মহান একুশে তাঁদের স্মরণ করতে হবে

এ. কে. এম. আবু বকর চৌধুরী | বুধবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ at ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ

৫২’র মহান একুশে ঢাকার রাজপথে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে স্বৈরাচার মুখ্যমন্ত্রী (২০শে সেপ্টেম্বর ’৪৮৩ এপ্রিল ’৫৪) নুরুল আমিনের পুলিশের বুলেটে শহীদ হয়েছিল তাঁদের উদ্দেশে উৎসর্গ করছি বক্ষমান নিবন্ধটি।

ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে পরিবেশগত কারণে আমরা অত্যন্ত সহজ, সরল আর গভীর আবেগ প্রবণ জাতি। কিন্তু বিগত বছর ধরে কেন জানি না আমাদের এই মৌলিক চরিত্রকে পুঁজি করে আমাদের রাজনীতিবিদ, লেখক, সাহিত্যিক আর বুদ্ধিজীবীরা স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার হীন লক্ষ্যে ছলচাতুরীর মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধের এক প্রলম্বিত ইতিহাসের ঐতিহাসিক, সর্বজনস্বীকৃত ও বাস্তব অধ্যায়সমূহকে সূর্যালোকের মত সত্যকে চাপা দিয়ে বিনিময় ও ফরমাসী বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন স্বীয় বা দলীয় গুণকীর্তনকে লিখে বা বলে বা প্রাচার করে ইতিহাসকে বিকৃত করার হীন মানসিকতার পরিচয় দিয়ে আসছে। তা কোনমতে আগামী প্রজন্মের জন্য কল্যাণকর ও ইতিবাচক নয় বরং এটি আত্মহত্যারই শামিল।

মনে রাখতে হবে হিংসা থেকে প্রতিহিংসা, দ্বেষ থেকে বিদ্বেষ আর ঘৃণা থেকে জিঘাংসা প্রবৃত্তিরই জন্ম নেয় যা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। যার যা প্রাপ্য তা যদি দেয়া হয় তবে সম্প্রীতি, সৌহার্দ, সহমর্মিতা যেমন গভীর হয় তেমনি সঠিক উপস্থাপনায় ইতিহাস হয়ে উঠে আপন মহিমায় গতিশীল যা দেশ, জাতি ও আগামী প্রজন্মের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বৃটিশ শাসনামলে (২৩ জুন, ১৭৫৭ ১৪ আগস্ট ১৯৪৭) সরকারি ভাষণ হিসাবে ইংরেজির সাথে ফার্সী, উর্দু ও হিন্দী ব্যবহৃত হত। এই তিন ভাষার কোনটিই কিন্তু বৃহৎ বাংলার (আমাদের দেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) মানুষের ভাষা নয়। অবশ্য ১৮৮২ হতে সরকারি গেজেটসমূহে বৃহৎ বাংলার জন্য বৃটিশ সরকার ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষা ব্যবহার শুরু করে।

বৃটিশ শাসনামলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতির প্রথম দাবী উত্থাপন করেছিলেন ধনবাড়ির নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বাংলা ভাষার বদলে উর্দু ও ফার্সী ভাষার বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার বক্তব্য রেখেছিলেন ও মাতৃভাষার উন্নতির ব্যাপারে বাঙালিদের ঔদাসীন্যে পরিতাপে তিনি জর্জরিত হয়েছিলেন।

নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯১১ সালে রংপুরে প্রাদেশিক মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে ভাষণদানকালে বলেন ‘বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে উর্দ্দু ও ফার্সী ভাষার প্রয়োজন নেই। কোন জাতিকে অপর জাতির কোন ভাষা মাতৃভাষারূপে গ্রহণে বাধ্য করলে তাদের জাতীয়তা একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। নর্মামরা ইংল্যান্ড জয় করে দু’শ বছর পর্যন্ত তাদের ভাষা ষেখানে চালু করতে ব্যর্থ হয়। মোগল সম্রাটরা তাদের স্বীয় ভাষা ত্যাগ করে যে জাতির মাঝে তারা বাস করতেন সেই জাতির ভাষাই গ্রহণ করেন। আরবরা পারস্য জয় করে ও তথায় আরবী প্রচলনে ব্যর্থ হয়। তাই বাংলার মুসলমান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা বাংলাভাষাকে ইংরেজি, উর্দু, ফার্সীর সাথে সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য মহামান্য লাট বাহাদুরের কাছে দাবী উত্থাপন করছি’ (নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী / . আলী নওয়াজ / পৃ: ৫৭৫৮)

১৯২১ সালে খেলাফত আন্দোলনের সময় ভারতের নেতৃস্থানীয় মুসলমানগণ ভারতের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার জন্য বৃটিশ সরকারের উপর চাপ দিলে নবাব চৌধুরী লিখিতভাবে বৃটিশ সরকারকে জানান যে, ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক না কেন, বাংলার রাষ্ট্রাভাষা বাংলা করতে হবে (বাংলা রাষ্ট্রাভাষার প্রথম প্রস্তাবক নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী / আবু মুহাম্মদ মোতাহের/ পৃ: ২০)। তিনি প্রস্তাব উত্থাপনের পর থেকে ধনবাড়িতে ১ বৈশাখ মেলার আয়োজন করেন যা আজও চালু আছে।

নবাব চৌধুরী পূর্ববঙ্গ ও আসাম ব্যবস্থাপক পরিষদ (১৯০৬১১) ও ভারতীয় লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের (১৯২১২৩) সদস্য এবং বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মিলনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯০৩ ১৭ এপ্রিল, ১৯২৯) ছিলেন। ১৯২৯র ১৭ এপ্রিল ১৩৩৬ বাংলার ১ বৈশাখ দার্জিলিংয়ের ইডেন ক্যাসেলে ইন্তেকাল করেন ও ২০ এপ্রিল ৪ বৈশাখ ধনবাড়িতে এক ঐতিহাসিক মসজিদের মিনারের নিচে তাঁকে দাফন করা হয়।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দ্বিতীয় প্রস্তাবক হলেন বহু ভাষাবিদ জ্ঞান তাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (জন্ম ১০ জুলাই, ১৮৮৫: মৃত্যু ১৩ জুলাই, ১৯৬৯)। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধকালে (১৯১৪১৮) ভারতীয়রা বৃটিশকে আর্থিক, নৈতিক ও প্রত্যক্ষ সমর্থন দেয়ায় ভারতীয় নেতৃবর্গের বিশ্বাস জন্মে যে, সহসা বৃটিশরা ভারতকে স্বাধীনতা দিয়ে দিবে। সম্ভবত এ বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে ১৯১৮ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে এক চিঠি মারফত মহাত্মা গান্ধীজী ভারতের রাষ্ট্রভাষা কি হবে তা জানতে চাইলে বাংলা ভাষাভাষী নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেন -‘ভারতের আন্তঃপ্রাদেশিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে একমাত্র হিন্দিকেই ভাষাভাষা করা উচিত’ (রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী / প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়/১৯৬৮)। এর প্রতিবাদে ১৯২১র শেষের দিকে শান্তি নিকেতনে কবির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভাষা সম্পর্কিত এক সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ উত্থাপিত মূল প্রবন্ধে প্রতিবাদ মুখর হন। এই বহু ভাষাবিদ (৩৬টি ভাষার উপর অগাধ দখল ছিল তাঁর) ভাষা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিবন্ধে বলেন: সর্বভারতীয় ভাষা ক্রমানুসারে উর্দ্দুর দাবী প্রথম, দ্বিতীয় বাংলা ও তৃতীয় হিন্দীর স্থান। ভাষাসম্পদ ও সাহিত্যগুণে বাংলা ভাষা এশিয়ার ভাষা গোষ্ঠীর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এবং জনসংখ্যার অনুপাতে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বাংলা সর্বোচ্চ বিধায় বাংলা ভাষাই রাষ্ট্রভাষা হতে হবে (উপমহাদেশের ভাষা আন্দোলন ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ / অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবু আলিব / ঐতিহ্য / ফেব্রুয়ারি ’৮৬ / . মুহাম্মদ এনামুল হক সম্পাদিত Shahidullah Felicitation Volume/ ১৯৬৬)

. শহীদুল্লাহ আবার প্রতিবাদ জানান ১৯৪৭র ২৯ জুলাই। এ বছর আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করলে ড. শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদে ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ শীর্ষক নিবন্ধে বলেন: কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দির অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র ভাষারূপে গণ্য হলে তা শুধু পশ্চাদগমই হবে। যদি বিদেশী ভাষা বলে ইংরেজি পরিত্যক্ত হয় তবে বাংলাদেশ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার কোন যুক্তি নাই। কারণ উর্দু পাকিস্তানের কোন অঞ্চলের ভাষা নয়। যদি বাংলাভাষার অতিরিক্ত কোন রাষ্ট্রভাষা করতে হয় তবে উর্দুর দাবী বিবেচনা করা যায়।

আজ আমাদের ভাষা আন্দোলনে উল্লেখিত বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা নিগৃহীত কেন তার জবাব আমাদের স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী ইতিহাসবিদরা কি দেবেন? কিন্তু জবাব দিতেই হবে।

লেখক : জীবন সদস্যবাংলা একাডেমি ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ