পঞ্চবার্ষিকী কর পুনমূল্যায়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরের আগ্রাবাদ এলাকার একটি তিন তারকা মানের হোটেলের বার্ষিক পৌরকর (গৃহকর ও অন্যান্য রেইট) নির্ধারণ করে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। যা ‘বেআইনি’ভাবে দুই দফা শুনানি করে কমিয়ে করা হয় মাত্র ১৮ লাখ টাকা। পৌরকর কমানোর এ অনিয়ম–এর সঙ্গে জড়িত চসিকের সাবেক এক কর–কর্মকর্তা। এছাড়া যে দুই শুনানির মাধ্যমে পৌরকর কমিয়ে দেয়া হয় তার আপিলের ‘পি ফরম’ (কর নির্ধারণ ও মূল্যায়নের বিরুদ্ধে আবেদন ফরম)-এ রিভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান তৎকালীন মেয়রের স্বাক্ষর নেই। ফলে আপিল দুটিও আইগতভাবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
আলোচিত হোটেলটি হচ্ছে– ‘হোটেল সেন্ট মার্টিন লিমিটেড’। ‘রাজস্ব বিভাগের দুই কর্মকর্তার যোগসাজশে হোটেলটির পৌরকর কমিয়ে দেয়ার অভিযোগ তদন্তে’ গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এই অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। পঞ্চবার্ষিকী মূল্যায়নের বিপরীতে পৌরকর কমিয়ে দেয়ায় চসিকের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রথম হোটেল সেন্ট মার্টিন লিমিটেড’ এর গৃহকরের অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। এরপর ২৪ নভেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে চসিক। সংস্থাটির আইন কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মুরাদকে আহবায়ক করে গঠিত চার সদস্যের এ কমিটির সদস্য সচিব হচ্ছেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আশুতোষ দে। অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সাব্বির রহমান সানি ও শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমা বিনতে আমিন। গতকাল বুধবার তদন্ত প্রতিবেদনটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, পৌরকর নিয়ে যে অনিয়ম হয়েছে তখন আমি মেয়রের দায়িত্বে ছিলাম না। দায়িত্ব নেয়ার পর যখন অনিয়ম–এর বিষয়টি জেনেছি সাথে সাথে তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। এখন তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
৩ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা : তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭–১৮ অর্থ–বছরে পুর্নমূল্যায়ন করে ‘হোটেল সেন্ট মার্টিন লিমিটেড’ (হোল্ডিং নং ২১৫৩/২৪০২) বার্ষিক পৌরকর নির্ধারণ করা হয় ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। যা দুই দফা কমিয়ে করা হয় ১৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ কমানো হয় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। নির্ধারিত ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা পৌরকের বিরুদ্ধে হোটেল সেন্ট মার্টিন লিমিটেড ২০১৭ সালে আপিল করে। এতে পৌরকর কমিয়ে ২২ লাখ টাকা করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুনরায় আপিল শুনানি করে চূড়ান্ত করা হয় ১৮ লাখ টাকা। যা ‘বেআইনি’।
এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বার্ষিক মূল্যায়ন সংক্রান্ত আপিল নিষ্পত্তি হওয়ার পর তা আর পরিবর্তন করার বা পুনরায় আপিল দায়ের করার সুযোগ নেই। ১ম বার শুনানিতে ২২ লাখ টাকা টাকা চূড়ান্ত হয়েছে। তাই যেহেতু সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক দ্বিতীয়বার আপিল শুনানির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে রিভিউ বোর্ডের শুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত হওয়া মূল্যায়নকে পুনরায় আপিল শুনানি করা হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয়বারের এই আপীল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বে–আইনি।
প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, প্রথমবার হোটেলটির আপিল শুনানি হয় ২০২২ সালের ২ জুন। এখানে আপিল পি ফরমের ১ নম্বর ক্রমিকে স্বাক্ষরের স্থান খালি রয়েছে। নিয়ম মতে রিভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর স্বাক্ষর থাকার কথা। স্বাক্ষর না থাকায় আপীল টি আইনগতভাবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি মর্মে প্রতীয়মান হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন কর–কর্মকর্তা মো. মেজবাহ উদ্দিন বে–আইনীভাবে উক্ত আপীল কার্যক্রম তামিল করেছেন। দি মিউনিসিপাল কর্পোরেশন (ট্যাঙেশন রুলস) ১৯৮৬ মোতাবেক হোটেলটির এর বার্ষিক মূল্যায়ন পুনরায় নির্ধারন বা সংশোধন করা যেতে পারে।
এদিকে হোটেলটির পৌরকর কমিয়ে দেয়া প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমবার অস্বাভাবিকভাবে কর হ্রাসের মাধ্যমে ২২ লাখ টাকা পৌরকর নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ২য় বারের মত নোটিশ ছাড়াই পারস্পারিক যোগসাজসের সমঝোতার মাধ্যমে সভাপতি হিসেবে মেয়র মহোদয়ের স্বাক্ষর পুনঃআপিল নিষ্পত্তি দেখিয়ে ট্যাক্স কমিয়ে ১৮ লাখ টাকা। বারবার আপিল নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিধি বর্হিভূতভাবে কর হ্রাস করায় প্রাতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।












