৪ জঙ্গির ফাঁসির রায়

হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলা ।। দ্রুত কার্যকরের দাবি লেখক, প্রকাশক ও শিক্ষাবিদদের

আজাদী ডেস্ক | বৃহস্পতিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০২২ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

দেড় যুগ আগে একুশে বইমেলার বাইরে বহুমাত্রিক লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে হত্যার ঘটনায় চার জঙ্গির ফাঁসির রায় দিয়েছে আদালত। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আল-মামুন গতকাল বুধবার দুপুরে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। সর্বোচ্চ সাজার পাশাপাশি চার আসামিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন তিনি। তবে আদালতের এ রায়কে ‘গৎবাঁধা’ বলেছেন মামলার বাদী হুমায়ুন আজাদের ছোটো ভাই মঞ্জুর কবির। অন্যদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তা দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন লেখক, শিক্ষক, সহকর্মী, প্রকাশক ও শিক্ষাবিদরা।
বিডিনিউজের খবর থেকে জানা যায়, দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে কারাগারে থাকা দুই আসামি নিষিদ্ধ জঙ্গি দল জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) শুরা সদস্য মিজানুর রহমান মিনহাজ ওরফে শফিক ওরফে শাওন এবং আনোয়ারুল আলম ওরফে ভাগ্নে শহীদ রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি দুই আসামি নূর মোহাম্মদ শামীম ওরফে জে এম মবিন ওরফে সাবু এবং সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ওরফে সজীব ওরফে তাওহিদ পলাতক।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আবু বলেন, রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্যে সারা দেশের সিরিজ বোমা হামলা চলে। দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নষ্ট করার জন্যে এবং ধর্মান্ধতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আসামিরা নৃশংসভাবে হুমায়ুন আজাদকে কুপিয়েছিল।
নিয়ম অনুযায়ী এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে সাত দিন সময় পাবেন আসামিরা। তবে আপিল করতে হলে পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণ করতে হবে।
বিজ্ঞানমনস্কতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পক্ষে লেখা হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত হয়েছিলেন একুশে বইমেলা চলাকালে। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ দিয়ে টিএসসির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীর চাপাতির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হন তিনি। দেশে লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, মুক্তমনা মানুষের ওপর বিগত বছরগুলোতে যে ধারাবাহিক জঙ্গিবাদি হামলার ঘটনা বাংলাদেশ দেখেছে, তার সূচনা হয়েছিল হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে।
কয়েক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর ওই বছর অগাস্টে গবেষণার জন্য জার্মানিতে যান এই লেখক। পরে ১২ অগাস্ট মিউনিখে নিজের ফ্ল্যাট থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। হামলার পরদিন হুমায়ুন আজাদের ভাই মঞ্জুর কবির রমনা থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। আদালতের আদেশে অধিকতর তদন্তের পর তা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। সেই মামলার রায় হল গতকাল।
ভাষা বিজ্ঞানী, বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ তার লেখার কারণেই প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন। ২০০৪ সালে তার ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে মৌলবাদীরা তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। হুমায়ুন আজাদ সে সময় নানাভাবে সাম্প্রদায়িক হুমকি পেয়ে আসছিলেন। কিন্তু একুশে বইমেলার বাইরে এভাবে তাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা হবে, সেটা কেউ ভাবেনি। ওই হামলার পর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা। পরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ইসলামি জঙ্গিরা হুমায়ুন আজাদের ওপর ওই হামলা চালিয়েছিল।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, জার্মানি থেকে পাঠানো হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু সনদ এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, অ্যানাটমিক্যালি মৃত্যুর যথেষ্ট কারণ পাওয়া না গেলেও টর্চারের (নির্যাতনের ফলে) ফলে তার মৃত্যু ঘটেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে এবং হাইপার টেনশনে তিনি মারা যান। জার্মানির মিউনিখ হাসপাতালের অটোপসি রির্পোট পর্যালোচানায় দেখা যায়, ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারির ওই তারিখে ঘটনার দিন মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তিনি অসুস্থ ও আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার পরও আরোগ্যপ্রাপ্ত না হয়ে বরং তিনি ধীরে ধীরে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০৪ সালের ১২ অগাস্ট জার্মানির মিউনিখের বাসস্থানে যাওয়ার চারদিন পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
‘গৎবাঁধা’ রায় : আদালতের এ রায়কে ‘গৎবাঁধা’ বলেছেন মামলার বাদী হুমায়ুন আজাদের ছোটো ভাই মঞ্জুর কবির। তিনি বলেন, ফাঁসির রায় হয়েছে? ওই গৎবাঁধা। যাদের ফাঁসি হল তারা আদৌ ছিল না কিনা কে জানে? যে মূল আসামি তাকেইতো মামলায় রাখা হয়নি। প্রতিক্রিয়া দিয়ে কী হবে, ভাইতো ফিরবে না। যিনি নিহত হয়েছেন, তিনি (হুমায়ুন আজাদ) হামলায় আহত হওয়ার পর দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীকে দায়ী করেছিলেন। তাকেই যখন বাদ দেওয়া হল, তারপর তো আর কিছু থাকে না।
বিলম্বিত রায়, দ্রুত কার্যকরের দাবি : রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রায়টা অনেক দেরিতে হল। এটা আরও আগে হওয়া উচিৎ ছিল। তদন্তটা আরও দ্রুত হতে পারত। এখন যে রায় হয়েছে, এই শাস্তি তাদের প্রাপ্য। যারাই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে, এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছ। যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সেটা যাতে দ্রুত কার্যকর করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের সহকর্মী অধ্যাপক রফিকুল্লাহ খান বলেন, এ রায়ে যারা ধর্মান্ধ, জঙ্গিবাদী, তাদের যদি শিক্ষা হয়, তবেই এ রায় ঘোষণার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচমেক হাসপাতাল এলাকায় নওফেলের পক্ষে ইফতার সামগ্রী বিতরণ
পরবর্তী নিবন্ধএবার চাহিদা নেই, তবু দাম চড়া ইলিশের