৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল গেল কোথায়

গোদনাইল ডিপো থেকে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে নেওয়ার পথে কোটি টাকার ৪ লরি তেল উধাও । তদন্ত কমিটি, প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ডিপোর ইনচার্জকে বদলি

হাসান আকবর | সোমবার , ১৬ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ

দেশে জ্বালানি তেলের বর্তমান পরিস্থিতির মাঝে পদ্মা অয়েল কোম্পানির প্রায় এক কোটি টাকা দামের জেট ফুয়েল গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের গোদলাইল ডিপো থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে নেওয়ার পথে বিমানের জ্বালানি তেলগুলো গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে। ১১ মার্চ গোদনাইল ডিপো থেকে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর উদ্দেশ্যে পাঠানো চারটি ট্যাংক লরিভর্তি ৭২ হাজার লিটার বিমানের জ্বালানি তেল রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে। অথচ ওই তেল ডিপোতে গ্রহণ করা হয়েছেএমন ভুয়া রেকর্ড তৈরি করে হিসাব সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রায় ৮১ লাখ টাকা মূল্যের এ জ্বালানি তেল বাইরে বিক্রি করে একটি সিন্ডিকেট ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ইনচার্জ সাইদুল হককে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়েছে।

পদ্মা অয়েল সূত্রে জানা গেছে, ১১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে পৃথক চালানে মোট ১৭৭টি ট্যাংক লরিতে বিমানের জ্বালানি তেল ঢাকার কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ট্যাংক লরি ডিপো এলাকায় প্রবেশের আগে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের এডিসি মেইন গেটে এবং পরে পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর নিজস্ব গেটে পৃথক দুটি রেজিস্ট্রারে গাড়ির নম্বর লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু সেদিন ১৭৭টি ট্যাংক লরির মধ্যে ১৭৩টি ডিপোতে প্রবেশের প্রমাণ মিললেও চারটি ট্যাংক লরির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৮ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার চট্ট মেট্রো৪১৭০০, ঢাকা৪২০২৫২, ঢাকা মেট্রো৪১০৬৪৯ এবং ঢাকা মেট্রো৪১০৬৯৮ নম্বরের চারটি ট্যাংক লরি গোদনাইল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে বের হলেও সেগুলো কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে পৌঁছায়নি। তবু ডিপোর রেজিস্ট্রারে সন্ধ্যা ৭টা ২৫, ৭টা ২৭, ৭টা ২৮ ও ৭টা ২৯ মিনিটে ওই চারটি ট্যাংক লরি প্রবেশ করেছেএমন ভুয়া এন্ট্রি করা হয় এবং পরে ৭২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল গ্রহণ করা হয়েছে বলে হিসাব সম্পন্ন করা হয়।

পদ্মা অয়েল কোম্পানির কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর রেজিস্ট্রারে ট্যাংক লরি চারটি প্রবেশের রেকর্ড তৈরি করা হলেও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের এডিসি মেইন গেটের প্রবেশ রেজিস্ট্রারে ওই চারটি ট্যাংক লরির কোনো তথ্য নেই। একইভাবে গেটের সিসিটিভি ফুটেজেও সেগুলোর প্রবেশের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর সিসিটিভি ফুটেজেও একই অবস্থা দেখা গেছে। অথচ ডিপোর গেট রেজিস্ট্রারে সেগুলো প্রবেশ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা ডিপোর ভেতরের কিছু কর্মকর্তাকর্মচারীর সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া ঘটা সম্ভব নয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ইনচার্জ ম্যানেজার (অপারেশন্স) সাইদুল হক, চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা মো. সামির উদ্দিন, চেকার মো. আকতার কামাল (৩৪২৩), ট্যাংক ডিপার মো. ইসমাঈল (৩৫৭২), আকতার কামালের ভাতিজা ক্যাজুয়েল শ্রমিক মো. তানিম এবং ইসমাঈলের ছোট ভাই ক্যাজুয়েল শ্রমিক মো. হাসান জড়িত। অভিযোগকারীদের দাবি, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এবং প্রভাব খাটিয়ে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পাচারের অভিযোগে এর আগেও তদন্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ১৭ ফেব্রুয়ারি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তদন্তে কিছু অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলেও পরে প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনার পরই আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ১১ মার্চের এই আত্মসাতের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

পদ্মা অয়েলের অভ্যন্তরীণ নথি ঘেঁটে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি ২৭ জন কর্মকর্তাকর্মচারীর বদলি আদেশ জারি করে। এর মধ্যে ২৫ জনের বদলি কার্যকর হলেও চেকার আকতার কামাল ও ট্যাংক ডিপার ইসমাঈলের বদলি এখনো কার্যকর হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ২৬ বছর ধরে একই স্থানে কর্মরত থাকায় তাদের শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন একই স্থানে থাকার সুযোগে ডিপোর ভেতরে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা জ্বালানি তেল সরবরাহ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো একটি সংবেদনশীল কেপিআই স্থাপনা। এখান থেকে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জ্বালানি তেল পাচারের অভিযোগ উদ্বেগজনক। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনা রাষ্ট্রীয় সম্পদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর মতো সংবেদনশীল স্থাপনা থেকে প্রত্যাহার এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ঘটনা তদন্তে পদ্মা অয়েল কোম্পানির উপমহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) শফিউল আজমকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন ব্যবস্থাপক (পরিচালন) পেয়ার আহমেদ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মকর্তা কে এম আবদুর রহিম। কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা গত দুদিন ধরে অনুসন্ধান করে চার ট্যাংক লরিভর্তি জেট ফুয়েল গায়েব করার ঘটনা উদ্‌ঘাটন করছেন। কমিটি প্রায় কোটি টাকার জেট ফুয়েল গায়েব করে দেওয়ার ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে। ঘটনার প্রেক্ষিতে সাইদুল হককে ঢাকা বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে বদলি করা হয়েছে। অবশ্য ওখানে এখনো পদ্মা অয়েল কোম্পানির কোনো কার্যক্রম নেই।

গায়েব করা জেট ফুয়েল কোথায় ব্যবহার করা হতে পারে প্রশ্ন করা হলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, এগুলো কোনো ফিলিং স্টেশনে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এসব জেট ফুয়েল অকটেনের সাথে মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১০০ টাকা হলেও অকটেনের সাথে মিশিয়ে সেগুলো ১২০ টাকা করে বিক্রি করা হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রস্তাবের নিন্দা
পরবর্তী নিবন্ধগণভোটের রায় বাস্তবায়নের আগে সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী