চট্টগ্রামের ফুসফুস বলে খ্যাত সিআরবি’র পর এবার চট্টগ্রামের মানুষের প্রাণভরে শ্বাস নেয়ার আরেকটি প্রিয় জায়গা পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত কেড়ে নেয়ার পাঁয়তারা চলছে। আর এই উদ্যোগ নিয়েছে আর কেউ নয় সমুদ্র সৈকতের রক্ষক চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকার ৭ কিলোমিটার পরিসরের ১.৫ কিলোমিটার অংশ ২৫ বছরের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দিতে যাচ্ছে সিডিএ। খুব সহসা ইজারা দেয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। এই দেড় কিলোমিটার অংশে টিকেট কাটা ছাড়া সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারবে না।
সমুদ্রসৈকত জনগণের সম্পদ। উন্নত বিশ্বের কোথাও সমুদ্র সৈকতে চলাচলের কোনো বাধানিষেধ নেই। আর সমুদ্র সৈকতকে অবকাশ ও বিনোদনের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দিয়ে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার ক্ষুন্ন করার কোনো নাজির কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার কথাই ধরা যাক। সমুদ্র-বেষ্টিত অস্ট্রেলিয়ায় দর্শনীয় সমুদ্র সৈকতের সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবেনা। এ দেশের সব সমুদ্র সৈকত এলাকাকে ক্রাউন ল্যান্ড বা সরকারী মালিকানাধীন জমি হিসাবে গণ্য করা হয়। এভাবে সমুদ্র সৈকতে সর্বসাধারণের অবাধ বিচরণ সংরক্ষিত করা হয়েছে যাতে মানুষ বিনোদনমূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য সমুদ্র সৈকতকে ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া সমুদ্র সৈকতের পাড়ে যাদের বাড়ী তাদের জমির সীমানা সমুদ্র সৈকতে গিয়ে শেষ হলেও কোনোভাবেই সৈকত এলাকায় সর্বসাধারণের প্রবেশ অবরুদ্ধ করতে পারবেনা। অস্ট্রেলিয়ার আইনে এটা নিষিদ্ধ।
সমুদ্র সৈকতে মানুষের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত না করে সিডিএ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের একাংশের ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যেখানে মানুষকে টিকিট করে ঢুকতে হবে। তার মানে যাদের টিকিট কাটার সামর্থ্য আছে কেবল তারাই সেখানে যেতে পারবে। এভাবে সর্বসাধারণের একটি বড় অংশকে বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে। চট্টগ্রামের মানুষের জন্য যেখানে আরও বেশি উন্মুক্ত এলাকা দরকার, সেখানে তা আরো সীমিত করার যৌক্তিকতা কতটুকু তা বোধগম্য নয়।
সমপ্রতি পতেঙ্গা এলাকাকে সংস্কারের মাধ্যমে ঢেলে সাজিয়ে সিডিএ পর্যটনের যে ব্যাপক সুযোগ করে দিয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রকল্পের আওতায় পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট, সীতাকুন্ড পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়ী বাঁধ, আউটার রিং রোড সহ নির্মিত হয়েছে সমুদ্র সৈকতে বসার জন্য রঙিন আসন, পরিবার পরিজন নিয়ে হাঁটার জন্য চওড়া রাস্তা ও রাস্তার দু’পাশে বাতি। নূতন করে সংস্কার করা পতেঙ্গা সৈকতে মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নিতে, এক মুঠো নির্জনতা উপভোগ করতে, একটু মানসিক প্রশান্তির এখানে ছুটে আসেন নগর জীবনের ব্যস্ততার ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত মানুষ। বন্ধের দিনে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে আসা মনপিপাসু ও পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখে বোঝা যায় এই জায়গাটা মানুষের কত প্রিয়। সৈকতে বেশি যায় মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষ। তাদের অন্য কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য কম। কিন্তু অবসর কাটোনার এই জায়াটুকুতেও যদি টিকিট কেটে ঢুকতে হয় তাহলে সাধারণ জনগণ যাবে কোথায়?
১৯৯৫ সালের চট্টগ্রাম মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী নগরের কোথায় কি হবে তা নিয়ে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করা হয়। সিডিএ ড্যাপে পতেঙ্গা সৈকতকে পাবলিক ওপেন স্পেস বা সর্বজনের উন্মুক্ত পরিসর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, এ ধরনের উন্মুক্ত এলাকা কোনো ব্যক্তি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়া যাবে না। তাই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত আইনগতভাবে ইজারা দেয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেনা। দুঃখজনক হল সিডিএ যদি আইন লংঘনের নজির স্থাপন করে তাহলে সাধারণ মানুষ কেন এই আইন মানবে?
সিডিএ বলছে, সৈকতের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাদের পর্যাপ্ত তহবিল নেই বলেই এই উদ্যোগ নিয়েছে। সৈকতের একটি অংশ থেকে অর্জিত আয় থেকে বাকীটুকু রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। সাধারণত বড় কোনো প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা কিভাবে করা হবে, আর এ জন্য বাৎসরিক কত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে সেজন্য প্রকল্পের শুরুতেই একটি বিজনের প্ল্যান তৈরী করা হয়। পতেঙ্গা সসৈকত সংস্কার কাজ শুরু করার আগে এ নিয়ে কি সিডিএ কোনো পরিকল্পনা করেছে? না হলে প্রকল্প শেষ করার কয়েক বছরের মধ্যেই কেনো অর্থের টান পড়বে?
সর্বসাধারণের প্রবেশযোগ্য একটি স্থানকে বাণিজ্যকভাবে ইজরার দেয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, ও আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজন ছিল। আমাদের দেশের কর্তৃপক্ষগুলো এ বিষয়ে উদাসীন। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা না করেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন।
পতেঙ্গা সৈকতে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত রেখে পর্যটকদের জন্য কিছু সেবামূলক বা বিনোদনমূলক ব্যবস্থার মাধমে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আয় করা যেতে পারে। যেমন সৈকত এলাকায় ক্যাফে, চট-জলদি খাবার, চলযান, শিশুদের জন্য খেলাধূলার ব্যবস্থা, শৌচাগার ইত্যাদি নির্মাণ করে তা পরিচালনার জন্য দেয়া যেতে পারে। এভাবে সহজেই মুনাফা উঠিয়ে আনা যায়। এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থাগুলো সিডিএ খতিয়ে দেখতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই সৈকতের একটি অংশ বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।
সিআরবি’র মত সাধারণ মানুষকে এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, প্রতিবাদে মুখর হতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্যাণ ও স্বার্থের বিপক্ষে যায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেয়া ঠিক হবে না।
লেখক : গবেষক ও জলবায়ূ বিশেষজ্ঞ











