতে শুরু করল। কেউ গাছের নিচে বসে বই পড়ে, কেউ গান গায়। আর আবইয়াজ? সে গাছের নিচে বসে মুচকি হেসে বলে, “বন্ধু, আমি তো বলেছিলাম, তোকে এখনো আমাদের কাজে লাগে!”