‘৬২ ও ’৬৪–র ছাত্র আন্দোলন এবং ’৬৬–র ছয় দফা আন্দোলনে ছাত্রনেতাদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার–নির্যাতন ও ধরপাকড়ের স্টিম রোলার নেমে আসে। পুলিশ ছাত্রনেতাদের ধরে জেলে চালান দিত, পরে আদালতে আনা হলে আইনজীবীরা তাদের জামিন নিয়ে মুক্ত করে আনতেন। তখন আইয়ুবের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের মাঠের লড়াইটা আদালতের আঙিনায় এসে আইনজীবীদের লড়াইয়ে পরিণত হয়।
এ সময় যারা গ্রেফতার হতো, তাদেরকে জামিনে মুক্ত করিয়ে আনতে গিয়ে রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতৃবৃন্দকে হিমশিম খেয়ে যেতে হতো। ছাত্র রাজবন্দীদের মামলা নেয়ার জন্য আইনজীবী পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছিলো। এমনি সময়ে ব্যারিস্টার মিল্কী আরো কয়েকজন আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে ছাত্র–রাজবন্দীদের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রার্থী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলীর জিন্নাহর ভগ্নি ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামে মহল্লায় নির্বাচনী প্রচার সভা জমজমাটভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শাসকগোষ্ঠী বিরোধীদলের প্রচার কর্মীদের নানাভাবে হয়রানির উদ্দেশ্যে জেল ও গ্রেপ্তারির পথ বেছে নিয়েছিলো। ষাটের দশকে ছাত্রনেতা, বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিনের জন্য আওয়ামী লীগ সমর্থক সমস্ত আইনজীবী যে চেষ্টা করতেন তা নয়। তারা করতেন, তাদের নাম আমরা ওপরে দেখলাম। কিন্তু তাঁরা ছাড়াও আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবী ছিলেন। ভয়ে সবাই দলীয় নেতাকর্মীদের জামিন নিতে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে ইতস্তত করতেন।
এখানে দেখা যাচ্ছে জামিনের জন্য যেসব আওয়ামী সমর্থক আইনজীবী সবচেয়ে বেশি তৎপর ছিলেন, তাদের বেশ অগ্রভাগেই ছিলেন অ্যাডভোকেট বদিউল আলম। তিনি কোন এক সময় পটিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং দক্ষিণ মহকুমা আওয়ামী লীগেরও সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। কিন্তু ’৭০–এর নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর মনোনয়নের সময় অ্যাডভোকেট বদিউল আলমের নাম বিবেচনা করা হয়নি। অবিভক্ত পটিয়ার ফতেনগর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন তিনি। পটিয়ায় জাতীয় পরিষদে অধ্যাপক অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয়া হয়। দক্ষিণ পটিয়া ও সাতকানিয়ার উত্তর অংশ নিয়ে গঠিত প্রাদেশিক পরিষদে অ্যাডভোকেট বদিউল আলমকে মনোনয়ন দানের সুযোগ ছিল। কিন্তু সেখানে মনোনয়ন দেয়া হয় ডা. বি এম ফয়েজুর রহমানকে। এতে অ্যাডভোকেট বদিউল আলমের প্রতি ন্যায় বিচার করা হয়নি। আইয়ুবের দুঃশাসনের সময় বিপদ ও ঝুঁকি মাথায় নিয়ে যে দলের জন্য তিনি কাজ করেছেন, সেই দলের কাছ থেকে যখন কিছু পাওয়ার সময় এসেছিল, তখন তিনি বঞ্চনার শিকার হন। এ কারণেই হয়ত স্বাধীনতার পর তিনি জাসদে যোগ দিয়েছিলেন। আমরা যেমন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে নবগঠিত জাসদে যোগদান করেছিলাম, অ্যাডভোকেট বদিউল আলমও তেমনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে জাসদের পতাকা হাতে তুলে নিয়েছিলেন। এটা আমার অনুমান, সত্য নাও হতে পারে। পটিয়ার পশ্চিম অংশ নিয়ে গঠিত পটিয়ার অপর প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য আসনে সুলতান আহমদ কুসুমপুরীকে মনোনয়ন দেয়া হলে সেটা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিলো। আগরতলা মামলার আসামী মানিক চৌধুরী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন এমন ধারণা পোষণ করার লোকের অভাব ছিলো না।
এডভোকেট বদিউল আলমকে জাসদ থেকে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের সংসদ নির্বাচনে পটিয়া থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া তাঁকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাসদের সভাপতির দায়িত্বও প্রদান করা হয়। তখনও পটিয়া অবিভক্ত ছিল, পটিয়া ভাগ হয় আরও অনেক পরে। আমরা দিন–রাত অ্যাডভোকেট বদিউল আলমের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলাম।
’৭৫–এ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমি বোয়ালখালী থানার বেঙ্গুরা স্টেশন থেকে গ্রেফতার হয়ে যাই এবং চট্টগ্রাম জেলে প্রায় তিন বছর কারা নিগ্রহ ভোগ করি। কিছুদিন পর বদিউল আলম সাহেবও একদিন জেলখানায় পৌঁছে যান। তাঁকে কোন কারণে গ্রেফতার করা হয়েছিল, হয়ত জাসদ করার কারণেই। জেলখানায় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয় এবং তখন খুব তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভের আরেকবার সুযোগ হয়। তিনি বেশিদিন জেলে ছিলেন না, তাঁর ন্যায় একজন ডাকসাঁইটে আইনজীবীকে বেশিদিন কারাবন্দী করে রাখা যায় না। আমাকে যখন মামলার হাজিরার জন্য আদালতে হাজির করা হতো, তখন বদিউল আলম সাহেব আমাকে আদালত কক্ষে দেখতে আসতেন এবং আমার মুক্তির বিষয়ে কথাবার্তা বলতেন। তাঁর পক্ষে কিছু করার সম্ভব হলে তিনি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাকে আটক করা হয়েছিল ডিটেনশানে, অর্থাৎ আমার বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পুলিশ আনতে পারেনি এবং সেজন্য সুনির্দিষ্ট মামলাও দিতে পারেনি অর্থাৎ বিনা বিচারে আটক। সুতরাং জামিন নেওয়া সম্ভব ছিল না। যেহেতু আমি রাজবন্দী ছিলাম, সেহেতু একমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনাতেই আমি মুক্তি হতে পারতাম। কিন্তু তৎকালীন সরকার আমার জন্য সে বিবেচনা করতে প্রস্তুত ছিল না।
জেল থেকে বের হওয়ার পর অ্যাডভোকেট বদিউল আলমের সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করি। পরে আমি আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ি। ’৮৬ খ্রিস্টাব্দে পূর্বকোণ বের হওয়ার পর আমি সেই পত্রিকায় যোগদান করলে অ্যাডভোকেট বদিউল আলমের সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয়। তখন তিনি পত্র–পত্রিকায় কলাম লিখতেন। পূর্বকোণেও আমার সঙ্গে তাঁর নতুন করে যোগাযোগ হলো, সেটা ঐ লেখালেখির কারণে। ততদিনে আমার বন্ধু অ্যাডভোকেট মৃদুল গুহ তাঁর জুনিয়র হিসেবে আইন পেশা আরম্ভ করে তাঁর চেম্বারে প্রতিদিন যাতায়াত শুরু করেছিলেন। মৃদুল গুহ কবি এবং ভাল লেখক ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। আবার ডিসি হিল কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও একজন সংগঠক ছিলেন। ডিসি হিলে ১১ জ্যৈষ্ঠ আমরা যে নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানের আয়োজন করতাম, মৃদুল গুহ ছিলেন তাঁর আহবায়ক।
অ্যাডভোকেট বদিউল আলম আমার প্রতি খুবই স্নেহ পরায়ণ ছিলেন। তার একটা কারণ হয়ত এই ছিল যে, আমি বয়সে অনেক ছোট হয়েও বড় বড় কাজে যুক্ত থাকতাম এবং সেজন্য আমাকে প্রাণান্ত পরিশ্রমে ঘর্মাক্ত কলেবর হতে তিনি বারবার দেখেছেন। কিন্তু আমরা হলাম এমন এক অস্থির, অশান্ত ও জ্বলন্ত সময়ের গনগনে আগুনে পোড়া প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাঁদেরকে পোষ মানানো কঠিন ছিল। আমাদের ভালো চিন্তা করে মুরুব্বিরা যা বলতেন, তাতেও আমরা বিরক্ত হয়ে যেতাম। আমার পিতা নুর মুহম্মদ চৌধুরী সাহিত্যরত্ন, আমার চাচা শিল্পপতি নুর মোহাম্মদ চৌধুরী এবং আমার পরম আত্মীয় অ্যাডভোকেট বদিউল আলমের উপদেশ আমি শুনতে চাইনি। ফল হল এই আমার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে গেল। এডভোকেট বদিউল আলমের খালু শ্বশুর গোলাম রহমান চৌধুরী জজ সাহেবের কন্যার সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন আমার মামা চিকিৎসা বিজ্ঞানী মোহাম্মদপুরের খাজা বংশের কৃতিপুরুষ ড. কে এম ফরিদউদ্দিন।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং প্রথিতযশা আইনজীবী অ্যাডভোকেট বদিউল আলম ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুন চন্দনাইশ থানার ফতেনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জলিলুর রহমান ও মাতা শরীফুন্নেছা। বদিউল আলম পিতা–মাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁর কনিষ্ঠ তিন সহোদরের নাম রুহুল আমিন, সিদ্দিক আহমদ ও নুরুল আমিন। একমাত্র বোন চেমন খাতুন।
তিনি প্রথমে কাস্টমসে চাকরি করতেন। সেসময় পাকিস্তান কেন্দ্রিয় আবগারি ও শুল্ক বিভাগে পরিদর্শক পদে লোক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন এবং ইন্টারভিউতে পাস করে নিয়োগপত্র পেয়ে চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে বদিউল আলম আনোয়ারা থানার পিরখাইন গ্রামের সিকদার পরিবারে আকতার কামাল চৌধুরী, যিনি পরে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে এমএলএ নির্বাচিত হন, তাঁর বোনকে বিয়ে করেন। কাস্টমসের চাকরিতে বেনাপোলে কাজ করার সময় তাঁর খালু শ্বশুর খন্দকিয়ার প্রবাদপ্রতিম জেলা জজ গোলাম রহমান চৌধুরী তাঁকে বলেছিলেন চাকরি ছেড়ে ল’ পড়ে আইন ব্যবসায় যোগ দেয়ার জন্য। তাঁর আশংকা ছিল শুল্ক বিভাগের চাকরিতে চরিত্র ঠিক রাখা যাবে না। খালু শ্বশুরের উপদেশ মাথা পেতে নিয়ে কয়েক মাস পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে এডভোকেট বদিউল আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে যান।
তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি অ্যাডভোকেট বদিউল আলম জীবনে সৎ থাকার জন্য আইনজীবী হয়েছিলেন। আইন চর্চা করে তিনি জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যও অর্জন করেছিলেন, কিন্তু সেটা তাঁর উদ্দিষ্ট ছিল না। যেহেতু কাস্টমসের চাকরি করে সৎ থাকা খুব কঠিন হয়ে ওঠে, কারণ সেই পেশায় ঘুষ, দুর্নীতি না করলে অযোগ্য প্রমাণিত হত, এখন হয়তো তা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। যেনতেন প্রকারে অর্থ উপার্জন অ্যাডভোকেট বদিউল আলমের উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি তাঁর জীবনকে ন্যায় নীতি ও আদর্শের চড়া দামে বেঁধে পেশা জীবনে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন এবং তখনই তাঁর খালু শ্বশুরের মূল্যবান উপদেশ তাঁকে সৎ পেশা বেছে নিতে সাহায্য করেছিল।
এডভোকেট বদিউল আলম ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখা ছাড়াও তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশন করেন। সেগুলি হলো– আইন ও সমকালীন প্রসঙ্গ, দেশ হতে দেশান্তরে (ভারত), দেশ হতে দেশান্তরে (ব্রিটেন ও সৌদি আরব), কত স্মৃতি কত কথা, যৌতুক : একটি সামাজিক অভিশাপ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ, রাজনীতির সেকাল–একাল প্রসঙ্গ : বাংলাদেশ, যা কিছু মনে আছে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ও আজকের মুসলিম সমাজ, সামপ্রতিক ভাবনা, বাংলাদেশ: জাতীয়তা ও জাতীয়তাবাদ, উপমহাদেশ বিভক্তি ও আজকের বাংলাদেশ, রক্তের আখরে লেখা বালাকোট, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি, ফ্যাসাদ ফেতনা চেতনা নয় আত্মপ্রতারণা, বাংলাদেশে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ, জয় না জিন্দাবাদ। অপ্রকাশিত : বদিউল আলম রচনাবলী (৩ খণ্ডে)।
লেখক : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্কৃতি সংগঠক