শ্রীলঙ্কায় প্রধানমন্ত্রীর অফিসও বিক্ষোভকারীদের দখলে

দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া, জরুরি অবস্থা জারি

আজাদী ডেস্ক | বৃহস্পতিবার , ১৪ জুলাই, ২০২২ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ

শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থা ভঙ্গ করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী রাজধানী কলম্বোতে গতকাল প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের অফিসে ঢুকে পড়েছে। পার্লামেন্টের স্পিকার রনিল বিক্রমাসিংহেকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করার পরেই প্রতিবাদকারীরা তার দপ্তরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কয়েক দফায় কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় ছাড়াও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি টিভি চ্যানেলের অফিসের ভেতরেও ঢুকে পড়লে তার সমপ্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। জানা গেছে, ৭৩ বছর বয়সী গোটাবায়া স্থানীয় সময় মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে পৌঁছান। সর্বশেষ গতকাল সন্ধ্যায় জানা গেছে, মালদ্বীপ থেকে সিঙ্গাপুরে উড়ে গিয়েছেন গোটাবায়া।
শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের ‘অবস্থান’ এবং ‘গন্তব্য’ সম্পর্কে মালদ্বীপ সরকার গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও তথ্য দেয়নি। শ্রীলঙ্কা পার্লামেন্টের স্পিকার অবেবর্ধনে আগে জানিয়েছিলেন, বুধবারই ইস্তফা দিতে পারেন গোটাবায়া। এমনকি, ২০ জুলাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথাও ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু রাত পর্যন্ত ইস্তফার খবর মেলেনি। রাজনৈতিক সঙ্কটের এই আবহে সেনা এবং পুলিশের তরফে পার্লামেন্টের স্পিকারের কাছে অশান্তি থামাতে সর্বদল বৈঠক ডাকার আবেদন জানানো হয়েছে। শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট দেশ ছেড়ে পালানোর পর বিক্ষোভকারীদের চলমান আন্দোলন থামাতে সেনাবাহিনীকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। বিবিসি জানিয়েছে, বুধবার এক টেলিভিশন বক্তৃতায় বিক্ষোভকারীদের ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যায়িত করে তিনি এ নির্দেশ দেন। সেনাবাহিনীর উদ্দেশে রনিল বিক্রমাসিংহে বলেন, শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য যা যা করা দরকার, তাই করুন। আমরা আমাদের সংবিধানকে ছিন্ন করতে পারি না। আমরা ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতা দখল করতে দিতে পারি না। আমাদের গণতন্ত্রের জন্য এই ফ্যাসিবাদী হুমকির অবসান ঘটাতে হবে।’ রনিল বিক্রমাসিংহে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ভবন দখলকারী বিক্ষোভকারীদের সেগুলো ছেড়ে যেতে বলেন এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। কলম্বোতে বিবিসির এক সংবাদদাতা জানিয়েছেন, বিক্রমাসিংহের সর্বশেষ বিবৃতির ফলে রাজধানী কলম্বোতে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা জোরদার করা হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে পালিয়ে মালদ্বীপে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বুধবার মিছিল করে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের দপ্তরের দখল নেয় হাজারো বিক্ষোভকারী। বিক্ষোভকারীরা টিয়ার গ্যাস উপেক্ষা করে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের গেইট খুলে ফেলার চেষ্টা করে। চরম উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে তার দপ্তরে নেই। গোটাবায়া রাজাপাকসের মত তার মিত্র রনিল বিক্রমাসিংহেও জনগণের কাছে জনপ্রিয় নন। বিক্ষোভকারীরা শনিবার তার ব্যক্তিগত বাসভবনে আগুন দিলে তখন থেকেই তিনি অজ্ঞাত স্থানে রয়েছেন। তার পরিবারের সদস্যরাও বাসায় নেই। তবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের পক্ষ থেকে গতকাল সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং পশ্চিম প্রদেশে কারফিউ জারির পাশাপাশি কিছু আদেশ জারি করেছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। শনিবার হাজারো বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ার বাসভবন দখল করলে সেসময় প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন রনিল বিক্রমাসিংহে। যদিও তিনি তার পদত্যাগের সময় জানাননি। বিক্ষোভকারীরা তার ব্যক্তিগত বাড়িতে আগুন দেয় সেই রাতে। এস শশীধরন নামে ৩০ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা চাই রনিল পদত্যাগ করুক। যারা গোটাকে পালাতে সাহায্য করেছে তাদের সবাইকে প্রেপ্তার করুন। আমরা আমাদের চুরি হওয়া টাকা ফেরত চাই।’
দেশের বর্তমান চরম অর্থনৈতিক সংকটের জন্য প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে এবং তার পরিবারকে দায়ী করে আসছে সেদেশের বিক্ষোভকারীরা। গত দুই দশক ধরে এই দ্বীপ রাষ্ট্রটির ক্ষমতায় রয়েছে রাজাপাকসে পরিবার। যাদের উৎখাতে এবার উঠেপড়ে লেগেছে হাজারো বিক্ষোভকারী। দেশ ছেড়ে পালানোর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্বীপ দেশে মহা প্রতাপশালী রাজাপাকসে পরিবারের কয়েক দশকের কর্তৃত্বের লজ্জাজনক অবসান ঘটল। একজন অভিবাসন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, গোটাবায়া রাজাপাকসে তার স্ত্রী এবং দুজন দেহরক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীলংকার বিমান বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে করে দেশ ছাড়েন। কয়েক মাস ধরে টানা বিক্ষোভের মধ্যে গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয় গোটাবায়ার বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসেকে। বিক্ষোভকারীরা তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না, তাদের জনপ্রিয় স্লোগান হয়ে উঠেছিল ‘গোটা, গো হোম’। কিন্তু নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন গোটাবায়া রাজাপাকসে। এরমধ্যে শনিবার রাজধানী কলম্বোতো রীতিমত লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যায়। ঝড়ো বিক্ষোভে হাজারো মানুষ প্রেসিডেন্ট প্র্রাসাদ টেম্পল ট্রি দখল করে নেয়, খবর আসে, প্রাসাদ থেকে পালিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। তখন থেকেই গোটাবায়া রাজাপাকসে আত্মগোপনে ছিলেন। শোনা যাচ্ছিল, তিনি আছেন নৌবাহিনীর কোনো জাহাজে। প্রথমে স্পিকার এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে তিনি বার্তা দিয়েছিলেন, জনতার দাবি মেনে বুধবারই (গতকাল) পদত্যাগ করবেন। মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, গোটাবায়া রাজাপাকসে ১৩ জুলাই তারিখ দিয়ে তার পদত্যাগপত্রে সই করে ফেলেছেন, স্পিকার বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ করবেন। তার আগেই নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ২০ জুলাই পার্লামেন্টে ভোটগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করেন স্পিকার। এর মধ্যেই মঙ্গলবার খবর আসে, গোটাবায়া দুই দফা চেষ্টা করলেও তার দেশ ছাড়ার চেষ্টা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের বাধায় পণ্ড হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ভিসার আবেদন নাকচ করেছে বলেও খবর আসে। তবে শ্রীলংকার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সংগঠনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কোনো আইনি ক্ষমতা ইমিগ্রেশনের নেই। ধারণা করা হচ্ছে, আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের পর নতুন প্রশাসন তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এই ভয় থেকেই তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। গোটাবায়ার আরেক ভাই, সাবেক অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাকসেও দেশে ছেড়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। যাত্রী ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের বাধায় এর আগে একদফা তার বিদেশযাত্রা আটকে গিয়েছিল। এদিকে গোটাবায়ার দেশ ছেড়ে পালানোতে নয়া দিল্লি সহায়তা করেছে বলে যে গুঞ্জন উঠেছে, তাকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে শ্রীলংকার ভারতীয় হাইকমিশন। খবর বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসমুদ্র সৈকত দেখা হলো না দুই বন্ধুর
পরবর্তী নিবন্ধমইজ্জ্যারটেকে তিন যুবককে ছুরিকাঘাত