অসুস্থ ব্যক্তির সেবা–যত্ন করা তার খোঁজ–খবর নেওয়া ও সান্ত্বনার বাণী শোনানো রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত। হাদিস শরিফে এক মুসলমানের প্রতি অপর মুসলমানের যে বিশেষ ছয়টি অধিকার পালনের কথা বলা হয়েছে তার একটি হচ্ছে কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া সাধ্যমতো তার সেবা–সেবাযত্ন করা। ইসলাম মানবতার ধর্ম। রোগীর সেবাযত্ন করা খোঁজ–খবর নেওয়া ও তাকে সান্ত্বনার বাণী শোনানো নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো অসুস্থকে দেখতে যেতেন তিনি তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন এবং তাকে সুসংবাদ দিতেন। হাদিসে রোগীর সেবাযত্নকে সর্বোৎকৃষ্ট নেক আমল ও ইবাদত ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন তোমরা রোগী দেখতে যাও এবং জানাজায় অংশগ্রহণ করো কেননা তা তোমাদের পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। রোগী অমুসলিম হলে তাকে দেখতে যাওয়ার মধ্যেও অনেক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানবতা ও মানবিকতার ধর্ম। ইসলাম ধর্মে যে কোনো ভালো কাজ ভালো কথা বলা সুন্দর আচরণকে ইবাদত বলে গণ্য করা হয়েছে।
সুস্থতা–অসুস্থতা ও রোগ–ব্যাধি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। এটি কারো জন্য শাস্তি কারো জন্য পরীক্ষা আবার কারো জন্য গুনাহ মাফের উপায় ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। এসব আলোচনাই এসেছে কোরআন–সুন্নায়। আবার রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়ার এবং তার সেবা করায়ও রয়েছে অফুরন্ত ফজিলত সওয়াব ও মর্যাদা। রোগ–ব্যাধি, সুস্থতা ও রোগীকে দেখতে যাওয়া সম্পর্কে ইসলামের সেসব নির্দেশনা কী? রোগ–ব্যাধি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তিনি মানুষকে পরীক্ষা করেন। আবার তিনিই মানুষকে সুস্থতা দান করেন। মহান আল্লাহ কোরআনে পাকে দুইটি বিষয়ই সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন। মানুষকে পরীক্ষা করতে মহান রবের ঘোষণা এমন–নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধন–প্রাণ এবং ফলের (ফসলের) লোকসান বা ক্ষতির দ্বারা পরীক্ষা করলো; আর তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।
হাদিসে নবী করিম (সা.)-আরও বলেছেন, ক্ষুধার্তকে খাবার দাও, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করো এবং বন্দিকে মুক্ত করো। নবী করিম (সা.) মুসলমানদের পাশাপাশি অমুসলিমেরও সেবা করেছেন। কোনো অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্তনার বাণী শোনালে খোঁজ–খবর নিলে একটু সেবাযত্ন করলে তার দুশ্চিন্তা লাঘব হয়। সে অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করে। তাই মানবিক বিচারে রোগীর খোঁজ–খবর নেওয়া ও তাদের সেবাযত্ন করা উচিত। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি হক রয়েছে। এক. সালামের জবাব দেওয়া দুই. হাঁচির উত্তর দেওয়া তিন. দাওয়াত কবুল করা চার. অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া ও পাঁচ. জানাজায় অংশগ্রহণ করা। হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে–কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে যাওনি। বান্দা বলবে আপনি তো বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আমি আপনাকে কীভাবে দেখতে যেতে পারি আল্লাহ বলবেন আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল। তুমি তাকে দেখতে গেলে সেখানে আমাকে পেতে। ইসলামে রোগীর সেবা করা অনেক বড় ইবাদত। আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন যে ব্যক্তি রোগীর খোঁজ–খবর নিল সে আল্লাহর রহমতে ডুবে গেল আর সে যখন বসল তখন সে তার মধ্যে স্থির হয়ে গেল।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যখন কোনো বান্দা তার অসুস্থ মুসলমান ভাইকে দেখতে যায় অথবা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য যায় তখন একজন ফেরেশতা উচ্চস্বরে আকাশ থেকে ঘোষণা করে বলেন–তুমি ভালো থাক–তোমার চলাফেরা ভালো ছিল তুমি বেহেশতে ঠিকানা করে নিয়েছ। এছাড়া রোগী দেখার অসংখ্য ফজিলতের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি যে ব্যক্তি সকালবেলা কোনো অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে যায় সত্তর হাজার ফেরেশতা বিকেল পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকে। আর বিকেলে রোগী দেখতে গেলে সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা দোয়া করে। আর জান্নাতে তার জন্য একটি ফলের বাগান তৈরি হয। তবে রোগী দেখার কিছু নিয়ম ও আদব রয়েছে।
ইসলামে রোগী দেখার নিয়ম ও আদব :
১. অজুসহকারে রোগী দেখতে যাওয়া। এ মর্মে হজরত আনাস (রা.) রেওয়ায়েত করেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-ইরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোনো অসুস্থ মুসলমান ভাইকে দেখতে যায়–তাকে জাহান্নাম থেকে ৬০ বছরের পথ দূরে রাখা হবে। ২. রোগীর অবস্থা বুঝে শরীরে হাত রেখে রোগের কথা জিজ্ঞাসা করা। রাসূল (সা.)-বলেছেন সেবা–যত্নর পূর্ণতা হলো–রোগীর কপালে বা শরীরে হাত রেখে জিজ্ঞেস করা কেমন আছেন। ৩. রোগীর সামনে এমন কথা বলা যাতে সে সান্ত্বনা লাভ করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কোনো রোগীকে দেখতে গেলে এমন সান্ত্বনামূলক কথা বলতেন বলে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে। ৪. রোগীর কাছে বেশি সময় ক্ষেপণ না করা। রাসূল (সা.)-বলেন রোগী দেখার সময় হলো–উটের দুধ দোহন পরিমাণ। আরেক বর্ণনায় এসেছে রোগী দেখার উত্তম পন্থা হলো–তাড়াতাড়ি ফিরে আসা। ৫. রোগী কিছু খেতে চাইলে এবং তা তার জন্য ক্ষতিকর না হলে খেতে দেওয়া। রাসূল (সা.)-বলেছেন রোগী যদি কিছু খেতে চায়–তবে তাকে খেতে দেওয়া উচিত। ৬. রোগীর সামনে উচ্চ আওয়াজে কথা না বলা। ইবনে আব্বাস (রা.)-বলেন সুন্নত হলো–রোগীর পাশে কম সময় বসা এবং উঁচু আওয়াজে কথা না বলা। ৭. রোগীর জন্য দোয়া করা। বিভিন্ন দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা.)-বলেন কোনো রোগীর কাছে গিয়ে নিম্নের দোয়াটি সাতবার পাঠ করলে মৃত্যুরোগ ছাড়া সব রোগ থেকে সে সুস্থ হয়ে উঠবে–ইনশাআল্লাহ। দোয়াটি হলো–আসআলুল্লাহাল আজিম, রাব্বাল আরশিল আজিম, আই ইয়াশফিয়াকা। ৮. রোগীর কাছে নিজের জন্য দোয়া চাওয়া। রাসূল (সা.)-বলেন তোমরা রোগী দেখতে গেলে তার কাছে নিজের জন্য দোয়া চাও। কেননা তার দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার সমতুল্য।
আল্লাহর দরবারে রোগীর দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার মতো কবুল হয়। হজরত উমর (রা.)-বলেন রসুল (সা.)-বলেন তুমি কোনো রোগীকে দেখতে গেলে তোমার জন্য দোয়া করতে বলো। কেননা রোগীর দোয়া ফেরেশতাগণের দোয়ার মতো কবুল করা হয়। সুতরাং–মুমিন মুসলমানের উচিত কোরআন–সুন্নাহর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী রোগীর সেবা করা। রোগীকে দেখতে যাওয়া। রোগীকে দেখে নিজের পরকালের মুক্তির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। হাদিসে ঘোষিত ফজিলত, সওয়াব ও মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করা। আল্লাহতাআলা মুসলিম উম্মাহকে রোগী দেখতে যাওয়া এবং সেবা করার মাধ্যমে মহান ফজিলত লাভের তাওফিক দান করুন এবং মুসলিম উম্মাহকে কোরআন–সুন্নাহর উপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট