হিসাব স্বচ্ছ হলে রাজস্ব ও কর নিয়ে ভয় নেই

চট্টগ্রামে প্রাক বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান ।। পণ্য খালাসে জটিলতা কমানোর আহ্বান ব্যবসায়ী নেতাদের

আজাদী প্রতিবেদন | শুক্রবার , ১২ মার্চ, ২০২১ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ

আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত মামলাসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চট্টগ্রামে হাইকোর্টের পৃথক বেঞ্চ স্থাপন, অর্থডক্স বা নিবিড় পরিদর্শন বাতিল এবং আয়কর অধ্যাদেশের ৫২ ধারায় স্থানীয় উৎপাদকদের অগ্রিম কর থেকে অব্যাহতি প্রদানসহ ২০ দফা বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। গতকাল দুপুরে নগরীর আগ্রাবাদ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বঙ্গবন্ধু কনফারেন্স হলে চট্টগ্রাম চেম্বার আয়োজিত আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।
তিনি বলেন, হিসাব স্বচ্ছ হলে রাজস্ব, কর নিয়ে ভয় নেই। অডিট রিপোর্টের জন্য আমরা অ্যাপস ডেভেলপ করেছি। অনলাইন ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ডিভিএস) সফটওয়্যার ছাড়া আমরা আর অডিট রিপোর্ট নেবো না। সফটওয়্যারে অডিটের ডাটা ইনপুট দিলে কোড নম্বর আসবে। নম্বর ছাড়া আমরা অডিট রিপোর্ট গ্রহণ করব না। কমপ্লায়েন্সের মধ্যে আসতে হবে। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু পণ্যে আমদানি পর্যায়ে বেশি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে রাজস্ব আদায় কিন্তু মূল বিবেচ্য বিষয় নয়। আমরা কি সব সময় ভারত ও মিয়ানমারের পেঁয়াজের ওপর নির্ভরশীল থাকব? স্বনির্ভরতা অর্জন করব না? যদি অন্যের ওপর নির্ভর করি তাহলে ফুড সেফটি থাকবে? দেশের কৃষক যদি না বাঁচে তাহলে তারা খাদ্য উৎপাদন করবে না। অন্যদিকে রপ্তানির ক্ষেত্রে লোহার গুড়ো, প্লাস্টিক বোতল অথবা মাছের আঁশ রপ্তানিতে বেশি কর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কারণ সরকার চায়- এসব প্রোডাক্ট দেশেই রিসাইকেল হোক। এসব পণ্য দিয়ে দেশীয় শিল্প গড়ে উঠুক। তিনি আরো বলেন, কক্সবাজারের একজন বললেন- ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল সল্ট সোডিয়াম সালফেট ঘোষণায় সোডিয়াম ক্লোরাইড নিয়ে আসা হচ্ছে। এতে দেশের লবণ চাষিরা লোকসান দিচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের মাথায় আছে। তবে সোডিয়াম সালফেট আমদানি সীমিত করতে শিল্প মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে। লবণ চাষিদের রক্ষায় সেভাবে ইমপোর্ট পারমিট দিতে হবে। অপর একজন বললেন- পোড়া মবিল আমদানি কথা। আমি এক সময় পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের থাকার সময় আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারণ পোড়া মবিল গাড়ির যন্ত্র, পরিবেশ নষ্ট করে। সারা বিশ্বের ব্যবহৃত লুবের ডাম্পিং জোন কেন বাংলাদেশ হবে?
স্বাগত বক্তব্যে চেম্বার সভাপতি মাহাবুবুল আলম বলেন, এনবিআর চেয়ারম্যান ডায়নামিক, নিরহংকারী ও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে দেশের উন্নতির জন্য কাজ করে চলেছেন। করোনাকালেও তিনি আমাদের প্রস্তাবনা শুনতে এসেছেন, এর জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। আশা করি তিনি ব্যবসায়ীদের দাবি ও প্রস্তাবনা মূল্যায়ন করবেন।
চেম্বার সভাপতি বাজেট প্রস্তাবনা সময় আয়কর অধ্যাদেশ, কর, অর্থ সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন, লোকাল এলসি, ভোগ্যপণ্য আমদানি, উৎসে কর, শিল্পগ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো গ্রুপকে ঋণ খেলাপি করা, ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর দ্রুত ফেরত, গাড়ির ট্যাক্স টোকেন, করোনাকালে ব্যবসা না হওয়ায় জরিমানা বাতিল, ডেলিভারিতে বন্দরের আনুষ্ঠানিক জটিলতা কমানো, এইচএস কোড বাড়ানো ইত্যাদি বিষয়ে প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (অর্থ) মো. কামরুল আমিন বলেন, বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে। আমরা সর্বোচ্চ সেবা দিতে চেষ্টা করছি। ৯ হাজার টিইইউস পণ্য নিলামের অপেক্ষায় আছে। এগুলো দ্রুত নিলাম করলে বন্দরে জট কমবে। রপ্তানি কন্টেনারের জন্য চারটি স্ক্যানার বসানোর কথা। আইএসপিএস কোড কমপ্লায়েন্সের জন্য এটি দরকার।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু বলেন, কাস্টম হাউসে জনবলের অভাব রয়েছে। পরীক্ষাগারে কেমিস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি আবু মোরশেদ খোকা বলেন, লবণের দাম কম হওয়ায় কৃষক মাঠমুখী হচ্ছে না। শিল্পের নামে লবণ আমদানি করে বাজার সয়লাব করছে। হাইজিন ড্রাই ফিশ তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে।
রিহ্যাব চট্টগ্রাম সভাপতি আবদুল কৈয়ুম চৌধুরী বলেন, ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল চাই স্বল্প সুদে সাধারণ মানুষের বাসস্থানের জন্য। কালো টাকা, অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রাখা দরকার, নয়তো লন্ডন, মালয়েশিয়ার মতো সেকেন্ড হোমে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ববাজারে ভয়াবহ জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত পণ্যে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন দেশ লকডাউন প্রত্যাহার করায় কাঁচামালের চাহিদা বেড়েছে। এনবিআরের দায়িত্ব যারা ভ্যাট ট্যাক্স দিচ্ছে তাদের ফ্যাসিলেট ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা। নির্মাণ শিল্পের উপকরণের দাম বাড়ছে।
বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, বিশ্বজুড়ে লাভ লোকসানের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হয়। বেসিক ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ কেটে নেওয়া হচ্ছে। কোনো নোটিশ, সার্কুলার ছাড়াই কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কর নেয়। আমরা চাই অসম প্রতিযোগিতা দূর হোক। এআইটি ফেরত বা সমন্বয়ে গড়িমসি দূর করতে হবে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম আকতার হোসেন বলেন, খাদ্যশস্য আমদানিতে জটিলতা নিরসন করতে হবে। আমরা হ্যাসেল ফ্রি বাজেট চাই। কনটেইনার মুক্ত বন্দর, কাস্টমসের দ্রুত শুল্কায়ন চাই।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, বান্দরবান চেম্বারের অমল কান্তি দাশ, চিটাগাং উইম্যান চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবিদা মোস্তফা, রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আবদুল ওয়াদুদ, টেরী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান, বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাকসুদুর রহমানসহ প্রমুখ।
মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভা : এদিকে আমদানি সমমানের পণ্য উৎপাদনকারী স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা করতে বিশেষ সুযোগসহ বহুমুখী নীতি সহায়তা এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের বর্তমান ল্যাবকে বিলুপ্ত করে নতুন ল্যাব স্থাপন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, মানসম্মত আসবাবপত্র ও দক্ষ জনবল নিয়োগ করে সমস্যা সমাধানে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দসহ ১১ দফা বাজেট প্রস্তাবনা দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিএমসিসিআই) মিলনায়তনে আয়োজিত আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।
তিনি বলেন, দেশের আমদানি-রপ্তনিতে চট্টগ্রাম বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই এই অঞ্চল থেকে রাজস্ব আয়ের সুযোগটাও বেশি। তবে রাজস্ব বা ট্যাক্স যেন মানুষের উপর জুলুম হয়ে না যায় সেটিও আমাদের বিবেচনা করতে হয়।
মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্যে সিএমসিসিআই সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, আসন্ন বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তনি বিলের ওপর উৎসে কর কর্তনের বর্তমান হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগের মতো শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ করতে হবে। এছাড়া এ শিল্পের ক্ষেত্রে কর্তনকৃত অগ্রিম আয়কর যেহেতু চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করা হয়, সেহেতু এ শিল্পের কর নথি নিরীক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু নগদ লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান তার কর পরবর্তী মুনাফা থেকে উক্ত লভ্যাংশ দিয়ে থাকে সেহেতু উক্ত লভ্যাংশের ওপর আবার করারোপ আইনসঙ্গত নয় বা করের বোঝা চাপানোর নামান্তর এবং একই বছর একই আয়ের ওপর দ্বৈত করারোপের শামিল। তাই ব্যাক্তি খাত ও কোম্পানি খাতে নগদ লভ্যাংশ প্রাপ্তিকে কর অব্যাহতি আয় হিসেবে গণ্য করতে হবে।
সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেল সিএমসিসিআই সহ-সভাপতি আবদুস সালাম, জসিম উদ্দিন চৌধুরী, পরিচালক আমিনুজ্জামান ভূঁইয়া, লিয়াকত আলী চৌধুরী, আমির আলী হোসেন, অজিত দাশ এবং পিএইচপি অটো মোবাইলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আক্তার পারভেজ চৌধুরী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন এনবিআর সদস্য মো. আলমগীর হোসেন, সৈয়দ গোলাম কিবরীয়া ও মো. মাসুদ সাদিক, চট্টগ্রামের বিভিন্ন দফতরের কমিশনার সৈয়দ মোহাম্মদ আবু দাউদ, এমএম ফজলুল হক, গোলাম মো. মুনীর, মো. মাহবুবুজ্জামান, মো. হেলাল উদ্দিন সিকদার, একেএম হাসানুজ্জামান, মোহাম্মদ ফখরুল আলম, একেএম. মাহবুবুর রহমান, মো. আকবর হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসীতাকুণ্ডে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, মহাসড়ক অবরোধ
পরবর্তী নিবন্ধউৎপাদন খরচ ৭ টাকা বিক্রি ৪ টাকায়