সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে সব সেবা সংস্থাকে

আজাদী প্রতিবেদন | শুক্রবার , ১৭ জুন, ২০২২ at ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপি চট্টগ্রামের সব সেবা সংস্থাগুলোকে একই কাতারে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সব ধরনের ইগোর উর্ধে উঠে ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে দেশের স্বার্থ এবং মাটির স্বার্থকে গুরুত্ব দিলে উন্নয়ন অনেক বেশি ত্বরান্বিত হবে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার মাস্টারপ্ল্যান (২০২০-২০৪১) প্রণয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক প্রতিবেদন উপস্থাপনা এবং প্রকল্পের সামগ্রিক বিষয়ের উপর আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের সকল সেবা সংস্থাকে একই টেবিলে বসানোর মাধ্যমে সমন্বয়ের সূচনা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে এর জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষকে ধন্যবাদ জানান।
শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে বলেন, এই অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কারিগরি সক্ষমতায় রূপান্তরের জন্য এবং সেটাকে প্রয়োগ করার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের স্টেকহোল্ডার যারা আছেন তারা সবাই যদি নিয়মিত একই সাথে বসে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করেন তাহলে সকল সমস্যারই সমাধান হয়ে যেতো। এখানকার সব সমস্যাই সমাধানযোগ্য বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সকল সংস্থাকে নিয়ে ও তাদের সাথে সমন্বয় সাধন করে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন অনেক বেশি কার্যকরী হবে। তিনি মাস্টারপ্ল্যানের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি টেকসই মহানগরীতে পরিণত করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দেখে আসছেন মন্তব্য করে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, আমরা যখন যে প্রতিষ্ঠানে থাকি সেখানে নিজেকে শ্রেয় মনে করি, অন্যজনের ছায়াও মাড়াতে চাই না। প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের মনে করা হয়। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান যে দেশের সেটি ভুলে যাই। ব্যক্তি পর্যায়ের এমন মানসিকতা উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এম. আবদুল লতিফ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ কাজী হাসান বিন শামস। বক্তব্য রাখেন প্রকল্প পরিচালক এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনছারী, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের টিম-লিডার ড. আহসানুল কবির।
প্রধান অতিথি ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমরা দেখেছি। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্য ১৬শ’ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্রেন পরিষ্কারে কেউ কোনোদিন হাতই দেয়নি। জিজ্ঞেস করলে বলা হতো অমুক সংস্থা জলাবদ্ধতার কাজ করতেছে, তাই আমরা করবো না। সংস্থা থেকে সংস্থার আড়ি নেয়ার এই দুরবস্থা চট্টগ্রামের মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বতন স্থপতি গোলাম রাব্বানী এবং চউকের জি আই এস এনালিস্ট জিহান ইব্রাহীমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বন্দর পতেঙ্গা আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য এম এ লতিফ এমপি চট্টগ্রামের উন্নয়নে এখানকার সকল সেবা সংস্থা দায়বদ্ধ বলে উল্লেখ করে বলেন, পৃথক পৃথক মাস্টারপ্ল্যান নয়, এমন একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা উচিত যেটি সকল সেবা সংস্থাই অনুসরণ করবে। তিনি নগরজুড়ে বেহাল অবস্থা তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, অনেক আইন রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগের অভাবে শহর ক্রমে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। তিনি নগরজুড়ে পাহাড়কাটা এবং পলিথিনের দৌরাত্ম্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, শহরের অসংখ্য খাল নালা দখল করে বড় বড় বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, যথোপযুগী আইন প্রণয়নের অভাবে পূর্বের মাস্টার প্ল্যানগুলো সঠিকভাবে প্রণয়ন করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়। তিনি এবারের মাস্টার প্ল্যানে বিজ্ঞানসম্মত ড্রেজিং ব্যবস্থা ও আধুনিক বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
সভায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, চলমান মাস্টার প্ল্যানে চট্টগ্রাম শহরের অবস্থিত পাহাড় সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি চট্টগ্রাম শহরের রিমোট এলাকায় বাস টার্মিনাল ট্রাক টার্মিনাল স্থাপন এবং আবর্জনা স্তুপীকরণের নিমিত্ত নতুন জোন রাখার প্রস্তাব করেন। এছাড়াও রাস্তার পাশে অপরিকল্পিতভাবে ইমারত নির্মাণ রোধ করার প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রদানের সাথে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকেও যুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, সিটি কর্পোরেশন মাঠে থাকে। কেউ অন্যায়ভাবে ভবন নির্মাণ করার উদ্যোগ নিলে কর্পোরেশন তা বন্ধ করে দিতে পারবে। তিনি পাহাড় কাটার ব্যাপারে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, পাহাড়ের মাটি শুধু নালা নর্দমাই নয়, দেশের লাইফ লাইন কর্ণফুলীকে শেষ করে দিচ্ছে। তিনি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একাত্ম থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।
সভায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকাকে একটি সুপরিকল্পিত এলাকা হিসাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সিডিএর এই মাস্টারপ্ল্যান অত্যাবশ্যক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মাস্টার প্ল্যান একটি চলমান প্রক্রিয়া যা জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে সবার সাথে সমন্বয় করে প্রতিনিয়ত যুগোপযোগী উন্নয়নকে সুনিশ্চিত করে। এছাড়াও তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা যেমন, ডেল্টা প্ল্যান-২১০০, রূপকল্প-২০৪১ ইত্যাদি অনুসরণের মাধ্যমে চলমান মাস্টার প্ল্যানে বিভিন্ন স্থানভিত্তিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। পরিশেষে তিনি একটি গ্রহণযোগ্য মাস্টার প্ল্যান সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার প্রত্যেকটি সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং জনসাধারণকে উদার অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
সভার শুরুতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ কাজী হাসান বিন শামস স্বাগত বক্তব্যে বলেন, চট্টগ্রাম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ যতবেশি নিশ্চিত করা হবে ততবেশি মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর হবে। তিনি চট্টগ্রামের স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্তার উপরও গুরুত্বারোপ করেন। চট্টগ্রাম মহানগরীকে একটি বিশ্বমানের আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সিডিএ এই মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করছে। এটি যথাযথভাবে প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে চট্টগ্রাম পুরো দেশ তথা বিশ্বের বুকে একটি মডেল শহর হিসেবে গড়ে উঠবে। তিনি বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ধারাকে আরও সমুন্নত করতে সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে মাস্টারপ্ল্যানকে একটি আদর্শ গাইডলাইন হিসাবে আখ্যায়িত করেন। পূর্বের মাষ্টারপ্ল্যান হতে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে জনবান্ধব মাষ্টারপ্ল্যান তৈরি করার উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রকল্প পরিচালক এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনছারী মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য একটি যুগোপযোগী, আধুনিক এবং বাস্তবস্মমত নতুন মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি এই মাস্টাার প্ল্যান বাস্তবায়নে সকলের সহায়তা কামনা করে।
উল্লেখ্য, ৩৩ কোটি ৩২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর নতুন মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। গতবছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আগামী ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্প মেয়াদের মধ্যে এই মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকেন্দ্রের ২০০ গজ পরিধির মধ্যে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ
পরবর্তী নিবন্ধছয় শূন্যের ইনিংসে সংগ্রহ ১০৩ সাকিবের লড়াকু ফিফটি