দুই ভাইকে খুন করে কখনো বাবুর্চি, কখনো দারোয়ান

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ২৯ জানুয়ারি, ২০২২ at ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ

২০০১ সালের ৯ নভেম্বর ছোট ভাইকে খুন করে সৈয়দ আহম্মেদ ও তার সহযোগীরা। মামলাটির যাবতীয় খরচ দিচ্ছিলেন বড় ভাই। এ জন্য ২০০২ সালের ৩০ মার্চ তাকেও খুন করা হয়। দুই ভাইকে চার মাসের ব্যবধানে একই কায়দায় খুন করে পালিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কখনো বিভিন্ন মাজারে বাবুর্চির কাজ করেছেন। কখনো করতেন বাড়ির দারোয়ানের কাজ। অবশেষে র‌্যাব৭ এর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ধরা পড়লেন এই খুনি। গত বৃহস্পতিবার (২৭ জানুয়ারি) রাতে তাকে নগরীর আকবর শাহ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার সৈয়দ আহম্মেদ (৬০) লোহাগাড়া থানার আমিরাবাদ এলাকার মৃত ইয়াকুব মিয়ার ছেলে।

র‌্যাব জানায়, ২০০২ সালের ৩০ মার্চ লোহাগাড়ার ব্যবসায়ী জানে আলমকে হত্যা করা হয়েছিলো তার শিশু সন্তানের সামনেই। প্রথমে তাকে লাঠিসোঁটা, দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। পরে গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এ ঘটনায় ওইদিনই লোহাগাড়া থানায় জানে আলমের বড় সন্তান তজবিরুল আলম বাদী হয়ে ২১ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় অন্যতম আসামি ছিল সৈয়দ আহমদ। বিচার শেষে আদালত এই মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।

এই ঘটনার চার মাস আগে ২০০১ সালের ৯ নভেম্বর খুন হওয়া জানে আলমের আপন ছোট ভাইকে একইভাবে লাঠিসোঁটা, দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের পর গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এ ঘটনায়ও লোহাগাড়া থানায় ১৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল। ওই মামলায় সৈয়দ আহমদ দুই নম্বর আসামি ছিলেন। এ মামলার রায়

হবে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে। ব্যবসায়ী জানে আলম আপন ছোট ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন।

ছোট ভাইকে হত্যার পর বড় ভাই জানে আলমকে হত্যার কারণ হিসেবে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে সৈয়দ আহমদ জানায়, মূলত জানে আলম, পরিবারের বড় ছেলে এবং আর্থিকভাবেও কিছুটা সচ্ছলও ছিলেন। তাই মামলার ব্যয়ভার তিনি বহন করতেন। এতে প্রতিপক্ষের আক্রোশ তার ওপর দিন দিন বেড়ে যায়। প্রতিপক্ষের ধারণা ছিল যে, ব্যবসায়ী জানে আলকে হত্যা করলে ওই পরিবারে মামলা চালানোর মতো কোনো লোক থাকবে না এবং প্রত্যক্ষভাবে আর কোনো সাক্ষীও থাকবে না। আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তাদের সব সম্পত্তি সহজে তারা গ্রাস করতে পারবে। এ ভাবনা থেকে ঘাতক চক্র প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যবসায়ী জানে আলমকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করে।

র‌্যাব জানায়, প্রথম হতাকান্ডের পর সৈয়দ আহম্মেদ বাঁশখালীর বিভিন্ন ডাকাত দলের সঙ্গে সমুদ্র পাড়ি দেয়। সেখান থেকে এসে ৪ মাস পরে আবার ব্যবসায়ী জানে আলমকে হত্যা করে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে থাকে। হত্যার পর থেকে কোনো ধরনের মোবাইল ব্যবহার করত না সৈয়দ আহমেদ। নিজের নাম পরিবর্তন করে দুটি আইডি কার্ড তৈরি করেন তিনি। ২০ বছরে ধরে পরিবারপরিজন ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। কখনো বাঁশখালী, আনোয়ারা, কখনো কুতুবদিয়া, পেকুয়ার উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় পলাতক ছিলেন এই সৈয়দ আহমদ। পরবর্তীতে সীতাকুণ্ড এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া ঠিকানা প্রদান করে অবস্থান করতে থাকে সে। এছাড়াও জঙ্গল ছলিমপুর এলাকার মশিউরের ছত্রছায়ায় ও সহযোগীতায় সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে। কিন্ত পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানের কারণে সেখানে সে নিজেকে নিরাপদ মনে না করে পুনরায় চট্টগ্রামে বিভিন্ন মাজারে বাবুর্চির কাজ শুরু করে ছদ্মবেশ ধারণ করে। এরপর আকবর শাহ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় দারোয়ানের কাজ নেয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে র‌্যাব বৃহস্পতিবার রাতে আকবর শাহ এলাকা থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করে।

র‌্যাব৭ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক নুরুল আবছার এ বিষয়ে বলেন, দুই ভাইকে হত্যা করে সৈয়দ আহমদ ২০ বছর ধরে পলাতক ছিলেন। ব্যবসায়ী জানে আলম হত্যা মামলার রায়ে আদালত ২০০৭ সালের ২৪ জুলাই ১২ জনকে ফাঁসি এবং ৮ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করেন। রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে সৈয়দ আহম্মেদসহ মোট ১০ জনকে মৃত্যুদন্ড ও ২ জনকে যাবজ্জীবন দেন। আকবর শাহ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে আকবর শাহ থানাতেই হস্তান্তর করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধর‌্যাব এখন আস্থার প্রতীক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধশিক্ষাক্রমে যোগ হবে স্বাস্থ্যশিক্ষা : শিক্ষামন্ত্রী