রেল নামক ‘নিরাপদ বাহনে’ চড়ে ঝরছে প্রাণ। পরিসংখ্যান মতে ট্রেনে কাটা পড়া বা দুর্ঘটনার প্রথম ও প্রধান কারণ মানুষের অবহেলা ও অসচেতনতা। এরপর আছে ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন ও সেতু, লোকবল সংকট, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন কোচ, তদারকির অভাব, লাফালাফি করে বগিতে ওঠার চেষ্টা। প্রতিদিন ৩ বার করে পুরো রেললাইন, সিগন্যাল ও সেতু পরিদর্শনের কথা থাকলেও অনেক সময় বছরে একবারও পরিদর্শনে যাওয়া হয় না। দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, লাইনচ্যুত ও লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ছাড়াও অবহেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু তো আছেই।
রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) হিসাবে, বছরে তিন শতাধিক লাশ উদ্ধার হয় রেললাইন থেকে, যার বেশিরভাগই দুর্ঘটনা বলে প্রমাণিত হয়েছে। দুর্ঘটনার পাশাপাশি আত্মত্যার ঘটনাও রয়েছে। ট্রেনে যত দুর্ঘটনা ঘটছে তার জন্য পথচারীদের অসচেতনতাই বড় কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশই ঘটেছে রেললাইন পারাপারের সময় অসচেতনতার কারণে। অবহেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে লোকের মৃত্যুও বাড়ছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে, মোবাইলে কথা বলা অবস্থায় এবং বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়েও প্রাণ দিতে হচ্ছে। তদন্তে অনেক লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। এ কারণে মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে অনেক সময় লাগে।
১৮৯০ সালের রেল আইনে বলা আছে, রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুটের মধ্য দিয়ে মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ। এমনকি এর মধ্যে গরু-ছাগল ঢুকে পড়লে সেটিকেও নিলামে বিক্রি করে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে রেল কর্তৃপক্ষের। রেলে কাটা পড়ে কেউ আহত হলে উল্টো ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই মামলা করতে পারে রেলওয়ে। এতসব কঠোর নিয়ম থাকার পরও নিজের জীবন দিয়েও সচেতন হচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, দেশের প্রায় ৩ হাজার ৩৩২ কিলোমিটার রেলপথের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সময়ই খোলা থাকে ফিশপ্লেট, ক্লিপ, হুক, নাটবল্টুসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ। এমনকি রেললাইন মজবুত ও স্থিতিশীল রাখতে স্থাপিত স্লিপারগুলোর অবস্থাও নাজুক। আবার এ সব স্লিপারকে যথাস্থানে রাখতে যে পরিমাণ পাথর থাকা প্রয়োজন, অধিকাংশ স্থানেই তা নেই। কোনো কোনো স্থানে পাথরশূন্য অবস্থায় আছে স্লিপারগুলো। শুধু তাই নয়, সারা দেশে আছে ৩ হাজার ৬টি রেলসেতু। যার ৯০ শতাংশই তৈরি হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখা হয়েছে সেতুগুলো। এগুলোর ওপর দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলছে বিভিন্ন রুটের ট্রেন। সব মিলিয়ে এক রকম ‘মৃত্যু ফাঁদ’-এ পরিণত হয়েছে গোটা রেলপথ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো রেলপথে প্রতি বছর ২২ লাখ ঘনফুট পাথর প্রয়োজন হলেও দেয়া হচ্ছে ১০-১২ লাখ ঘনফুট পাথর। পুরো রেলপথে পূর্ণ মাত্রায় পাথর দিতে এক বছরে খরচ হয় ৩৩ কোটি টাকা। সেখানে রেলওয়ের লাইনচ্যুত বগি ও ইঞ্জিন উদ্ধার এবং লাইন মেরামতে প্রতি মাসেই খরচ করছে ৮ কোটি টাকারও বেশি, যা বছরে খরচ দাঁড়ায় শত কোটি টাকায়।
রেল দুর্ঘটনা নিয়ে কথা হয় রেলের চালক, গার্ড ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে। তারাও দুর্ঘটনার জন্য ব্রিটিশ আমলের ইঞ্জিন, বগি ও ব্রিজকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, রেল লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি, লাইন ক্ষয়, স্লিপার নষ্ট, লাইন ও স্লিপার সংযোগ স্থলে লোহার হুক না থাকার কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। লাইনে নির্ধারিত দূরত্বের মধ্যে (প্রায় ৪০-৫০ ফুট) পয়েন্ট রয়েছে। এ সব পয়েন্টের মধ্যে দু’পাশে ৮টি করে মোট ১৬টি নাটবল্টুসহ ১৬টি হুক, ক্লিপ থাকার কথা। কিন্তু দেখা গেছে অধিকাংশ পয়েন্টের মধ্যে ১৬টির স্থলে ৫-৭টি রয়েছে। তারা আরো বলেন, প্রতিদিন ৩ বার করে লাইন, সিগন্যাল ও ব্রিজ পরিদর্শন করা ছাড়াও ট্রেন ছাড়ার পূর্বে ইঞ্জিন ও প্রতিটি বগির বিশেষ বিশেষ যন্ত্রাংশ ও চাকা চেক করার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।
ট্রেনে কাটা পড়ার বিষয়ে রেলওয়ে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী আজাদীকে বলেন, জনসাধারণকে সচেতন করতে আমরা সচেতন মূলক আলোচনা সভা সমাবেশ করে থাকি। যেখানে বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী, এলাকার জনপ্রতিনিধি সহ আরো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকেন। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা রেলওয়ের আইন ও শাস্তি সম্পর্কে অবহিত করছি। তাদের সচেতন করছি। কারণ আমরা মনে করি একমাত্র মানুষকে সচেতন করেই এই অপমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
একই বিষয়ে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সিআই আমান উল্লাহ আমান আজাদীকে বলেন, যদিও বিষয়টি রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কাজ না তবুও বিবেকের তাড়নায় এই অপমৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধে আমরা বিভিন্ন সময় সচেতনতা মূলক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে থাকি।












